বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ছাড়াই ৮,৫৪২ কর্মী নিয়োগ: এস আলমের আমলে ইসলামী ব্যাংকের অনিয়ম উঠে এল বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন তদন্তে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এক অনুসন্ধানে শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময়ে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও ত্রুটি পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ১০,৮৩২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৮,৫৪২ জনকে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশই চট্টগ্রামের ছিলেন। তাদের নিয়োগ পরীক্ষাতেও বিভিন্ন অনিয়ম ও ত্রুটি পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।
ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও বিক্ষোভ এবং এ নিয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ফের অনুসন্ধান করে।
নতুন অনুসন্ধানে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাংকটির কর্মকর্তা ছিলেন ৬৬ জন। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ হারানোর সময় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮,০৯৯ জনে। অর্থাৎ এ সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্মকর্তার সংখ্যা ১২২ গুণ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিয়োগ পাওয়া ৮,০৩৩ কর্মকর্তার মধ্যে ৫,১৪৮ জনই নিয়োগ পেয়েছেন শুধু পটিয়া উপজেলা থেকে। অর্থাৎ একটি উপজেলা থেকেই যেখানে পাঁচ হাজারের বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন, যেখানে বাকি ৫০২টি উপজেলায় গড়ে ১০ জন কর্মকর্তাও নিয়োগ পাননি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষা ছাড়া এসব নিয়োগের জন্য প্রার্থী সংগ্রহ করা হতো এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়াস্থ নিজ বাড়ি ও চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ অফিসে বিভিন্ন ধরনের বাক্স রেখে সিভি সংগ্রহের মাধ্যমে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বাক্সে 'পটিয়া জেনারেল', 'পটিয়া ক্যাশ', 'পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগড়া', 'পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী', 'সনাতন-জেনারেল', 'মহিলা-ক্যাশ', 'পিয়ন-ডিপ্লোমা', 'পুরুষ জেনারেল' ও 'পুরুষ ক্যাশ'সহ বিভিন্ন লেবেল লাগানো ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব স্থান থেকে সিভিগুলো প্রার্থীদের পছন্দ অনুযায়ী বাক্সে করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। পরে তালিকা অনুযায়ী প্রধান কার্যালয় থেকে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হতো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এস আলম নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তর থেকে ১০ জনকে সরাসরি বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।
প্রাথমিক পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ৫,৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন এতে অংশ নেন। তাদের সবাই এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় চাকরিচ্যুত ৪,৬৮৪ কর্মকর্তার মধ্যে ৪,৫১৪ জনকে শুধু ভাইভা, সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে কিছু প্রার্থীর কোনো সাক্ষাৎকারই নেওয়া হয়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বরও সংরক্ষণ করা হয়নি। তারা শুধু সিভি জমা দিয়েছিলেন এবং পরে নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন।
বাকি ১৭০ কর্মকর্তাকে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচ এবং সংশ্লিষ্ট ১২ জন ছাড়া বাকি কর্মকর্তাদের পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
পরিদর্শনের সময় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া নির্বাচিত ১০ জনের কাছ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য লিখিত বক্তব্য নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ওই ১০ জনই জানিয়েছেন, তারা সিভি জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু ভাইভা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, তাদের কোনো ভাইভাও নেওয়া হয়নি।
ওই ১০ জনের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা পাঁচলাইশের সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের নিজ বাড়িতে রাখা বাক্সে সিভি জমা দিয়েছিলেন। অন্যরা চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ অফিসে সিভি জমা দিয়েছিলেন।
তারা লিখিত বক্তব্যে আরও জানিয়েছেন, ওই স্থানগুলোতেই তারা ভাইভা দিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই যোগদানপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।
যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগের বৈধতা দিতে চেয়েছে এস আলম
৩১ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২১,৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১০,৮৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই সময়ে লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে ৪৬৬ জন এবং সরাসরি প্রবেশের মাধ্যমে ১০,৩৬৬ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৬,৩৭৫ জনকে এন্ট্রি পর্যায়ের পদে প্রবেশনারি হিসেবে রাখা হয়। বাকি ৩,৯৯১ জনকে সাব-স্টাফ ও আরডিএস কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের আগের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, সব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হতো। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা ছিল।
প্রার্থীদের উভয় পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হতো। এরপর মেধাক্রম অনুযায়ী একটি প্যানেল গঠন করার কথা ছিল, যার মেয়াদ এক বছরের বেশি হওয়ার কথা নয়।
তবে ২০১৭ সালে ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তনের পর ১০,৮৩২ জনের মধ্যে ৮,৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। যা মোট নিয়োগের প্রায় ৭৯ শতাংশ।
তৎকালীন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মানবসম্পদ নীতির প্রথম অধ্যায়ের ৭.০৪ ধারার বিধান উল্লেখ করে এ পদ্ধতির যৌক্তিকতা তুলে ধরে।
ওই বিধান অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে জনবলের চাহিদার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার পদমর্যাদার নিচের তাৎক্ষণিক দুই স্তর ছাড়া এন্ট্রি ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করে জনবল নিয়োগ করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এই বিধানটি মানবসম্পদ নীতির একই অধ্যায়ের ৭.০১ ধারায় উল্লিখিত শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
৭.০১ ধারায় সাধারণত নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বানের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং আবেদনের জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, সাধারণত ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে জরুরি প্রয়োজনে এক-দুটি পদে নিয়োগ অথবা লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে কারিগরি পদে জনবল নিয়োগের জন্য এ ধরনের বিধান রাখা হয়।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে ওই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি অফিসার (পিও), ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (টিএও) ও টিএও-ক্যাশসহ প্রবেশনারি এন্ট্রি পদে ছয় হাজারের বেশি কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে অস্বাভাবিক হিসেবে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগেই এসব অনিয়ম সীমাবদ্ধ ছিল না।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রিন্সিপাল, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টসহ ২৮টি পদে অধিকাংশ নিয়োগই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ পরীক্ষায় যোগ্যতার মানদণ্ড হ্রাস
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।
২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৪০টি সিভি সংগ্রহ করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৬ জন নির্ধারিত ৫০ শতাংশ পাস নম্বর পান।
এরপর যোগ্যতার মানদণ্ড শিথিল করে মাত্র ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
আরও ১২ জন প্রার্থীকে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া সব প্রার্থীই চট্টগ্রাম অঞ্চলের ছিলেন।
২০২১ সালের ২৫তম ব্যাচের ক্ষেত্রে অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের ১১৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়।
চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১১০ জন, অর্থাৎ ৭৩ শতাংশই ছিলেন চট্টগ্রামের।
ট্রেইনি অফিসার নিয়োগেও অনিয়ম
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২,২৩২ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ২,০৬৪ জন বর্তমানে চাকরিতে নেই। এর মধ্যে ২৬০ জন পদত্যাগ করেছেন এবং ১,৬৭৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
একই সময়ে ২,৮২৮ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ২,৬৮৫ জন বর্তমানে চাকরিতে নেই। এর মধ্যে ১৩২ জন পদত্যাগ করেছেন এবং ২,৪৯৮ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এই সময়ে মোট ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসারও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ৪৫৩ জন বর্তমানে চাকরিতে নেই। বাকি ৪৮ জন এখনো কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ৩১ জন দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং ১৭ জন ছুটি বা অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মার্সি পিটিশন করেছেন।
ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ), ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, মেসেঞ্জার-কাম-গার্ড, আরডিএস স্টাফ, নিরাপত্তাকর্মী, ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার ও অফিসারসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও মানবসম্পদ নীতিমালা লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব পদে নিয়োগের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি এবং কোনো লিখিত পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুরো মেয়াদজুড়েই বিভিন্ন পদে বারবার এসব প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শন রিপোর্টে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুতির প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এক্সটারনাল অডিট প্রতিবেদনের পর এবং ব্যাংকের ৩৬৪তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংক।
পরীক্ষা বন্ধের জন্য দুজন কর্মী হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। তবে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানায়, পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
এরপর ইসলামী ব্যাংক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ)-এর মাধ্যমে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পরীক্ষা আয়োজন করে।
প্রাথমিকভাবে মোট ৫,৩৭৩ জনকে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে মাত্র ৪০২ জন এতে অংশ নেন। তারা সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
মোট ৪,৯৭২ কর্মকর্তা ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে পরীক্ষায় অংশ নেননি।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কর্মী পরীক্ষা দিতে আসা সহকর্মীদের শারীরিকভাবে হেনস্তা, হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত রাখেন। একই সঙ্গে কর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে কর্মবিরতিও পালন করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়। প্রতিবেদনে এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং ব্যাংকের নিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বোর্ডের পরামর্শে পরবর্তীতে যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাদের চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা না হলেও ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতির অধ্যায় ০৯-এর ধারা ১.০২ অনুযায়ী তিন মাসের বেতন পরিশোধের পর তাদের চাকরির অবসান করা হয়।
বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা ছাড়া অন্যান্য কারণে চাকরিচ্যুতি
এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের পাঁচজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। বিভিন্ন অভিযোগ, শৃঙ্খলামূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পর ১২১ কর্মকর্তাকেও চাকরিচ্যুত করা হয়।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১,১৯০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চুক্তিও নবায়ন করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ১৫৪ জন কর্মকর্তা এবং ১,০৩৬ জন কর্মচারী। এদের অধিকাংশই ছিলেন অস্থায়ী মেসেঞ্জার-কাম-গার্ড।
তাদের নিয়োগপত্রের শর্ত অনুযায়ী, প্রয়োজনের ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চুক্তি নবায়ন বা বাতিল করার এখতিয়ার ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ছিল।
চাকরিচ্যুতিতে ইসলামী ব্যাংকের কিছু অনিয়ম
বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে পরিদর্শনে।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া মোট ২৬১ কর্মকর্তাকে ওই পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অথচ একই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া অন্য কর্মকর্তাদের ওই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
যেমন, ২৩তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচকে পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও ২৬তম ব্যাচকে ওই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
তবে উভয় ব্যাচকেই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে রনি শীল নামে একজন কর্মকর্তার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপরও তাকে যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তার ব্যাচের অন্য সদস্যদের পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও রনি শীলকে পরে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়।
২০১৭ সালের আগে ব্যাংকে যোগ দেওয়া ছয় কর্মকর্তাকেও যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যা বলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টিবিএসকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ পরিদর্শন করছে।
তিনি বলেন, 'তাদের চাকরিতে যোগদান কিংবা চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
গভর্নরের কাছে পৌঁছানো একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, বিষয়টি গভর্নর পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও কী তথ্য উঠে আসে, তা দেখা হবে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিম টিবিএসকে বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শক্রমে তাদের মূল্যায়ন পরীক্ষায় ডাকা হয়েছিল। তারা এতে অংশ নেননি।'
তিনি বলেন, 'পরবর্তীতে বোর্ডের পরামর্শক্রমে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। এমনকি শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের পাওনাও পরিশোধ করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই শ্রম আইনে পাওয়া চার মাসের টাকাও তুলে নিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'এখন এ বিষয়টি নিয়ে তারা আদালতে গিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অনুসন্ধান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের বিষয় নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।'
