যে কারণে হাইতির বিশ্বকাপের জার্সি নিষিদ্ধ করল ফিফা
২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল খেলোয়াড়দের পোর্ট্রেট বা ছবিগুলো চলতি সপ্তাহে প্রকাশ পাওয়ার পরই অদ্ভুত এক কাণ্ড নজরে আসে সবার। সাধারণত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর খেলোয়াড়রা নিজ নিজ দেশের জার্সি পরে গম্ভীর বা কোনো কোনো সময় হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে পোজ দেন। যেমন এবারের বিশ্বকাপের পোর্ট্রেটে সুইডেনের ম্যানেজার গ্রাহাম পটারকে একটি কাউবয় হ্যাট পরে পোজ দিতে দেখা গেছে।
কিন্তু গত মঙ্গলবার রাতে যখন ছবিগুলো প্রকাশ করা হয়, তখন সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়টি দেখা যায় হাইতির খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে। ছবিতে তাদের গায়ে যে জার্সিটি দেখা গেছে, তা কয়েক মাস আগে উন্মোচিত করা এবং প্রীতি ম্যাচগুলোতে তাদের পরা জার্সির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোর্ট্রেটে হাইতির খেলোয়াড়দের পরনে ছিল অত্যন্ত সাধারণ ডিজাইনের নীল রঙের হোম জার্সি, যার লাল কলার এবং সামান্য কিছু রঙের ছোঁয়া ছাড়া আর কোনো বিশেষ নকশা ছিল না। অথচ, তাদের যে জার্সিটি পরার কথা ছিল, তার নকশাটি ছিল দারুণ আকর্ষণীয় এবং অর্থবহ।
কলম্বিয়ান ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'সায়েতা'র ডিজাইন করা সেই জার্সিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল হাইতিয়ান বিপ্লবের এক ঐতিহাসিক চিত্র। যেখানে প্রাক্তন ক্রীতদাস জঁ-জ্যাক দেসালিনের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ফরাসি উপনিবেশবাদীদের পরাস্ত করেছিলেন। ১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর 'ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধে' একদল মুক্তিকামী মানুষকে লাল ও নীল রঙের একটি ছিন্নভিন্ন পতাকা ওড়াতে দেখা যায়—এর মাত্র কয়েক মাস পরেই হাইতি নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছিল।
অবশ্য এটি ইতিহাসের হুবহু চিত্রায়ণ ছিল না। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, হাইতির ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও 'দ্য ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট কিং অব হাইতি' বইয়ের লেখক মারলেন ডট ব্যাখ্যা করেন, ওই যুদ্ধে এমন কোনো পতাকা উত্তোলনের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। মারলেন বলেন, 'এটি মূলত হাইতিয়ান বিপ্লবের প্রতীকী সমাপ্তি ছিল। এরপর ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে হাইতির মানুষ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ক্যাপ-হাইতিয়েন শহরে ভের্তিয়েরেসের একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। এই বন্দর শহরটি দিয়েই প্রায় ৯ লাখ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক ক্রীতদাস হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছিল।'
ইতিহাসে এটিকে একমাত্র সফল ক্রীতদাস বিদ্রোহ মনে করা হয়, যেখানে ক্রীতদাসেরা তাদের শাসকদের উৎখাত করে নিজেরাই দেশ শাসন করেছিল। মারলেন ডটের ভাষায়, 'তারা সমগ্র আমেরিকাজুড়ে প্রথম দাসত্বমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল এবং বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে স্থায়ী ও আইনিভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছিল।'
হাইতির হোম, অ্যাওয়ে এবং থার্ড—তিনটি জার্সিতেই (যথাক্রমে নীল, সাদা ও লাল রঙে) এই একই ঐতিহাসিক নকশা ব্যবহার করা হয়েছিল। জার্সিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সাড়ম্বরে উন্মোচন করে বলা হয়েছিল: 'এটি কেবল একটি জার্সি নয়; এটি হাইতির মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমাদের ইতিহাস কেবল মুখে বলার বিষয় নয়—এটি গায়ে জড়ানো, রক্ষা করা এবং গর্বের সঙ্গে খেলার বিষয়।'
উন্মোচনের পর এটি তুমুল সাড়া ফেলে। প্রথম চালানের সব জার্সি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। অবশ্য এর পেছনে জার্সির নকশার চেয়ে ৫২ বছর পর হাইতির প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার আবেগের ভূমিকাও হয়তো ছিল, তবে ইতিহাসকে ধারণ করার এই অনুভূতি সবাই বেশ ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল।
পেরু এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বুট ক্যাম্পের প্রীতি ম্যাচগুলোতে দলটিকে এই ঐতিহাসিক নকশার নীল হোম ও সাদা অ্যাওয়ে জার্সি পরেই খেলতে দেখা যায়। কিন্তু গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই জার্সিটি উধাও হয়ে যায় এবং তার জায়গায় আসে অতি সাধারণ ডিজাইনের এক নতুন জার্সি। পরে রাতে সায়েতার পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে সায়েতা জানায়: 'সায়েতা যে চূড়ান্ত নকশা উপস্থাপন করেছিল, তা হাইতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রতিদিন অবদান রাখা নারী-পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য করা হয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক বিবৃতির উদ্দেশে নয়।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সময় ফিফা মনে করে যে, এই জার্সির কিছু ভিজ্যুয়াল এলিমেন্ট (দৃশ্যমান উপাদান) ফিফার কিটসংক্রান্ত নিয়মের অধীনে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। ফলে তারা নকশাটি পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়। এই ব্যাখ্যা আমাদের উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন হলেও, সায়েতা এই প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়েছে এবং ফিফার চূড়ান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে।'
ফিফা অবশ্য দাবি করেছে যে এটি শেষ মুহূর্তের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। তারা কয়েক সপ্তাহ আগেই সায়েতা এবং হাইতি ফুটবল ফেডারেশনকে এই সমস্যার কথা জানিয়েছিল। ফিফার দাবি, উভয় পক্ষই বিষয়টি বুঝতে পেরে বিতর্কিত ছবিটি সরাতে সম্মত হয়েছিল। সায়েতার বিবৃতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। তবে বুধবার 'দ্য অ্যাথলেটিক' সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হাইতি ফুটবল ফেডারেশনের এক মুখপাত্রের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সবাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিলেন না।
হাইতি দলের একজন মুখপাত্র বলেন, 'ভুল ব্যাখ্যার কারণে ফিফা কর্মকর্তারা আমাদের ফেডারেশনকে ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরদের পতাকা ওড়ানোর ছবিটি জার্সি থেকে বাদ দিতে বলেন।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ভের্তিয়েরেস হলো আমাদের স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধক্ষেত্র, যা ১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল। কী অদ্ভুত কাকতালীয় বিষয়, ২০২৩ সালের ১৮ নভেম্বরই হাইতি দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল! ফেডারেশন এই বিষয়ে নতুন কোনো বিবৃতি দেয়নি; তারা কেবল সায়েতাকে নকশাটি পরিবর্তন করতে বলেছিল।'
ফিফার দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়মের ব্যাখ্যা বেশ সোজাসাপ্টা। ২০ ২৬ বিশ্বকাপের নিয়মের ২৮.১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খেলা চলাকালীন, খেলার আগে বা পরে কোনো দলের খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা তাঁদের জার্সি, পোশাক বা অন্য কোনো সরঞ্জামে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা স্লোগান প্রদর্শন করতে পারবেন না।
সহজ কথায়, পটভূমি বিবেচনা না করলে যেকোনো বিপ্লবের চিত্রই একটি রাজনৈতিক বিবৃতি। আর যদি একটু বাড়িয়ে বলা হয়, এই জার্সিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবের গল্প, অথচ চলতি বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট পর্বেই হাইতিকে হয়তো ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি রাজনৈতিক জটিলতা বা প্রতিপক্ষকে অসম্মান করার কারণ হতে পারত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ থেকে ২২০ বছর আগের একটি দাসপ্রথাবিরোধী এবং উপনিবেশবাদকে হটিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ের একটি ঐতিহাসিক প্রতীকী ছবি নিয়ে কার আপত্তি থাকতে পারে?
মারলেন ডট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমি ভাবছি ফিফার যেসব কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা আসলে ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ সম্পর্কে কতটা জানেন!'
তিনি আরও বলেন, 'স্বয়ং ফরাসিদেরও এই ইতিহাস নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। গত বছর প্যারিসের 'পালে দো টোকিও'তে হাইতিয়ান বিপ্লবের অন্যতম নায়ক অঁরি ক্রিস্তোফের ওপর একাধিক প্রদর্শনী হয়েছে। ফরাসিদের কাছ থেকে হাইতি যে ক্ষতিপূরণ আদায় করেছিল, তা নিয়ে 'কলেজ দো ফ্রান্স' একটি বড় সম্মেলন করেছে। ফরাসিরাই যেখানে আপত্তি করছে না, সেখানে অন্য কার খারাপ লাগবে?'
মারলেনের মতে, এটি ইতিহাস দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে নির্দেশ করে। ফিফার কর্মকর্তারা রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ী—যারা ইতিহাসকে দেখেন বিভাজন ও দ্বন্দ্বের জায়গা হিসেবে। অন্যদিকে হাইতির মানুষ ইতিহাসকে এমন কিছু মনে করে, যা সবাই একসাথে উদযাপন করে।
এর বিপরীতে বলা যেতে পারে, কে কষ্ট পেল বা কার আপত্তি আছে সেটি বড় কথা নয়; বরং ফিফাকে তার নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে বজায় রাখতে হয়। কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের কঠোর এবং অন্ধ নিয়ম কেবল বাস্তবতার পরিপন্থীই নয়, অবাস্তবও বটে। কারণ এই বিশ্বকাপেই এমন অনেক প্রতীক রয়েছে যা সরাসরি রাজনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।
যেমন ইরানের জাতীয় পতাকা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির পতাকায় একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীক যুক্ত করা হয়, যা বর্তমানে 'ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান'-এর প্রতিনিধিত্ব করে। ফিফার পক্ষে কোনো দেশের জাতীয় পতাকা নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়, তবে কঠোর নিয়মের মারপ্যাঁচে এটিও কিন্তু ফিফার নিয়মকে এক অর্থে লঙ্ঘন করে।
এমন ঘটনা ক্রীড়াঙ্গনে এবারই প্রথম নয়। চলতি বছর শীতকালীন অলিম্পিকে হাইতির স্কিয়িং দলের পোশাকে বিপ্লবী নেতা তুসাঁ লুভারতুনের ঘোড়ায় চড়া ছবি শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়েছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত স্কিয়ারদের শুধু একটি ঘোড়ার ছবি সংবলিত হাস্যকর ডিজাইনের পোশাক পরে অংশ নিতে হয়। ২০২০ ইউরো কাপে ইউক্রেনের জার্সিতে দেশটির মানচিত্র নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, যেখানে ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক দখল করা 'ক্রিমিয়া' অংশটিকে ইউক্রেনের মানচিত্রে রাখা হয়েছিল।
বিশ্বকাপের মতো আসরে সামান্য জার্সি পরিবর্তন হয়তো বিশাল কোনো বিপর্যয় নয়। পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত করা হয়েছে এবং কেউ তেমন জোরালো প্রতিবাদও করেনি। তবে ফুটবল বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে ফিফার উচিত ছিল এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়িয়ে দলগুলোকে খেলতে দেওয়া।
অবশ্য মারলেন ডট মনে করেন, এই ঘটনা হাইতির ইতিহাসের জন্য একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। কারণ ফিফা আসলে এক ধরনের 'স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট' [কোনো তথ্য গোপন করার চেষ্টা করলে তা আরও বেশি মানুষের নজরে আসা] তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, 'ফিফা জার্সিটি নিষিদ্ধ করায় এখন মানুষ ইন্টারনেটে এই ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, তারা হাইতির এই ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানতে চান। ফিফা আসলে ইতিহাস আড়াল করতে গিয়ে তা আরও বেশি মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে।'
বর্তমানে সায়েতার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ সংবলিত পুরোনো ডিজাইনের নীল হোম এবং লাল থার্ড জার্সিটি বিক্রির জন্য রয়েছে। আপনি যদি এই ঐতিহাসিক কিন্তু নিষিদ্ধ জার্সিটি নিজের সংগ্রহে রাখতে চান, তবে আর দেরি না করে এখনই কিনে নিতে পারেন!
