ইরান ইস্যুতে ‘বোকামি’ করেছে ন্যাটো, তাদের থেকে আর সাহায্যের প্রয়োজন নেই’: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য না করে ন্যাটো সদস্যরা 'বোকামি' করেছে।
যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নৌ-চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প দাবি করেন, এই সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আসলে মিত্রদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
হোয়াইট হাউসে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের উপস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটোর অধিকাংশ মিত্র দেশ তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চান না। অনেক মিত্রই এই সংঘাতকে 'অবৈধ' বলে মনে করেন।
যদিও ট্রাম্প বলেছেন, কিছু দেশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিতে সহায়তা করতে আগ্রহী, তবে তিনি এখনো প্রকাশ্যে সেই দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি।
মঙ্গলবার ওভাল অফিসে দেওয়া উত্তপ্ত বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'ন্যাটোর কাছ থেকে আমাদের কোনো সাহায্য প্রয়োজন নেই।' তবে তিনি যোগ করেন, 'কিন্তু তাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল।'
পারস্য উপসাগরে মাইন পরিষ্কার করার জাহাজ (মাইন-সুইপার) পাঠাতে মিত্রদের এই অনীহাকে ট্রাম্প 'খুব বড় কোনো বিষয় নয়' বলে উল্লেখ করলেও একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি 'অন্যায়' বলে অভিহিত করেছেন।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অংশগ্রহণ ও সহায়তা না করার কারণে যুক্তরাজ্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক সব সময় 'সবচেয়ে ভালো' ছিল।
ট্রাম্পের মতে, চলমান এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্র দেশগুলোর সম্পর্কের জন্য একটি 'বড় পরীক্ষা'। তবে এই অসহযোগিতার জন্য কোনো শাস্তিমূলক বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার মাথায় বর্তমানে এমন কিছু নেই।
ন্যাটো মিত্রদের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে ইউক্রেনকে দেওয়া আমেরিকার কোটি কোটি ডলারের সহায়তার সুফল এই মিত্ররাই ভোগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'আমরা তাঁদের রক্ষা করব, কিন্তু বিশেষ করে প্রয়োজনের সময়ে তারা আমাদের জন্য কিছুই করবে না।'
এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অথচ এ পর্যন্ত ভারত ও চীনগামী হাতেগোনা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ এই প্রণালি পার হতে পেরেছে। এমনকি এই জলপথে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকারও হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা বা পাহারা (এসকর্ট) দিতে ইচ্ছুক কোনো মিত্র দেশের নাম এখনো জানাতে পারেনি মার্কিন কর্মকর্তারা। যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্সসহ অনেক দেশ জানিয়েছে যে তারা এখনই এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত নয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মঙ্গলবার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চান না। তিনি বলেন, 'আমরা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নই। তাই হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল বা মুক্ত করার কোনো অভিযানে ফ্রান্স কখনোই অংশ নেবে না।'
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস মঙ্গলবার বলেছেন, ইরানের সাথে চলমান এই সংঘাত কোনোভাবেই ইউরোপের যুদ্ধ নয়। তিনি বলেন, 'আমরা এই যুদ্ধ শুরু করিনি এবং এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শও করা হয়নি।'
বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, কালাস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ইউরোপীয় দেশগুলো এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কোনো ইচ্ছা পোষণ করে না।
এদিকে ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের (এনসিটিসি) পরিচালক জো কেন্ট মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে পদত্যাগপত্রে কেন্ট দাবি করেন, ইরান আমেরিকার জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে ইরানের পক্ষ থেকে বড় ধরণের হামলার আশঙ্কা ছিল।
জো কেন্টের পদত্যাগের পর তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসী গ্যাবার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন
তিনি বলেন, ট্রাম্প অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করার পরেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে তেহরান থেকে আমেরিকার ওপর বড় ধরণের হুমকির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এবং এর সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেল আবিবের কাছে ইরানের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুইজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার এবং কুয়েতের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করেও ইরান হামলা চালিয়েছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে মোজতবা খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই মুহূর্তে কোনো যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা তার নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খামেনি বৈঠকে বলেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করার আগে এবং তারা পরাজয় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত শান্তির সঠিক সময় আসবে না।'
তবে মোজতবা খামেনি এই বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন কি না তা পরিষ্কার নয়। গত মাসে বিমান হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহতের ঘটনায় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া যায় এবং তারপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
একই সঙ্গে মঙ্গলবার ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দেশটির নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বাসিজ মিলিশিয়া প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি নিহত হয়েছেন।
