হরমুজ প্রণালি এড়াতে আরব মিত্রদের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের যৌথ তহবিল গঠন করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি নতুন পাইপলাইন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের জন্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলতে অঞ্চলটির দেশগুলোকে সহায়তা করা হবে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের দেখা একটি খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'পার্টনারশিপ ফর অ্যালাইড কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ট্রাস্ট' নামে পরিচিত এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অন্যদিকে, একটি নতুন হোল্ডিং কোম্পানিতে সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে।
এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা চালিয়ে অঞ্চলটির জ্বালানি রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটানোর ইরানের সক্ষমতা অকার্যকর করে দেওয়া। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
উপস্থাপনাটিতে 'প্যাক্ট'কে একটি 'ঐতিহাসিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াবে।
এতে বলা হয়েছে, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এবং বেসরকারি মূলধন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হোল্ডিং কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে। উপস্থাপনাটিতে উদাহরণ হিসেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্ল্যাকস্টোন, ব্ল্যাকরকের গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স এবং কেকেআরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেছেন, উপস্থাপনাটিতে নাম উল্লেখ করা কয়েকটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান যখন জানতে পারে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন খসড়া প্রস্তাবনায় তাদের নাম ব্যবহার করেছে, তখন তারা 'হঠাৎ করে বিষয়টি জানতে পেরে বিস্মিত' হয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আরও তিনজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল।
উপস্থাপনাটিতে বলা হয়েছে, প্যাক্টের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে যুক্তরাষ্ট্র। আর যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর মধ্যে কারিগরি আলোচনা শুরু হবে অক্টোবরে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের সামান্য নিচে লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
উপস্থাপনাটিতে বলা হয়েছে, 'প্যাক্ট হলো রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা এবং একটি মাত্র সংকটপূর্ণ জলপথ যাতে আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করার একটি সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা। কোনো একটি দেশের পক্ষে একা এই বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আর যত বেশি পরিবহনপথ থাকবে, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর প্রতিপক্ষের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও তত কমবে।'
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। এর ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রণালি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের সংঘাতে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য নতুন পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করছে বা পরিকল্পনা করছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রণালিটির ওপর তাদের নির্ভরতা কমানো।
তবে ওই অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। চলতি মাসে রিয়াদ তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। এই পাইপলাইনটি দেশটির তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত একটি ড্রোনের হামলায় অবকাঠামোটিতে আঘাত হানার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইরাকে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী ও ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সক্রিয় রয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি থেকে কিছু তেলবাহী ট্যাংকারকে বেরিয়ে যেতে নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে, তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল এবং সার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের এই জলপথ দিয়ে পরিবহন প্রায় নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলাবিষয়ক গোষ্ঠীর কর্মসূচি পরিচালক মাইকেল ওয়াহিদ হান্না বলেছেন, প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যৌক্তিক হলে আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ করবে।
তিনি বলেন, 'অনেকেই এখন আরও বেশি পরিবহনপথের ব্যবস্থা করা এবং অবকাঠামো ব্যবস্থায় আরও বেশি স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার কথা ভাবতে শুরু করেছেন। এসবই যৌক্তিক ধারণা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থে আপনারা এই দেশগুলোকে অবাস্তব অর্থনৈতিক প্রকল্পে যুক্ত হতে দেখবেন না।'
তিনি আরও বলেন, 'সংঘাত কমে আসা এবং তেলের দাম কম অস্থির একটি পর্যায়ে স্থিতিশীল হওয়ার পর যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেই বাস্তবতায় এসব বিনিয়োগ কেমন হবে, তা তারা বিবেচনায় রাখবে।'
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এই উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ব্ল্যাকস্টোন, জিআইপি ও কেকেআর তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
