ট্রাম্প যে ইরান চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত, তাতে কী আছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) শিগগিরই সই হতে যাচ্ছে বলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সেখানে মূলত দুটি বড় শর্ত রয়েছে। প্রথমত, কোনো ধরনের টোল বা ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চুক্তি মেনে চলার ওপর ভিত্তি করে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
মধ্যস্থতাকারী একটি দেশের একজন কূটনীতিক এবং একজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
এই এমওইউ সই হলে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়বে। এই সময়ের মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। এমওইউর খসড়ায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে একটি রূপরেখা দেওয়া আছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দ্বিতীয় এবং আরও বিস্তারিত একটি চুক্তির ওপর।
মধ্যস্থতাকারী দেশের ওই কূটনীতিক অ্যাক্সিওসকে এই চুক্তির সর্বশেষ খসড়া সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির খসড়ায় একমত হয়েছে।' তবে তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে চুক্তিতে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ইরানের উচ্চপর্যায়ের নেতারা চুক্তির খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছেন। তবে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্ভবত এখনো এতে সই করেননি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আশা করছেন যে এই সপ্তাহান্তেই একটি চুক্তি সইয়ের অনুষ্ঠান হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তেহরান 'এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি'।
গত দুই মাসে হোয়াইট হাউস বেশ কয়েকবার ভেবেছিল যে তারা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, কিন্তু বারবারই আলোচনা ভেস্তে যায়। তবে ওই কূটনীতিক আশা প্রকাশ করেছেন যে এবার অন্তত এই খসড়াটি টিকবে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর চারটি সি-১৭ বিমান ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জেনেভায় চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সম্ভাব্য সফরের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়েই বিমানগুলো গেছে।
যেভাবে চূড়ান্ত হলো খসড়া
মধ্যস্থতাকারী দুই দেশের দুজন কূটনীতিক এবং দুজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, কাতারের মধ্যস্থতাকারী আলী আল-তাওয়াদি এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে কয়েক ঘণ্টার আলোচনার পর বুধবার রাতে এই প্রাথমিক চুক্তিটি অর্জিত হয়।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরানে আলোচনার সময় আল-তাওয়াদি ট্রাম্পের দুই বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন।
তবে ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেন যে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে, তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রীতিমতো বিস্মিত হন। কারণ, ট্রাম্প তাকে এই বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানাননি।
সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে নেতানিয়াহু এই চুক্তি নিয়ে অন্ধকারে ছিলেন। বাধ্য হয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ফোন করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন।
চুক্তির মূল বিষয়গুলো কী?
এই এমওইউর অধীনে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে থাকা বিরোধ মেটাবে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প একটি প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। প্রস্তাবটি হলো—জাতিসংঘের পরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই তাদের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো বা 'ডাউন-ব্লেন্ডিং' করা হবে।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে কেবল দ্বিতীয় একটি চুক্তি সই হওয়ার পর। কিন্তু এমওইউর মতো তুলনামূলক কম জটিল একটি চুক্তি করতেই যেখানে এত ঘাম ঝরাতে হচ্ছে, সেখানে দ্বিতীয় চুক্তিটি আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
অবশ্য ওই কূটনীতিক দাবি করেছেন, এই এমওইউতে 'পারমাণবিক ইস্যুর বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে' এবং এটি 'যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত পূরণ করেছে'।
এমওইউতে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের টোল ছাড়া অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধপূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছিলেন, প্রণালি খুলে দেওয়ার পর ইরানকে ৬০ দিনের জন্য তেল বিক্রির সুযোগ দিতে অস্থায়ীভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। এর ফলে তেহরান বেশ ভালো পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।
ইরান যদি এই প্রাথমিক চুক্তি মেনে চলে এবং পরবর্তী আলোচনায় 'সদিচ্ছা' দেখায়, তবে তাদের ওপর থেকে আরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
ওই কূটনীতিক বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই, এটি পুরোপুরি চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।'
বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের কী হবে, তা নিয়ে এই খসড়ায় বিস্তারিত কিছু আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরান জোর দিয়ে বলে আসছে যে কোনো প্রাথমিক চুক্তিতে সই করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কিছু অর্থ দিতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চুক্তি মানার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে এই অর্থ ছাড় দেওয়া হবে।
প্রশাসনের বাইরের এক মার্কিন সূত্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে আটকে থাকা তহবিলের বিষয়টি হয়তো কোনো গোপন চুক্তির মাধ্যমে মেটানো হতে পারে। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা সম্প্রতি অ্যাক্সিওসের কাছে এই সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করেছেন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতাকারী দেশের এক সূত্র জানান, গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও কাতার একটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছে। এর মাধ্যমে মানবিক পণ্য কেনার জন্য কাতারে আটকে থাকা নিজস্ব তহবিলের একটি অংশ হাতে পাবে ইরান।
কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তিটির নাম হবে 'ইসলামাবাদ চুক্তি'—অবশ্য যদি শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ এতে সই করতে রাজি হয়।
মধ্যস্থতাকারী একটি দেশের একজন কূটনীতিক বলেন, 'আমরা চুক্তির চূড়ান্ত কাজ শেষ করতে এবং সই অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করতে দুই পক্ষের সঙ্গেই কাজ করছি।'
