‘আমি মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি’: ইরান যুদ্ধের মধ্যে রেকর্ড পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পর ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৪.২ শতাংশ, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে তিনি উদ্বিগ্ন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, 'আমি মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি।'
বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় ট্রাম্প ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই মূল্যস্ফীতি 'হুড়মুড় করে নিচে নেমে আসবে'।
এদিন সকালেই ব্যুরো অভ লেবার স্ট্যাটিস্টিকস মূল্যসূচকের নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'না, আমি এটা ভালোবাসি। পরিসংখ্যানগুলো দারুণ!'
যুক্তরাষ্ট্রে এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩.৮ শতাংশ। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.২ শতাংশ। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূলত মূল্যস্ফীতির হার এভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরও বলেন, 'আমি আসলে কোনটা ভালোবাসি, জানেন? আমি মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি। কেন, জানেন? কারণ এই যুদ্ধটা শেষ হলেই...হ্যাঁ, কথাটা আমি এখন বলতেই পারি...আপনারা কি জানেন, আমরা লাখ লাখ ব্যারেল তেল বের করে নিয়ে আসছি?
'ব্যাপারটা কেউ জানে না। আর কারা জানে না বলতে পারেন? ইরান! এতদিন ওরা টেরও পায়নি।'
ট্রাম্প বলেন, 'সেদিন গভীর রাতে আলো না জ্বেলে আমরা ২২টি জাহাজ পার করে এনেছি। কেন জানেন? কারণ ওদের কোনো রাডার কাজ করছিল না—আমরা ওগুলো একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছি! আর ঠিক এ কারণেই তেলের দাম এখন ব্যারেল প্রতি ৮৫ ডলারে এসে ঠেকেছে।'
তবে তেল আর জাহাজ 'বের করে আনা' বলতে ট্রাম্প ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, আর এর সাথে ভোক্তা পণ্যমূল্যের কী সম্পর্ক—তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও জ্বালানি দপ্তরের কাছে মন্তব্য জানতে চেয়েছে সিএনবিসি।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, বুধবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ইরান থেকে লাখ লাখ ব্যারেল তেল বের করে আনছে—এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাইট বলেছেন, ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত জলপথ হরমুজ প্রণালি পার হতে বেশ কিছু তেলের ট্যাংকারকে সাহায্য করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
বুধবারের সূচক অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি তিন বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদে মূল মূল্যস্ফীতির হার ছিল বার্ষিক ২.৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের দেওয়া পূর্বাভাসের সাথে এই হার মিলে যায়।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ট্রাম্প এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টিও আশঙ্কায় আছে। কারণ আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামতে হবে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের। আর বাড়তে থাকা নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ব্যালট বাক্সে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে বলেই আশঙ্কা তাদের।
এর আগে মে মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আমি ভাবি না।'
মূল্যস্ফীতি নিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ এই মন্তব্যের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিটজকার এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন: 'মানুষ নিজের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছে না। আপনার জীবনযুদ্ধ তার কাছে একটা রসিকতা।'
নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যান্ডি কিমও ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশন দিয়েছেন: '"আমি মূল্যস্ফীতিকে ভালোবাসি"—ডোনাল্ড ট্রাম্প।'
পরে তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবারই ট্রাম্প দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের কাছে দাবি করেন, তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিতর্কিত ওই মন্তব্যের পরপরই নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, মূল্যস্ফীতি যে আরও বাড়েনি, আসলে সেই তথ্যই তার ভালো লেগেছে। একইসাথে তিনি পূর্বাভাস দেন, গত মাসের ৪.২ শতাংশ বার্ষিক হারই হবে যুদ্ধের বাজারে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি, পণ্যমূল্য এর চেয়ে আর বাড়বে না।
নিউইয়র্ক পোস্টকে তিনি বলেন, 'আমি যে বিষয়টির কথা বলছি, ঠিক সে কারণেই মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানকে ভালোবাসি।
'পরিসংখ্যানগুলো অবিশ্বাস্য রকমের ভালো হতে যাচ্ছে। কারণ এটা স্পষ্ট যে আমরা যুদ্ধের মধ্যে থাকার পরও মূল্যস্ফীতি আশঙ্কার চেয়ে অনেক কম বেড়েছে। আর যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই মূল্যস্ফীতি কমে এমন জায়গায় নামবে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়েও কম।'
সমালোচকদের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, 'ওরা খুব খারাপ। আমি আসলে বলছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই মূল্যস্ফীতির সূচক কতটা চমৎকার জায়গায় পৌঁছাবে। মূল্যস্ফীতি যে অনেক কমে যাবে, আমি সেই কথাই বোঝাতে চেয়েছি।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, 'আমার কথার সবসময়ই প্রেক্ষাপটের বাইরে নিয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই আমার আমলের মূল্যস্ফীতি অনেক নিচে নেমে আসবে। এখনই তো অনেক কম আছে, সামনে আরও কমবে। শুধু জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সূচকটা একটু ওপরে উঠেছে, কারণ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে আটকাতেই হবে আমাদের।'
৪.২ শতাংশই মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ সীমা কি না—জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন: 'আমার তা-ই ধারণা। হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি। এর চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না। আরে [সাবেক প্রেসিডেন্ট জো] বাইডেনের আমলের পরিসংখ্যান তো এর চেয়ে অনেক উঁচুতে ছিল। ওর মেয়াআদে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল।'
