ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের বিষয়ে যা জানা গেল
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার (৩ ডিসেম্বর) তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর বিবিসি'র।
ট্রাম্প জানান, মার্কিন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বিতভাবে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শনিবার ভোরে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিসহ বেশ কিছু স্থানে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এরপরই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন তথ্য আসে। এদিকে, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বেঁচে আছেন কি না, তার প্রমাণ দাবি করেছে ভেনিজুয়েলা সরকার। দেশজুড়ে জারি করা হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থা এবং মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।
দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ছিল। সম্প্রতি ক্যারিবিয়ান সাগরে ড্রাগ পাচারে ব্যবহৃত নৌযানগুলোতে মার্কিন হামলার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদুরো ব্যক্তিগতভাবে মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত এবং তিনি একজন অবৈধ নেতা। অন্যদিকে, মাদুরো বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করে আসছিলেন।
অভিযান সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
মাদুরোকে আটকের ঘটনার বিস্তারিত খুব কমই জানা গেছে। ট্রাম্প এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেননি যে কীভাবে তাকে আটক করা হয়েছে বা বর্তমানে তাকে কোথায় রাখা হয়েছে। তবে গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কাউন্টার-টেরোরিজম ইউনিট 'ডেল্টা ফোর্স' এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি রিসোর্টে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় ট্রাম্পের একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকে অভিযানের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে কথা বলা রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন যে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে ফৌজদারি অপরাধের বিচার করা হবে। তিনি বলেন, 'তিনি (মার্কো রুবিও) ধারণা করছেন যে মাদুরো এখন মার্কিন হেফাজতে থাকায় ভেনিজুয়েলায় আর কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে না।'
তিনি আরও যোগ করেন, মূলত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে যারা নিয়োজিত ছিলেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
কারাকাসের বর্তমান পরিস্থিতি
স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে কারাকাসে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেলিকপ্টার ও বিস্ফোরণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোর সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
খবর পাওয়া গেছে যে, রাজধানীর কেন্দ্রে অবস্থিত সামরিক বিমানঘাঁটি এবং প্রধান সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার ফলে আশেপাশের এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে এই অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। ভেনিজুয়েলা সরকারের মতে, মিরান্ডা, আরাগুইয়া এবং লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে।
ভেনিজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
ভেনিজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সরকার মাদুরো এবং ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসের অবস্থান সম্পর্কে অবগত নয়। তিনি অবিলম্বে তাদের দুজনের 'জীবিত থাকার প্রমাণ' দাবি করেছেন।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ দাবি করেছেন যে, হামলাগুলো বেসামরিক এলাকায় চালানো হয়েছে। সরকার বর্তমানে নিহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশি সেনার উপস্থিতির বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এক সরকারি বিবৃতিতে ভেনিজুয়েলা এই ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং ভেনিজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের লক্ষ্যেই এই রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
কী বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিস্ফোরণের পরপরই হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে পরে ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ নিশ্চিত করেন যে, এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই অভিযানকে 'অসাধারণ এক অপারেশন' হিসেবে বর্ণনা করেন। ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পরিকল্পনা কী, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আপনারা ১১টার সময় সব জানতে পারবেন।'
মাদুরো কে এবং কেন এই আটক
সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও বিরোধী দল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের দাবি ছিল, বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ ভেনিজুয়েলান অভিবাসীর প্রবেশ এবং ফেন্টানিল ও কোকেনের মতো মাদক পাচার নিয়ে ট্রাম্পের সাথে মাদুরোর বিরোধ দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার দুটি মাদক গ্যাং—'ট্রেন ডি আরাগুয়া' এবং 'কার্টেল ডি লস সোলেস'—কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, 'কার্টেল ডি লস সোলেস' সংগঠনটি স্বয়ং মাদুরো পরিচালনা করেন।
মাদুরোকে গ্রেপ্তারে সহায়তাকারী তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে রেখেছিল। তবে মাদুরো সবসময়ই মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দোহাই দিয়ে আসলে ভেনিজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ দখল করতে চায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মাদুরোকে আটকের খবরে বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভেনিজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়া এই ঘটনাকে 'সশস্ত্র আগ্রাসন' হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে 'জাতীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন' বলে উল্লেখ করেছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো এই হামলাকে লাতিন আমেরিকার 'সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত' এবং কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল একে 'ক্রিমিনাল অ্যাটাক' হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে স্পেন, জার্মানি ও ইতালি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে।
