দুটি ফোন আর একটি অ্যাপ: পুতিনের ডিজিটাল নিষেধাজ্ঞা যেভাবে ফাঁকি দিচ্ছেন রুশরা
বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই এবং ভালো কফির জন্য পরিচিত একটি ছিমছাম ক্যাফেতে বসে কাজ করছিলেন এক রুশ ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। তিনি তার ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন চালু করে বিদেশে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করছিলেন, কারণ রাশিয়ায় এটি নিষিদ্ধ।
কিছুক্ষণ পর রাশিয়ার রেলওয়ে ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কাটার জন্য তিনি ভিপিএন বন্ধ করেন। কারণ, আসল অবস্থান গোপন করে এমন কাউকে এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। এরপর তিনি আরেকটি ফোন হাতে নেন। রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপ 'ম্যাক্স'-এ তার ক্লায়েন্টদের কোনো বার্তা এসেছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্যই তার এই দ্বিতীয় ফোন।
চলতি বছর ইন্টারনেট ও সাইবারজগতের ওপর ক্রেমলিন তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এর পর থেকে রাশিয়ানরা হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জারের মতো জনপ্রিয় বিদেশি অ্যাপগুলো ব্যবহার করতে জটিল সব প্রযুক্তিগত সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আমলে এটিই ইন্টারনেটের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। ক্রেমলিনপন্থী বিরোধী দল, বিখ্যাত ব্লগার ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই কড়াকড়ি অনেক সময় ব্যাংকিং, পরিবহন এবং ই-কমার্স ব্যবস্থাকেও ব্যাহত করেছে। এর ফলে সেপ্টেম্বরে হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচনের আগে মানুষের মধ্যে চরম বিরক্তি তৈরি হয়েছে। এমনকি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা কিছু সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারও এই বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছেন।
ইন্টারনেটের ওপর এই বিধিনিষেধ, সেই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, কর বৃদ্ধি এবং যুদ্ধক্লান্তি—সব মিলিয়ে পুতিনের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে পুতিনের পক্ষে জনসমর্থন ছিল ৭৫.১ শতাংশ, যা এপ্রিলে কমে ৬৫.৬ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর এটিই তার সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তা। যদিও বর্তমানে এই হার কিছুটা বেড়ে প্রায় ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
'ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব' প্রতিষ্ঠার নামে কর্মকর্তারা রাশিয়ানদের বিদেশি অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের বদলে রাষ্ট্র-সমর্থিত বিকল্পগুলো ব্যবহারে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন। তবে ক্রেমলিনের সমালোচক এবং কিছু পশ্চিমা প্রযুক্তি কোম্পানির সতর্কবার্তার পর অনেক ব্যবহারকারী এগুলো ব্যবহারে ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, ম্যাক্স অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে অ্যাপটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ভিকে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
৪১ বছর বয়সী ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ইরিনা বলেন, 'নিরাপত্তার কথা ভেবেই ম্যাক্স অ্যাপটি দ্বিতীয় একটি ফোনে আলাদা করে রাখি।'
স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নিজের পুরো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরিনা বলেন, 'অবশ্যই এটা একটা বিশাল ভোগান্তি, কিন্তু আমাদের আর কী-ই বা করার আছে? একটা সময় এসব অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। সারা দিন ভিপিএন অন-অফ করা, বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে ঢুঁ মারা, আলাদা ভার্চ্যুয়াল দেশ নির্বাচন করা কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ফোন ব্যবহার করা—এসব করেই দিন কেটে যায়।'
ভিপিএন ডাউনলোডে রেকর্ড
ভিপিএন মূলত রাশিয়ার বাইরের কোনো প্রাইভেট সার্ভারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করে, যাতে তার অবস্থান গোপন থাকে।
মস্কোভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ডিজিটাল বাজেট'-এর তথ্যের বরাত দিয়ে রাশিয়ান দৈনিক 'কোমারসান্ত' জানিয়েছে, কেবল মার্চ মাসেই গুগল প্লে স্টোর থেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় পাঁচটি ভিপিএন সার্ভিস ৯২ লাখ বার ডাউনলোড করা হয়েছে। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি।
লিসবনে বসবাসকারী রাশিয়ান ইন্টারনেট স্বাধীনতা কর্মী সারকিস দারবিনিয়ান বলেন, 'আমরা আগে কখনো এত বেশি হারে ভিপিএন ডাউনলোড হতে দেখিনি।'
তবে মস্কো দারবিনিয়ানকে 'ফরেন এজেন্ট' বা বিদেশি চর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। রাশিয়াবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত মনে করলে রাশিয়া এই তকমা ব্যবহার করে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বারবার বলেছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার এই 'অস্তিত্ব রক্ষার' লড়াইয়ে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। তবে এপ্রিলে পুতিন সুর নরম করেন। তিনি আইনপ্রণেতাদের বলেছিলেন, 'শুধু নিষেধাজ্ঞা এবং কড়াকড়ির ওপর জোর দেওয়াটা হিতে বিপরীত হতে পারে।'
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি রুশ সরকারি কর্মকর্তারা।
বিশ্বের অনেক স্বৈরতান্ত্রিক দেশেই ইন্টারনেট ব্যবহারে কড়া নিয়ম থাকে। তবে রাশিয়ানরা বেশ আগে থেকেই অনলাইনে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে আসছিলেন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভেতরের সমালোচকদের চুপ করিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে বিদেশি অ্যাপ ব্যবহার বা পশ্চিমা মিডিয়া কনটেন্ট দেখার ক্ষেত্রে খুব একটা বাধা দিত না।
কিন্তু গত বছর থেকে এফএসবি (সোভিয়েত আমলের কেজিবি'র উত্তরসূরি) নিরাপত্তা সংস্থা সারা দেশের টেলিকম কোম্পানিগুলোকে কয়েক দিন ধরে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে আসছে। তাদের দাবি, ইউক্রেনীয় আক্রমণকারী ড্রোনগুলো এই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে পথ খুঁজে পেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা রস্কমনাডজোর অনেক অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের সংযোগ ধীর বা পুরোপুরি ব্লক করে দিচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এগুলো অবৈধ এবং চরমপন্থী কনটেন্ট ছড়ানোর প্ল্যাটফর্ম।
অন্যদিকে, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রাম রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে তারা মানুষকে অপেক্ষাকৃত কম নিরাপদ ও সরকার নিয়ন্ত্রিত অ্যাপ ব্যবহারে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র এবং কয়েকজন বিশ্লেষক জানিয়েছেন, মার্চ মাসে মস্কোয় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত ছিল। এর ফলে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারাও বিরক্ত হন, কারণ ক্ষমতাসীন 'ইউনাইটেড রাশিয়া' দলের জন্য ভোট জোগাড় করতে তাদের ইন্টারনেট এবং টেলিগ্রামের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো তাতিয়ানা স্টানোভায়া গত এপ্রিলে লিখেছিলেন, 'সরকার তার কাঙ্ক্ষিত ফল পাবে কি না, সেটা কোনো বিষয় নয় (তারা সেটা পাবেই), বরং আসল বিষয় হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়াটা মসৃণ হবে কি না।'
রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, এমনকি সরকারের অনুগত কর্মকর্তারাও এখন ভিপিএন ডাউনলোড করছেন এবং একাধিক ফোন ব্যবহার করছেন, যাতে ম্যাক্স-এর মতো সরকার-সমর্থিত অ্যাপগুলো তাদের ব্যক্তিগত ডিজিটাল জীবন থেকে আলাদা থাকে।
একটি সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থা যাতে নজরদারি করতে না পারে, সে জন্য অনেকেই ম্যাক্স ইনস্টল করা ডিভাইসের মাইক্রোফোন এবং ক্যামেরা খুলে ফেলছেন।
ওই সূত্র বলে, 'আপনি খারাপ কিছু না করলেও, কেউ চায় না যে গোয়েন্দা সংস্থা তার ব্যক্তিগত মেসেজ পড়ুক।'
ইঁদুর-বিড়াল খেলা
পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ নিজের ভিপিএন ব্যবহারের কথা মোটেও লুকান না। তিনি নিয়মিত এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন, যা ভিপিএন ছাড়া রাশিয়ার ভেতর থেকে ব্যবহার করা অসম্ভব।
ভিপিএন ব্যবহার করা অবৈধ না হলেও, নিয়ন্ত্রক সংস্থা রস্কমনাডজোর শত শত ভিপিএন সেবা ব্লক করে দিয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরকারের একধরনের 'ইঁদুর-বিড়াল খেলা' শুরু হয়েছে। কারণ, ব্লক হয়ে গেলে ব্যবহারকারীদের নতুন করে অন্য কোনো ভিপিএন ডাউনলোড করতে হয়।
গত এপ্রিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে সরকারি অফিস, ব্যাংক এবং বড় বড় অনলাইন বিক্রেতারা ভিপিএন চালু থাকা ব্যবহারকারীদের তাদের সাইট ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেয়। ডিজিটাল বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, ঠিক ওই সময়েই রাশিয়ার অ্যামাজন-খ্যাত 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর ইন্টারনেট ট্রাফিক ১০ শতাংশ কমে যায়।
মার্চ মাসে যখন মস্কোয় নেভিগেশন অ্যাপগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন অনলাইন ফুল ও উপহারের মার্কেটপ্লেস ফ্লোওয়াও-এর ডেলিভারির জন্য চালকেরা এক ভিন্ন পথ বেছে নেন। সাইটের লজিস্টিক প্রধান ইউরি সেমিচাস্টনভ জানান, তারা তখন বিক্রেতাদের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে গ্রাহকের ঠিকানার ম্যাপ ডাউনলোড করে নিতেন।
ওয়াইল্ডবেরিজের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় রাজধানীতে কাগজের মানচিত্রের বিক্রি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল।
জনগণের মধ্যে বিরক্তি বাড়তে থাকায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রেমলিন তাদের সুর কিছুটা নরম করেছে এবং জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেছে যে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার বিষয়টি সাময়িক।
গত মে মাসে রুশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মাসে ১৫ গিগাবাইটের বেশি বিদেশি ডেটা ব্যবহার করলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়ার একটি পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে। ভিপিএন ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নেওয়া এই নিয়মটি সম্ভবত নির্বাচনের পর কার্যকর করা হবে।
এদিকে ইন্টারনেট নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও পুতিন নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের মতো জরুরি পরিষেবাগুলো সচল থাকে।
তবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ইরিনা মনে করেন না যে, তার ডিজিটাল জীবন খুব শীঘ্রই সহজ হবে। তিনি বলেন, 'রাশিয়ায় আমাদের একটা প্রবাদ আছে: সাময়িক জিনিসের চেয়ে স্থায়ী আর কিছুই নেই।'
