বিশ্বে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এখন ১২,১৮৭—৮৩ শতাংশই রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের দখলে
বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রধারী ৯টি দেশ তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে এই প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্রসজ্জা 'নতুন ঝুঁকি' তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)।
সোমবার (৮ জুন) প্রকাশিত সিপ্রি'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ গত বছর নতুন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করেছে। এতে আরও বলা হয়, দেশগুলোর পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বিগত কয়েক দশকের নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে উল্টো পথে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা বাড়ছে।
সিপ্রি'র গবেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, "পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো তাদের নিরস্ত্রীকরণ অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা থেকে সরে আসছে—এমন প্রমাণ জোরালো হচ্ছে। এর পরিবর্তে তারা এখন তাদের পারমাণবিক শক্তির মহড়া দিচ্ছে।"
সিপ্রি'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ—চীন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র—চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের অধিকারী। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি ওয়ারহেড সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য সামরিক মজুদে রাখা হয়েছে।
গবেষকরা জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ১২টি ওয়ারহেড বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র ও উড়োজাহাজে মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০টি ওয়ারহেড রাখা হয়েছে 'হাই অ্যালার্ট' বা উচ্চ সতর্কাবস্থায়, যার অর্থ হলো এগুলো মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। এই উচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা ওয়ারহেডগুলোর প্রায় সবই রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের। তবে সামান্য কিছু ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যেরও রয়েছে।
রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তি। সামরিক ব্যবহারের উপযোগী ওয়ারহেডগুলোর ৮৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৬ শতাংশই এই দুই দেশের কব্জায়। সিপ্রি জানিয়েছে, যদিও এই সংখ্যা ২০২৫ সালের তুলনায় খুব একটা হেরফের হয়নি, তবে দেশগুলোর 'ব্যাপক' আধুনিকায়ন কর্মসূচি ভবিষ্যতে তাদের অস্ত্রাগারের আকার ও বৈচিত্র্য আরও বাড়াবে বলেই মনে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ ক্রমাগত কমার যে প্রবণতা ছিল, সামনের বছরগুলোতে তা বদলে যেতে পারে। এর কারণ হিসেবে প্রধান শক্তিগুলো কর্তৃক পুরোনো ওয়ারহেড ধ্বংস করার গতি কমে যাওয়া এবং নতুন অস্ত্র মোতায়েনের গতি বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে।
সিপ্রি'র মতে, চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ—যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম—গত এক বছরে ৬০০ থেকে বেড়ে ৬২০টিতে দাঁড়িয়েছে। দেশটি অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বড় করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য গত বছর তাদের অস্ত্রাগার বাড়িয়েছে বলে মনে না হলেও সিপ্রি বলছে, দেশটির সক্রিয় ওয়ারহেড মজুদ ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফ্রান্স তাদের সক্ষমতা আধুনিকায়ন অব্যাহত রেখেছে এবং একই সাথে ওয়ারহেডের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে ফরাসি সরকার জানিয়েছে, তারা এখন থেকে তাদের অস্ত্রাগারের আকার নিয়ে জনসমক্ষে কোনো তথ্য দেবে না।
সিপ্রি আরও জানায়, ভারত ২০২৫ সালেও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার কিছুটা বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটি নতুন ধরনের অস্ত্র বহনকারী ব্যবস্থা বা 'ডেলিভারি সিস্টেম' তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে প্রতিবেশী পাকিস্তানও তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং পারমাণবিক জ্বালানি বা 'ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল' জমা করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করলেও সিপ্রি'র অনুমান অনুযায়ী দেশটির কাছে ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে। দেশটি তাদের সক্ষমতা আধুনিকায়ন করছে এবং ২০২৫ সালে দিমোনার কাছে নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে নির্মাণকাজ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত উন্নতির সংকেত দিচ্ছে।
পরিশেষে, উত্তর কোরিয়া সম্ভবত মোট ৬০টি ওয়ারহেড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্রাগারের 'জ্যামিতিক হারে' প্রসারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সিপ্রি'র পরিচালক করিম হাজ্জাজ বলেন, "বিশ্বের অনেক নেতাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কোনো শত্রু রাষ্ট্রের হামলা থেকে সুরক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা কৌশলকে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করা—পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।"
