'এমনটা ঘটার কথা ছিল না; আমরা স্তম্ভিত': উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলায় বিস্মিত ট্রাম্প
মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর এই ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলাকে 'অপ্রত্যাশিত' বলে অভিহিত করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই এই ধরণের পরিণতির বিষয়ে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল।
ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ২,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বর্তমানে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। এই জলপথটি পুনরায় সচল করার জন্য ট্রাম্পের সাহায্য চাওয়ার অনুরোধ তার মিত্ররা প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং নতুন করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
মঙ্গলবার ভোরের দিকেও উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। ইরান রাতভর ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে এটিই প্রমাণিত হয়, টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের পরেও তেহরান এখনও দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরানজুড়ে নতুন করে 'ইরানি শাসকগোষ্ঠীর অবকাঠামো' এবং বৈরুতে হিজবুল্লাহর আস্তানাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এর একদিন আগেই ইসরায়েল জানিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে আরও অন্তত তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা বিস্তারিত রণকৌশল তৈরি করেছে।
এদিকে ইরাকের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে রকেট এবং অন্তত পাঁচটি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিকে দূতাবাসের ওপর সবথেকে জোরালো হামলা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এই হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।'
'কেউ এটা আশা করেনি, আমরা স্তম্ভিত'
ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলা চালিয়েছে। এই হামলার কারণে দেশটির আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়। আমিরাতের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ফুজাইরাহ বন্দরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ড্রোন হামলা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবুধাবির বানি ইয়াস এলাকায় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় সেটির ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে এক পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের এই প্রতিশোধমূলক হামলা ছিল এক বড় বিস্ময়। তিনি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্য দেশগুলোর ওপর ইরানের চড়াও হওয়ার কথা ছিল না। কেউ এটা আশা করেনি। আমরা স্তম্ভিত।'
তবে ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সাথে পরিচিত দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই ট্রাম্পকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তাকে জানানো হয়েছিল যে ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরান পাল্টা আঘাত হানতে পারে—বিশেষ করে তেহরান যদি মনে করে ওই দেশগুলো মার্কিন হামলাকে সমর্থন দিচ্ছে।
এছাড়া তেহরান যে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করবে, সেই সতর্কবার্তাও অভিযানের আগেই ট্রাম্পকে দেওয়া হয়েছিল বলে ওই সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে এখনও কোনো জোট হয়নি
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কিছু মিত্র দেশ সহযোগিতা করতে 'উৎসাহী' নয় বলে জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। এই জলপথ দিয়ে তেলের ট্যাংকার পার করে দিতে ট্রাম্প যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর দাবি জানালেও বেশ কয়েকটি দেশ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, অনেক দেশ সাহায্যের আশ্বাস দিলেও কিছু পুরনো মিত্রের আচরণে তিনি হতাশ। সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে ট্রাম্প বলেন, 'কেউ কেউ এ বিষয়ে বেশ উৎসাহী, আবার কেউ কেউ নয়। এমন কিছু দেশ আছে যাদের আমরা বহু বছর ধরে সাহায্য করেছি, বাইরের ভয়াবহ শক্তি থেকে রক্ষা করেছি; অথচ তারা খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। আর আমার কাছে এই আগ্রহের মাত্রাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
জার্মানি, স্পেন, ইতালি, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন অংশীদার জানিয়েছে, কৌশলগত এই জলপথটি পুনরায় সচল করতে জাহাজ পাঠানোর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাদের নেই। ইরান মূলত ড্রোন এবং নৌ-মাইনের সাহায্যে এই পথটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
বার্লিনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, 'জার্মানির মৌলিক আইন অনুযায়ী আমাদের এই অভিযানের জন্য জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর পক্ষ থেকে কোনো ম্যান্ডেট বা অনুমোদন নেই।' তিনি আরও যোগ করেন যে, যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল জার্মানির সাথে কোনো পরামর্শ করেনি।
ট্রাম্প এর আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে চীনের উচিত এই প্রণালী খুলে দিতে সাহায্য করা, কারণ তারা ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। সহায়তা না পেলে চলতি মাসের শেষে তার বহুল প্রতীক্ষিত বেইজিং সফর পিছিয়ে যেতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সোমবার ট্রাম্প জানান, তিনি তার সফর 'এক মাস বা তার বেশি সময়' পিছিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
যদিও মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনী ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও দেশটির সস্তা ড্রোনের বহর এই অঞ্চলে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। এছাড়া ড্রোন হামলার জেরে ফুজাইরাহতে তেল বোঝাই কার্যক্রম এবং আবুধাবির শাহ গ্যাস ফিল্ডের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
ইরান আরও জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন শিল্প স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। মার্কিন মালিকানাধীন কারখানাগুলোর আশেপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।
