নকল বাড়ি বানিয়ে মহড়া, ড্রোন, ব্লোটর্চ; যেভাবে মাদুরোকে তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর মাসের পর মাস ধরে কড়া নজর রাখছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো কী খাচ্ছেন, কী পরছেন কিংবা কোথায় ঘুমাচ্ছেন—সবই নজরে রাখা হতো।
এমনকি শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মাদুরোর পোষা প্রাণীগুলোর ওপরও নজর ছিল তাদের। ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের এক সূত্রসহ ছোট একটি দল এই নজরদারির কাজ করছিল।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকে এই অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল 'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ'। প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের ও নিখুঁত।
মাদুরো কারাকাসের যে বাড়িতে (সেফ হাউস) থাকতেন, যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক তেমন একটি বাড়ি বানিয়ে মহড়া চালিয়েছিলেন মার্কিন এলিট ফোর্সের সদস্যরা। বাড়িতে ঢোকার রাস্তা বা কৌশল কী হবে, তা ঠিক করতে হুবহু সেই বাড়ির আদলে কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
লাতিন আমেরিকায় স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের এমন সামরিক হস্তক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গোপন। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসকেও এ বিষয়ে আগাম কিছু জানানো হয়নি বা পরামর্শ নেওয়া হয়নি। সব খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা শুধু মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এমনভাবে অভিযানটি চালাতে চেয়েছিলেন, যাতে মাদুরো আচমকা ধরা পড়েন। অভিযানের চার দিন আগেও একবার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদনও দিয়েছিলেন। কিন্তু মেঘলা আকাশ ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে তখন সেই পরিকল্পনা স্থগিত করে ভালো আবহাওয়ার অপেক্ষা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটির সময়টাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ধৈর্য ধরে প্রস্তুত হয়ে বসে ছিলেন। সঠিক পরিস্থিতি আর প্রেসিডেন্টের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন তারা।'
'গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড'
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিট। চূড়ান্ত নির্দেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট। জেনারেল কেইন জানালেন, নির্দেশ দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট তাদের বলেছেন, 'গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড।'
অভিযান শেষে শনিবার 'ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস'–এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সেই মুহূর্তের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, 'আমরা চার দিন আগে, তিন দিন আগে, এমনকি দুই দিন আগেও এটা করতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ সুযোগ এল, আর আমরা বললাম: শুরু করো।'
কারাকাসে তখন মধ্যরাত হতে সামান্য বাকি। রাতের আঁধারেই কাজ সারতে চেয়েছিল মার্কিন বাহিনী।
এরপরের ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট যা ঘটল, তাতে ওয়াশিংটনসহ পুরো বিশ্ব হতবাক। আকাশ, স্থল ও নৌ—তিন পথেই চালানো হলো নজিরবিহীন এক অভিযান। এই অভিযানের ব্যাপকতা ও নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল অকল্পনীয়।
তবে ভেনেজুয়েলার নেতাকে এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ইনাসিও লুলা দা সিলভা এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এভাবে সহিংস উপায়ে ভেনেজুয়েলার নেতাকে আটক করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য 'অত্যন্ত বিপজ্জনক এক দৃষ্টান্ত' হয়ে থাকবে।
টিভি শোর মতো অভিযান দেখেছেন ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নয়, ফ্লোরিডায় নিজের বিলাসবহুল রিসোর্ট 'মার-এ-লাগো'তে বসে ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের তদারকি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তার পাশে ছিলেন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বড় পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে পুরো অভিযানটি দেখেন তারা।
শনিবার ট্রাম্প বলেন, 'অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য। আমি আক্ষরিক অর্থেই এটা টিভি শো দেখার মতো করে দেখেছি। কী গতি, কী তীব্রতা!...ওরা দারুণ কাজ করেছে।'
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওই অঞ্চলে হাজারো মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পাঠানো হয়েছে বিমানবাহী রণতরী ও বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ। গত কয়েক দশকের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি।
মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও 'নারকো-টেররিজমের' অভিযোগ তুলে আসছিলেন ট্রাম্প। মাদক পরিবহনের অভিযোগে ওই এলাকায় বেশ কিছু ছোট নৌকাও ধ্বংস করা হয়েছিল।
তবে 'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ'-এর শুরুটা হয়েছিল আকাশপথেই। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, সারা রাতে ১৫০টির বেশি বিমান এই অভিযানে অংশ নেয়। এর মধ্যে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান ও নজরদারি বিমান ছিল।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'খুবই জটিল ছিল পুরো বিষয়টি। বিমান ওঠানামা থেকে শুরু করে বিমানের সংখ্যা—সব মিলিয়ে ব্যাপক আয়োজন। যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য আমাদের যুদ্ধবিমান প্রস্তুত ছিল।'
কারাকাসের স্থানীয় সময় রাত দুইটার দিকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আকাশ। বিবিসিকে সাংবাদিক আনা ভানেসা হেরেরো বলেন, 'হঠাৎ বিকট শব্দ। জানালার কাঁচগুলো কেঁপে উঠল। এর পরপরই দেখলাম বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ধোঁয়ায় চারপাশ প্রায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।' তিনি আরও বলেন, 'সারা শহরের ওপর দিয়ে তখন চক্কর দিচ্ছিল বিমান ও হেলিকপ্টার।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কারাকাসের আকাশে নিচু দিয়ে চক্কর দিচ্ছে অসংখ্য হেলিকপ্টার। কোথাও কোথাও বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়।
বিবিসি ভেরিফাই কারাকাসের অন্তত পাঁচটি জায়গায় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে লা কার্লোটা নামে পরিচিত বিমানঘাঁটি এবং লা গুয়াইরা বন্দর রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়।
অভিযানের আগে কারাকাসের বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা শহরের বাতিগুলো নিভিয়ে দিয়েছিলাম। পরিবেশটা ছিল অন্ধকার ও ভয়ংকর।'
'ওরা জানত আমরা আসছি'
শহরে বিমান হামলা চলার মধ্যেই স্থলপথে ঢুকে পড়ে মার্কিন বাহিনী। সিবিএস নিউজকে সূত্র জানিয়েছে, এই অভিযানে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের এলিট 'ডেল্টা ফোর্স'-এর সদস্যরা। ভারি অস্ত্রের পাশাপাশি মাদুরোর বাড়ির ইস্পাতের দরজা কাটার জন্য তাদের কাছে ছিল ব্লোটর্চ।
জেনারেল কেইন জানান, রাত ২টা ১ মিনিটে সেনারা মাদুরোর বাড়িতে পৌঁছান। ট্রাম্পের ভাষায়, মাদুরোর বাড়িটি ছিল রীতিমতো এক দুর্গের মতো। তিনি বলেন, 'ওরা জানত আমরা আসছি। ওরা আমাদের মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়েই ছিল।'
সেনারা পৌঁছামাত্রই গোলাগুলি শুরু হয়। একটি মার্কিন হেলিকপ্টারে গুলি লাগলেও সেটি উড়তে সক্ষম ছিল। জেনারেল কেইন বলেন, 'ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সেনারা মাদুরোর ডেরায় ঢুকে পড়েন। পুরো কাজটা ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁত।' ট্রাম্প বলেন, 'ইস্পাতের মজবুত দরজা ভেঙে ওরা ভেতরে ঢুকে পড়ে।'
অভিযানে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়েছে। অভিযান চলাকালেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের বিষয়টি জানান। তবে কংগ্রেসকে আগে থেকে কিছু না জানানোয় ক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা চাক শুমার বলেন, 'নিকোলাস মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক, এটা ঠিক। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী পরিকল্পনা ছাড়াই এমন সামরিক অভিযান চালানো বেপরোয়া আচরণ।'
তবে আগেভাগে না জানানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও। তিনি বলেন, আগে জানালে অভিযানের ঝুঁকি বেড়ে যেত। আর এ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য, 'কংগ্রেসের পেটে কথা থাকে না, তথ্য ফাঁস করার প্রবণতা আছে তাদের। সেটা ভালো হতো না।'
সেফ রুমে গিয়েও রক্ষা হয়নি
অভিযান চলাকালে মাদুরোর প্রাসাদে যখন মার্কিন এলিট ফোর্সের সদস্যরা ঢুকে পড়েন, তখন তিনি পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, নিজের 'সেফ রুমে' আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন মাদুরো। কিন্তু তাতেও লাভ হতো না।
ট্রাম্প বলেন, 'সেখানে পালালেও তিনি বাঁচতে পারতেন না। কারণ, মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে ওই ঘরের দরজাও উড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের ছিল।'
ট্রাম্প আরও বলেন, 'মাদুরো দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটি আর বন্ধ করতে পারেননি। এর আগেই তাঁকে জাপটে ধরা হয়।' সম্প্রতি মাদুরো তাঁর নিরাপত্তার জন্য কিউবার দেহরক্ষীদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিলেন বলেও জানান ট্রাম্প।
২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসা এই স্বৈরশাসক যদি আটকের সময় বাধা দিতেন, তবে তাকে কি হত্যা করা হতো? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'তেমনটা ঘটতেই পারত।'
অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি, তবে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি। ভেনেজুয়েলার পক্ষে হতাহতের কোনো খবর এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাদুরোকে গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য আগে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ২০ মিনিটে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিয়ে ভেনেজুয়েলা ছাড়ে মার্কিন হেলিকপ্টার। তাঁরা এখন মার্কিন বিচার বিভাগের হেফাজতে। তাদের নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানেই তাদের ফৌজদারি অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
হেলিকপ্টার ওড়ার ঠিক এক ঘণ্টা পরই বিশ্ববাসীকে এই খবর দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, 'মাদুরো ও তার স্ত্রীকে শিগগিরই আমেরিকার কঠোর বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।'
