অন্তর্বর্তী চুক্তির কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, তবে দর-কষাকষি চলছে জব্দ তহবিল নিয়ে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির চেষ্টা জোরদার হয়েছে। উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালালেও, আটকে থাকা ইরানি তহবিল কীভাবে ছাড় দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বৃহস্পতিবার তিনটি ইরানি সূত্র ও একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্রগুলো জানায়, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সংঘাতের মাঝেই একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিস্তারিত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া ইতিমধ্যে হয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে এখনো বিস্তারিত আলোচনা বাকি, যার মধ্যে বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব ছাড়ার মেকানিজম বা ব্যবস্থা অন্যতম।
একটি ইরানি সূত্র জানায়, 'ইরান চায় তাদের আটকে থাকা তহবিলের অন্তত ৬ বিলিয়ন থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার তেহরানের হাতে তুলে দেওয়া হোক। কিন্তু ওয়াশিংটন চাচ্ছে, মানবিক পণ্য কেনার জন্য ধাপে ধাপে এই তহবিল ছাড় দিতে। তারা সরাসরি ইরানের হাতে অর্থ তুলে দিতে রাজি নয়।'
একজন জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, 'এই মুহূর্তে আলোচনায় মূলত কারিগরি খুঁটিনাটি এবং অর্থের পরিমাণের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।'
ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের এখন প্রধান অগ্রাধিকার কোনো পূর্ণাঙ্গ বা স্থায়ী চুক্তি নয়। বরং তারা এমন একটি কাঠামো চান, যা আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করে এবং যুদ্ধ শেষ করে দেশের জন্য ন্যূনতম স্বস্তির ব্যবস্থা করতে পারে।
একটি ইরানি সূত্র জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক সংঘাত এখন একটি অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই এই অচলাবস্থা ভাঙতে পারছে না।
তিনি বলেন, 'সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধ এখন একটি ডেড এন্ডে এসে ঠেকেছে। আমেরিকানরা ইরানে হামলা চালিয়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতগুলো হয়তো একটি চুক্তি ঘোষণার প্রস্তুতি হতে পারে। তবে যেকোনো কিছুই সম্ভব, এমনকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।'
ওবামার চেয়ে 'ভালো চুক্তি' চান ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনি একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছেন। তবে এর পাশাপাশি তিনি বোমা হামলা আরও জোরদার করার হুমকিও দিয়েছেন।
ট্রাম্প বরাবরই ওবামার করা ২০১৫ সালের চুক্তির সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ইরানকে দেওয়া আর্থিক সুবিধাগুলোর ব্যাপারে তার ঘোর আপত্তি ছিল। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে বের করে নিয়েছিলেন।
গত ২৪ মে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যে চুক্তিই করবেন, তা 'ভালো এবং সঠিক চুক্তিই হবে। ওবামার করা চুক্তির মতো হবে না, যা ইরানকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি পরিষ্কার ও উন্মুক্ত পথ করে দিয়েছিল।'
এদিকে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে উভয় পক্ষের ওপরই চাপ বজায় রয়েছে। এটি অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
আরেকটি ইরানি সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক চাপের কারণেই তেহরান চায় মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হোক।
সূত্রগুলো বলছে, অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত জনগণের কারণে ইরান এখন এই 'যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়' অবস্থার অবসান চায়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার বলেন, 'আমাদের অবশ্যই এই "যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়" অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যুদ্ধ নিশ্চিতভাবেই ইরানের স্বার্থের অনুকূলে নয়।'
তবে তিনি এ-ও স্পষ্ট করে দেন, 'এর মানে এই নয় যে আমেরিকা যদি আমাদের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালায়, তবে আমরা আত্মসমর্পণ করব বা পিছিয়ে যাব।'
