ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর সংকটের খবর ফাঁস ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে পিছু হটার কৌশল
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সেমাফরে সম্প্রতি ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর সংকট নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে।
তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা'আর, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এবং অন্যান্য সূত্র এই দাবি সরাসরি নাকচ করেছেন।
ইসরায়েলের কাছে ঠিক কত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হয় না। ইরান ও হিজবুল্লাহর জন্য এই তথ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর আগে, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানের পরও এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে ইন্টারসেপ্টরের তুলনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বেশি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় একটি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের তথ্য ফাঁস হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ থাকতে পারে, যাতে যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব ফেলা যায়। এই মুহূর্তে মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহল ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে ইরান যুদ্ধ ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মতবিরোধে রয়েছে।
পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোতে ইন্টারসেপ্টর সংকটের খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল দুর্বল হয়ে পড়ছে—এমন তথ্য সম্ভবত যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন জনমত গঠনের জন্য ফাঁস করা হয়েছে। কারণ বেশিরভাগ ভোটার যুদ্ধ চায় না।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় হোয়াইট হাউসকে আরও গুরুত্ব সহকারে যুদ্ধ বন্ধের কৌশল বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এছাড়া চলতি মাসের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠকও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প এতে শক্ত ভাবমূর্তি নিয়ে উপস্থিত হতে চান।
চলমান যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে সফল পদক্ষেপ হলো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা। এর ফলে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহে প্রভাব পড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ইরান-নয়াদিল্লির মধ্যে এক চুক্তির ফলে ভারতীয় তেলবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিনা বাধায় চলাচল করতে পারবে।
এদিকে, ইরানের একটি ড্রোন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে আঘাত হানে, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ এড়িয়ে যাওয়ার বিকল্প রুটকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরান সরকারের সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করতে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। হামলার ফলে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তবে যুদ্ধের সমাপ্তি এখনও নিশ্চিত নয়। ইরান এখনও লড়াইয়ের মনোবল ধরে রেখেছে।
ইসরায়েলের দাবি, দেশটির [ইরান] কাছে এখনও তিনটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো আকাশপথে ধ্বংস করা কঠিন এবং ধারণা করা হচ্ছে, কমান্ডো হামলা থেকেও সেগুলো রক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে ইরান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি কোনো বড় ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটে, তবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি বন্ধে আলোচনা ভিন্ন আর কোনো সমাধান নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে অধিক সামরিক সুবিধা থাকলেও, ইরানীরা চাপের মুখেও হরমুজ প্রণালীতে 'লাগাতার অবরোধ' ধরে রাখতে পারে এবং আপস করতে রাজি নাও হতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেননি। বহু বছর ধরে ইরান এটি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে হামলার সম্পূর্ণ প্রভাব, বিশেষ করে শক্তি ও জ্বালানি খাতের ওপর এর প্রভাব, পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারেনি।
এখন প্রশাসন আরও শক্তি প্রয়োগ এবং হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার আশা কম।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননে বড় পরিসরে সেনা মোতায়েন করছে এবং বিস্তৃত স্থল অভিযান শুরুর হুমকি দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে লেবাননে মোতায়েন করা সেনারা নতুন নতুন এলাকা দখল করেছে। এদিকে, ইসরায়েলের বোমা হামলা ও হুমকির কারণে লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ উত্তরের দিকে পালিয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে, যাতে ইসরায়েল ও লেবাননের সরকারের মধ্যে সরাসরি চ্যানেল পুনরায় খুলে দেওয়া যায়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েল মূলত ২০২৪ সালের অসম্পূর্ণ সামরিক অভিযান সম্পন্ন করতে এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতেই বেশি আগ্রহী।
লেবাননে পরিস্থিতি কি হবে, তা মূলত ইরান যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল। লেবাননে বড় ধরনের হামলাকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ সমাপ্তির 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে দেখা যেতে পারে।
