ভেনেজুয়েলার শাসনভার এখন কার হাতে, সামনে কী ঘটতে চলেছে?
ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ক্ষমতার 'সঠিক' হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তিনিই ভেনেজুয়েলার শাসনকার্য 'পরিচালনা' করবেন। খবর বিবিসির।
ভেনেজুয়েলার এই বামপন্থী নেতা ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের বাড়ি থেকে আটকের পর উড়োজাহাজে করে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করবে। সেইসঙ্গে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বার হামলা চালাবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। তবে ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, তাদের সরকার 'প্রতিরক্ষার জন্য' প্রস্তুত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান নিয়ে যা জানা গেল
মার্কিন সামরিক বাহিনী স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে মাদুরোর বাড়িতে হামলা চালায়। ট্রাম্প জানান, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। মাদুরো ইস্পাত দিয়ে তৈরি সুরক্ষিত কক্ষে (সেফ রুম) ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তিনি ভেতরে প্রবেশও করেছিলেন, তবে দরজাটি বন্ধ করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: নকল বাড়ি বানিয়ে মহড়া, ড্রোন, ব্লোটর্চ; যেভাবে মাদুরোকে তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) এক সোর্সের মাধ্যমে প্রথমে মাদুরোর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট 'ডেল্টা ফোর্স' তাকে আটক করে।
ট্রাম্প জানান, অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা প্রাণ হারাননি। কেবল 'কয়েকজন' আহত হয়েছেন। অভিযান পরিচালনাকারী দলটিকে কারাকাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১৫০টিরও বেশি বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল। আটকের পর মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে ব্রুকলিনের 'মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে' নিয়ে যাওয়া হয়।
ভেনেজুয়েলার শাসনভার এখন কার হাতে?
মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের কাছে শপথ নেওয়ার পর এখন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল শনিবার তিনি মাদুরোর মুক্তির দাবি করে বলেন, তিনিই (মাদুরো) দেশের 'একমাত্র প্রেসিডেন্ট'।
আরও পড়ুন: চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরা ছবির পর মাদুরোর নতুন ভিডিও প্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও বর্তমানে মাদুরোর সহযোগীরাই দেশটির শাসনকার্য পরিচালনা করছেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, একটি 'নিরাপদ, সঠিক ও বিচারসম্মত ক্ষমতা হস্তান্তর' না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশটি চালাবেন।
যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীভাবে দেশটি পরিচালনার পরিকল্পনা করছে বা কারা বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেবল এটুকু বলেছেন যে এটি 'সম্মিলিত' প্রচেষ্টা হবে।
তিনি যোগ করেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রদ্রিগেজের সাথে কথা বলেছেন এবং রদ্রিগেজ 'যুক্তরাষ্ট্র যা বলবে তা-ই' করবে বলে ইচ্ছা পোষণ করেছেন।
আরও পড়ুন: 'স্বাধীনতার মুহূর্ত এসে গেছে', মাদুরোকে আটকের পর মাচাদোর উচ্ছ্বাস; সমর্থন নেই ট্রাম্পের
তবে ট্রাম্পের এই দাবি জনসমক্ষে দেওয়া রদ্রিগেজের বক্তব্যের পুরো উল্টো। ভেনেজুয়েলা কোনো 'সাম্রাজ্যের উপনিবেশ' হবে এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধেই নিজের অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোর সাথে কথা বলেননি। তার মতে, ভেনেজুয়েলার নেতা হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সমর্থন বা মর্যাদা মাচাদোর নেই।
মাচাদো এর আগে এডমুন্ডো গঞ্জালেজকে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গঞ্জালেজের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করেছিলেন।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ
যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ভেনেজুয়েলায় আর কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই, তবে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ট্রাম্প এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, 'আমরা সেনা পাঠাতে ভয় পাই না'।
ট্রাম্প আরও বলেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো অবকাঠামো মেরামত করতে এবং 'দেশের জন্য অর্থ উপার্জন করতে' সেখানে যাবে।
তিনি বলেন, 'আমরা মাটির নিচ থেকে প্রচুর সম্পদ নেব'। এগুলো ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাবে। তিনি যোগ করেন, 'আমাদের ব্যয়ের পুরো টাকা আমরা উসুল করে নেব'।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ: ট্রাম্প চাইলেও রাতারাতি বাড়ছে না তেল উৎপাদন
যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি করবে বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই হামলাকে 'ভেনেজুয়েলার কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে তেল ও খনিজ পদার্থ' দখলের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকার বলেছে, এটি জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জোরপূর্বক ধ্বংসের একটি চেষ্টা।
উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে। এই তেল পরিশোধন করা কঠিন, কিন্তু ডিজেল ও অ্যাসফল্ট তৈরির জন্য উপযোগী।
