মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬০০ কোটি টাকার কারখানায় পেনিসিলিনের পরীক্ষামূলক উৎপাদনে হেলথকেয়ার ফার্মা
ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোনে (এনএসোইজেড) প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত নিজেদের নতুন কারখানায় পেনিসিলিনের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
কোম্পানিটি আশা করছে, আগামী মাসে তারা বাণিজ্যিকভাবে এই অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করতে পারবে। এর মধ্য দিয়ে এই শিল্পাঞ্চলের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ওষুধ উৎপাদন শুরু করল তারা।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্যমতে, মিরসরাই-ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোম্পানিটিকে ৪০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে বরাদ্দ দেওয়া বাড়তি ১০ একর জমিও অন্তর্ভুক্ত। কোম্পানিটির প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিইও মো. হালিমুজ্জামান টিবিএসকে জানান, কারখানাটি প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স পেয়েছে এবং জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা এখন পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষ করেছি। সরকারি মূল্য অনুমোদন পেলেই বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করতে পারব। আশা করছি আগামী মাসেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারব।'
হালিমুজ্জামান জানান, প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এবং বর্তমানে কারখানায় প্রায় ৩০০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে এটি একটি স্বতন্ত্র পেনিসিলিন উৎপাদন কারখানা। পেনিসিলিন উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা উৎপাদন ব্যবস্থা প্রয়োজন হওয়ায় একই স্থাপনায় অন্য কোনো ধরনের ওষুধ উৎপাদন করা যায় না।
হালিমুজ্জামান বলেন, 'বাংলাদেশে বর্তমানে খুব কম কোম্পানিই পেনিসিলিন উৎপাদনে আগ্রহ দেখায়। কারণ দেশে পরবর্তী প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি। কিন্তু বিশ্ববাজারে এখনো পেনিসিলিনই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক। সেই সম্ভাবনা বিবেচনা করেই আমরা আন্তর্জাতিক মানের একটি পেনিসিলিন ফ্যাসিলিটি গড়ে তুলেছি।'
তিনি আরও বলেন, এই কারখানায় ভবিষ্যতে শুধু হেলথকেয়ারের নয়, অন্য দেশীয় ওষুধ কোম্পানির জন্যও পেনিসিলিন উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ছিল এই কারখানায় ফিনিশড ওষুধপণ্যের পাশাপাশি অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্টস (এপিআই) বা ওষুধের মূল কাঁচামাল উৎপাদন করা। তবে এখনও এপিআই উৎপাদন শুরু হয়নি।
হালিমুজ্জামান জানান, মুন্সিগঞ্জের এপিআই পার্কে উৎপাদন শুরু করা প্রথম কোম্পানি ছিল হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। সেখানে এখন তারা বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে রয়েছেন।
এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এনএসইজেডের জন্য প্রতিশ্রুত অনেক অবকাঠামোগত সুবিধা এখনও সম্পন্ন হয়নি। তারা মনে করেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।
মো. হালিমুজ্জামান বলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব।
তিনি বলেন, 'গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ—এই তিনটিই এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো কর্মকর্তা ও কর্মীদের জন্য কোনো আবাসন সুবিধা নেই। সেখানে ভাড়ায় বাসা পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। ফলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং নতুন জনবল নিয়োগ—দুটোই কঠিন হয়ে পড়ছে।'
হালিমুজ্জামান আরও বলেন, পরিকল্পনা ছিল অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন, স্কুল, কলেজ, হাসপাতালসহ একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পরিকল্পনার খুব একটা বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
তিনি জানান, আবাসন সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানকে অনেক কর্মকর্তা ও কর্মীকে ফেনী বা চট্টগ্রামে রাখতে হচ্ছে। এতে যেমন পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি প্রতিদিন যাতায়াতের কারণে সময়ও নষ্ট হচ্ছে।
'সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দক্ষ জনবল নিয়োগে সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই যখন শুনছেন প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে যাতায়াত করতে হবে, তখন তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না,' বলেন তিনি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হালিমুজ্জামান বলেন, 'অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য যে অবকাঠামোগত সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সরকার চাইলে আবাসন তৈরি করে দিতে পারে, অথবা আমাদের জমি দিলে আমরা নিজেরাই আবাসন নির্মাণ করব। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
'সবচেয়ে জরুরি হলো পানির স্থায়ী সমাধান। ফেনী নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের যে পরিকল্পনার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
'সরকার যদি প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধাগুলো দিতে না পারে, তাহলে আমাদের মতো বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়বেন এবং এখানে আমাদের প্রকল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।'
