ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প, হোয়াইট হাউসের অন্দরেই প্রবল মতভেদ
হাইলাইটস
- হোয়াইট হাউসে নানা শিবিরের টানপোড়েনের ছাপ পড়ছে ট্রাম্পের বক্তব্যেও
- তেলের বাজারে ধসের আশঙ্কা অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের
- দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে রাজনৈতিক উপদেষ্টারা
- ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে মরিয়া কট্টরপন্থিরা
ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসের অন্দরেই শুরু হয়েছে প্রবল টানাপোড়েন। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কখন ও কীভাবে যুদ্ধে নিজেদের জয়ী ঘোষণা করা হবে, তা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিভাজন। উপদেষ্টাদের এই অভ্যন্তরীণ 'দড়ি টানাটানি'র প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরস্পরবিরোধী প্রকাশ্য বক্তব্যে।
কিছু কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা ট্রাম্পকে সতর্ক করছেন, ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার কারণে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। এর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক মাশুল গুনতে হতে পারে ট্রাম্পকে। অন্যদিকে কিছু কট্টরপন্থি নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলা অব্যাহত রাখতে চাপ দিচ্ছেন। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা ও এসব আলোচনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার থেকে এ তথ্য জানতে পেরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
হোয়াইট হাউসের অন্দরের এই অচলাবস্থার ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক অভিযানের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বারবার বার্তা বদল, অন্দরমহলে নানা দৃষ্টিভঙ্গি
গত বছর ক্ষমতায় ফেরার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি 'গর্দভের মতো' কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ করবেন না। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে পরিস্থিতি বদলেছে। গত দু-সপ্তাহে এই যুদ্ধের জেরে টালমাটাল আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার, ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি বাণিজ্য।
ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণের এই প্রতিযোগিতা তার শাসনামলের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। তবে এবার এর ফলাফল বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে যুদ্ধ ও শান্তির ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছিলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলিতে তা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন ট্রাম্প। এখন তার দাবি, এই হামলা আদতে একটি 'সীমিত অভিযান' এবং এর সিংহভাগ উদ্দেশ্যই পূরণ হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই বার্তা অনেকের কাছেই এখনও অস্পষ্ট। বিশেষ করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরস্পরবিরোধী মন্তব্যে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বুধবার কেন্টাকিতে একটি নির্বাচনি ধাঁচের সভায় ট্রাম্প ঘোষণা করেন, 'আমরা যুদ্ধে জিতে গিয়েছি।' পরক্ষণেই আবার অবস্থান বদলে তিনি বলেন, 'আমরা কি সময়ের আগে চলে আসতে চাই? না, আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।'
ট্রেজারি বিভাগ ও ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা ও অর্থনৈতিক উপদেস্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। তাদের আশঙ্কা, তেলের বাজারে বড়সড় ধাক্কা লাগলে এবং জ্বালানির দাম বাড়লে যুদ্ধের পক্ষে দেশের ভেতরে জনসমর্থন দ্রুত কমতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপদেষ্টাসহ আরও দুই সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
সূত্রমতে, একই সুর শোনা গেছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের কথায়ও। চিফ অভ স্টাফ সুজি ওয়াইলস ও ডেপুটি চিফ জেমস ব্লেয়াররা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। তারা ট্রাম্পকে পরামর্শ দিচ্ছেন, জয়ের সংজ্ঞাকে যেন অকারণ দীর্ঘায়িত না করে একে 'সীমিত অভিযান' হিসেবে তুলে ধরে দ্রুত কাজ শেষ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, টম কটন ও সংবাদ ভাষ্যকার মার্ক লেভিনের মতো কট্টরপন্থিরা চাইছেন ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় থাকুক। তাদের যুক্তি, ইরানকে যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে হবে। পাশাপাশি মার্কিন সেনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলারও কড়া জবাব দিতে হবে।
তৃতীয় আরেকটি পক্ষ হলো ট্রাম্পের জনতুষ্টিবাদী সমর্থক গোষ্ঠী এবং কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন ও ডানপন্থি টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসনের মতো ব্যক্তিরা। তারা চাইছেন না আমেরিকা আবার মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। তারা এই বিষয়ে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি করছেন।
ট্রাম্পের ওই উপদেষ্টা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে একসঙ্গে সব পক্ষকে খুশি রাখতে চাইছেন। 'তিনি কট্টরপন্থিদের বোঝাচ্ছেন অভিযান চলছে, বাজারকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, আর নিজের সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন যে এই সংঘাত আর বাড়বে না।'
মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, 'এই কাহিনি কিছু বেনামি সূত্র, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো আলোচনাতেই উপস্থিত থাকেন না, তাদের গুজব ও জল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট একজন ভালো শ্রোতা এবং অনেকের মতামত নেন—এটি সবারই জানা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার যে শেষপর্যন্ত তারই হাতে এবং নিজের বার্তার সেরা বাহক তিনি নিজেই, তা সবারই জানা। প্রেসিডেন্টের পুরো টিম এখন 'পারেশন এপিক ফিউরি-র লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জনের জন্য একাগ্র হয়ে কাজ করছে।'
এই আলোচনায় যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিরা রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেননি।
যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পেছনে জোরালো কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনও সম্ভাব্য ইরানি হামলা রোখা, কখনও দেশটির পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া, কখনও বা তেহরানের সরকার পরিবর্তন—বারেবারে বদলেছে হোয়াইট হাউসের যুদ্ধের লক্ষ্য।
কিন্তু এখন এক অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। কিছু সমালোচকের মতে, ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলার পরেও দমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই ইরানের।
শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা যুদ্ধ শুরুর আগেই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, গোড়ায় তা কানে তোলেননি ট্রাম্প। তবে চলতি সপ্তাহে টালমাটাল বাজারকে আশ্বস্ত করতে এবং তেল-গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছেন তিনি। খুব সম্ভব এর নেপথ্যে রয়েছেন তার শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুদ্ধের অভিঘাতকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। একে স্রেফ 'সাময়িক অভিযান' বলে বর্ণনা করে তিনি দাবি করেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। মূলত এক অনিশ্চিত যুদ্ধের আতঙ্ক কাটাতেই তার এই মরিয়া চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন, সামরিকভাবে অন্তত একে 'বিজয়' হিসেবে ঘোষণা করে যুদ্ধের ইতি টানতে। তাদের পরামর্শ, হামলায় টার্গেট করা ইরানের অধিকাংশ নেতৃত্ব এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ যদি টিকে থাকেও, তবু যেন তিনি একে সাফল্য হিসেবে প্রচার করেন।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের দফায় দফায় হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় দু-হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রথম সারির ইরানি নেতাকে। এমনকি লেবাননের মতো দূরবর্তী স্থানেও হামলা চলেছে। ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডার গুঁড়িয়ে দেওয়া, প্রায় সম্পূর্ণ নৌবাহিনীর ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা খর্ব করার মতো সাফল্য দাবি করছে আমেরিকা।
কিন্তু এই তথাকথিত সামরিক সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ ও অবকাঠামোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলায়। এর জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, এই যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন। যদিও প্রাথমিক ঘোষণায় চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। তবে তার উপদেষ্টাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
যুদ্ধ এখন ছড়িয়ে পড়েছে অন্তত আধডজন দেশে। এই যুদ্ধ শুরু করার তার কারণগুলো বারেবারে বদলে যাওয়ায় আগামী দিনে কী ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে ধন্ধ বাড়ছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, ইরানও নিজেদের জয়ী হিসেবেই দাবি করবেন। কারণ, আমেরিকা-ইসরায়েলের প্রবল আক্রমণ সামলে তারা শুধু টিকেই থাকেনি, বরং পাল্টা আঘাত হেনে ইসরায়েল ও আমেরিকার মিত্রদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি করতে পেরেছে।
ভেনেজুয়েলা-মডেলে ইরান জয়ের ভুল অঙ্ক
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির ওপর। বিশ্বের মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হয় এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে, যা এখন কার্যত রুব্ধ। গত কয়েকদিনে ইরাকি জলসীমায় একাধিক তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই জলপথ তারা বন্ধই রাখবেন।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই দাপট যদি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়, তবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রবল রাজনৈতিক চাপে পড়বেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দখল ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকান পার্টি।
তেহরানের সরকার পাল্টে দেওয়ার হুঙ্কার থেকে ইদানীং পিছু হটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন এত দ্রুত হওয়া সম্ভব নয়।
আসলে যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে এই বিভ্রান্তির কিছুটা হলেও মূলে রয়েছে ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার ত্বরিত সাফল্য। জানুয়ারির শুরুতে ঝটিকা অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করেছিল মার্কিন বাহিনী। প্রশাসনের অন্দরমহল সূত্রে খবর, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাকে বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছেন যে ভেনেজুয়েলা আর ইরান এক নয় এবং সেখানে ওরকম কিছু করতে পারার সম্ভাবনাও কম।
ওই অভিযানের ফলে ভেনেজুয়েলায় মাদুরো-ঘনিষ্ঠদের চাপ দিয়ে খুব সহজেই দেশটির তেল ভান্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে ওয়াশিংটন। কোনো যুদ্ধেরও প্রয়োজন পড়েনি।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন। তেহরানের ধর্মীয় ও নিরাপত্তা কাঠামো অনেক বেশি সুসংহয়ত এবং তারা সামরিকভাবেও অনেক শক্তিশালী।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, মার্কিন সেনার হতাহতের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ে, তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তির সমর্থন নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
