ইরানে ফের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের; হরমুজ বন্ধ করল তেহরান, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে 'একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে' নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নতুন উত্তেজনার জেরে তেহরান 'সব ধরনের জাহাজের' জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এছাড়া মার্কিন আক্রমণের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এছাড়া হরমুজে দুটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে আইআরজিসি।
ইরানের সংবাদসংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আইআরজিসির বিমান ও নৌবাহিনী এ হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটিগুলোর ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থপনায় হামলা চালিয়েছে তারা।
আইআরজিসির এ ঘোষণার পর বাহরাইনের বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়েছে। মানুষজনকে শান্ত থেকে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, বুধবার গভীর রাতের এই হামলা করা হয়েছে 'ইরানের অযাচিত ও অব্যাহত আগ্রাসনের জবাব' দিতে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই হামলার উদ্দেশ্য হলো তেহরানকে চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা। যদিও এই হামলার ফলে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, সবকটি লক্ষ্যবস্তুই দক্ষিণ ইরানে অবস্থিত। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রয়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাস ও সিরিক শহরে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কারগানেও বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, 'পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত' হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
আইআরজিসি আরও বলেছে, তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সব ধরনের জলযান চলাচল বন্ধ থাকবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আগে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সাহায্য করার যে দাবি করেছিল, সেটি তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরে আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হরমুজ 'প্রণালি দিয়ে বেআইনিভাবে পার হওয়ার চেষ্টা করা দুটি তেলের ট্যাংকারে আঘাত করা হয়েছে'।
হরমুজে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার এক দিন পরই এই উত্তেজনার সৃষ্টি হলো।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে 'খুব শক্তভাবে' আঘাত করবে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'চুক্তির কী হয়, আমরা দেখব। আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের ঘোরাচ্ছে। তারা আমাদের বোকা বানাচ্ছে, কারণ কী জানেন? ওরা এর আগে কিছু চরম বোকা প্রেসিডেন্টের সাথে কাজ করেছে।'
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের এই হুমকির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, 'গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো জনগণের প্রাণভোমরা। পরিবহন নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও পানি শিল্পের মতো অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি শক্তির কোনো প্রকাশ নয়, বরং একটি জাতির ইচ্ছাশক্তির সামনে এটি হতাশার লক্ষণ।'
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, 'নিজেদের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির ওপর নির্ভর করে ইরান যেকোনো চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে।'
মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ইরান এই হামলার পাল্টা জবাব দিতে পারে এবং মঙ্গলবার রাতের মতো এবারও মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এই হামলা শুরু আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'আজ রাতে সেন্ট্রাল কমান্ড বেশ ব্যস্ত থাকবে, কারণ আমরা ইরানে কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরানের সামনে দারুণ একটা চুক্তি করার সুযোগ আছে। কিন্তু তারা সেটি করতে রাজি হচ্ছে না। এখন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে একের পর এক মার্কিন বোমা পড়বে। এটি নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার জন্য নয়, বরং চুক্তির শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য করা হচ্ছে।'
হেগসেথ বলেন, 'আমাদের যদি বোমার মাধ্যমে আলোচনা করতে হয়, তাহলে আমরা বোমার মাধ্যমেই আলোচনা করব। আজ রাতে আমরা ওদের ওপর কঠোর আঘাত হানব এবং আশা করি ইরান সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।'
দুটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র 'আজ আবারও তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানবে' বলে জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার বিকেলে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা টিমের সাথে সামরিক বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসেন।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলোতে আক্রমণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল।
দুটি মার্কিন সূত্রের তথ্যমতে, বুধবার ট্রাম্প ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ও হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিবেচনাধীন একটি বিকল্প ছিল বড় পরিসরে কিন্তু স্বল্প সময়ের জন্য অভিযান চালানো, যাতে আলোচনায় ইরানকে অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
চুক্তি সম্পন্ন করতে নিজের সর্বশেষ প্রস্তাবের পর ইরানের জবাবের জন্য প্রায় দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করে ট্রাম্পের হতাশা ক্রমেই বাড়ছিল। এর মধ্যেই দেশটিতে আবার হামলা চালানোর নির্দেশ দিলেন তিনি।
