ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট, বাংলাদেশ ব্যাংকের সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি'র এটিএম বুথগুলো থেকে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ তুলতে পারছেন না গ্রাহকেরা। তবে ব্যাংকটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকের ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল অর্থের কোনো সংকট নেই।
মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সরবরাহ না পাওয়ায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকে এই সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে বিজয় সরণি এলাকার তিনটি এটিএম বুথের মধ্যে একটি বন্ধ পাওয়া যায়। বাকি দুটি বুথে নগদ অর্থ ছিল না।
বন্ধ থাকা বুথের সামনে থাকা এক গ্রাহক জানান, গুলশান থেকে আসার পথে তিনি কয়েকটি বুথে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোথাও টাকা পাননি।
এদিকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) একজন কর্মীও একাধিক বুথে চেষ্টা করার পর শেষ পর্যন্ত আইডিবি ভবনের কাছে থাকা একটি বুথ থেকে টাকা তুলতে সক্ষম হন।
ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনসংক্রান্ত চলমান সংকটের মধ্যে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতো একটি বড় ব্যাংকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে এটিএম বুথে টাকা না পাওয়ার ভোগান্তি ও ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন।
তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহতেশামুল হক খান টিবিএসকে বলেন, "আমাদের কোনো ধরনের তারল্য সংকট বা কারিগরি সংকট নেই।" যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ কম পাওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
মহসিন হোসাইন নামের এক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "সকালে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথে টাকা পাইনি। খালি হাতে বাজারে গেলাম। শেষ পর্যন্ত ৪০০ টাকার মাছ কিনে মাছ বিক্রেতাকে ১,৫৩০ টাকা বিকাশ করলাম। এরপর তার কাছ থেকে ১,১০০ টাকা নগদ নিয়ে বাকি বাজার করলাম।"
আরেক গ্রাহক মারুফ ফেসবুকে জানিয়েছেন, বনশ্রী, রামপুরা ও আফতাবনগর এলাকায় গত রাতে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি কোথাও নগদ অর্থ পাননি।
অবশ্য এটিএম বুথে নগদ অর্থের সংকট থাকলেও ব্যাংকটির ডিজিটাল ও অনলাইন লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে। জিহাদ হোসেন নামের এক কর্মকর্তা জানান, তিনি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তরা শাখায় অবস্থানরত এক আত্মীয়ের কাছে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কোনো সমস্যা ছাড়াই টাকা পাঠিয়েছেন।
এ ছাড়া ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় আসা গ্রাহকদের অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের জটিলতার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, "ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে নগদ অর্থ না পাওয়ার বিষয়টি ব্যাংকটির নিজস্ব কোনো সমস্যা নয়। কোরবানি ঈদ উপলক্ষে গ্রাহকদের হাতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ চলে গেছে। সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসতে সময় লাগায় এটিএম বুথগুলোতে সাময়িক নগদ সংকট তৈরি হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, গত ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছরে যে পরিমাণ নতুন নোট ছাপানোর প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক তা করতে পারেনি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একটি দীর্ঘ সময় ধরে তার আমলে ছাপানো নোট বাজারে ছাড়া হয়নি। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণঅভ্যুত্থান ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থাপনার মনোগ্রামসংবলিত নতুন নোটের নকশা প্রণয়নের কাজ চলায় পর্যাপ্ত নতুন টাকা ছাপানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, "বর্তমানে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের স্বাক্ষরিত নোট বাজারে ছাড়া হলেও তার পরিমাণ এখনো সীমিত। এছাড়া কোরবানি ঈদ উপলক্ষে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্বাক্ষরিত নতুন নোট বাজারে ছাড়ার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের হাতে তা এখনো তেমনভাবে পৌঁছেনি।"
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "গত দুই বছরে ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী নতুন টাকা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।"
কোরবানি ঈদের কারণে মানুষের হাতে অতিরিক্ত নগদ অর্থ চলে যাওয়াও বর্তমান পরিস্থিতির একটি কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাপিয়েছে। অথচ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির আকার বিবেচনায় প্রতি বছর অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাপানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, "শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ছাপানো, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি-সংবলিত যেসব নতুন নোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে রয়েছে, সেগুলো বর্তমানে বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। অন্যদিকে পর্যাপ্ত নতুন নোট সরবরাহ না হওয়ায় নগদ অর্থের এই সংকট তৈরি হয়েছে।"
ওই কর্মকর্তা জানান, একটি নতুন নোটের নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে মুদ্রণ ও বাজারে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। ৫ আগস্টের পর গণঅভ্যুত্থান এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি ব্যবহার করে নতুন নোটের নকশা তৈরির কারণে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময়ে কিছুটা বিলম্ব হয়। সে সময় কিছু নোট ছাপানো হলেও তা পুরোপুরি বাজারে ছাড়া হয়নি। বর্তমানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্বাক্ষরিত নতুন নোট বাজারে ছাড়ার প্রক্রিয়াতেও অতিরিক্ত সময় লাগছে।
'মুদ্রার কোনো সংকট নেই'
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুদ্রার কোনো সংকট নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে নগদ অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ছুটির পরপরই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা পরিশোধের কারণে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নগদ অর্থের প্রবাহে সাময়িক চাপ দেখা দিতে পারে। তবে এটি স্বাভাবিক ও অস্থায়ী পরিস্থিতি।'
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করে জানায়, ঈদের ছুটি শেষে নগদ অর্থ ধীরে ধীরে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারল্য ও মুদ্রা প্রবাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
