ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে যেভাবে নতুনভাবে গড়তে পারে
আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তি কংগ্রেস, ফেডারেল রিজার্ভ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে নাও আসতে পারে। এটি আসতে পারে ভেনেজুয়েলা থেকে। বাজার এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি, ঠিক কী ঘটেছে। কিন্তু, বাস্তবতা হলো—বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অধীনে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেল রিজার্ভের প্রবেশাধিকার আবারও উন্মুক্ত করেছে। এই বিপুল তেলের সরবরাহ মার্কিন বাজারে একপাক্ষিকভাবে আসা এমন এক সম্ভাবনার কথাও বলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, জাতীয় নিরাপত্তা এবং এমনকি দেশটির শেয়ারবাজারের মূল্যায়নকে আমূল বদলে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান নিয়ে, প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াগুলো রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং স্বল্পমেয়াদি তেলের দামের ওঠানামার দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। কিন্তু এখনো পুরোপুরি বিশ্লেষণ করা হয়নি—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে একটি স্থায়ী পরিবর্তন কীভাবে মূল্যস্ফীতি, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতি, ডিসকাউন্ট রেট এবং শেয়ারবাজারের বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি কোনো রাজনৈতিক যুক্তি নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও বাজার কাঠামোর যুক্তি। যদি ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তাহলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের জন্য এর প্রভাব হবে গভীর। ফলে এটি সামান্য পরিবর্তন নয়; বরং হবে কাঠামোগত রূপান্তর।
ভেনেজুয়েলার তেল ও যার পরিমাণ সবাই অবমূল্যায়ন করে এসেছে
ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত জীবাশ্ম জ্বালানি তেলের রিজার্ভ রয়েছে। যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। ফলে ভেনেজুয়েলা কোনো প্রান্তিক উৎপাদক নয়, কিংবা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের কেবলমাত্র ভারসাম্য রক্ষাকারী নয়। এটি এমন এক রিজার্ভ, যা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্য নির্ধারণের গতিপথ পাল্টে দিতে সক্ষম।
কিন্তু, মূল্যায়নের সে আলোচনায় যাওয়ার আগে বোঝা জরুরি, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার অবস্থান কোথায়।
বৈশ্বিক তেল রিজার্ভ, উৎপাদক দেশ ও সেখানকার শাসনব্যবস্থা
দুটি বিষয় সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়। প্রমাণিত রিজার্ভের দিক থেকে ভেনেজুয়েলা বিশ্বে শীর্ষে। অন্যদিকে, উৎপাদন দক্ষতায় সাধারণত 'গণতান্ত্রিক' (পশ্চিমা) দেশগুলো এগিয়ে আছে, রিজার্ভের মালিকানায় নয়। মজুদের অধিকারী না হয়েও উৎপাদন সক্ষমতায় পশ্চিমাদের এগিয়ে থাকার কারণ শুধুমাত্র ভূতাত্ত্বিক নয়; বরং শাসনব্যবস্থা, পুঁজি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার সমন্বয়। যেটা বিভিন্ন দেশের তেল রিজার্ভ উত্তোলনে কাজ করা পশ্চিমাদের রয়েছে।
তাই একবার কোনো দেশ বা অঞ্চলের রিজার্ভের ব্যাপকতা বোঝার পরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে এর অর্থনৈতিক পরিসর উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
১৮ ট্রিলিয়ন থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাস্তবতা
আধুনিক সময়ের তেলের মূল্যচক্র ধরে—ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার থেকে ২০০৮ সালের প্রায় ১৫০ ডলারের শীর্ষ পর্যন্ত—ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভস্থ তেলের আনুমানিক বাজারমূল্য বিস্ময়কর।
এই পরিসরের নিম্ন প্রান্তে, ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মোট ভূগর্ভস্থ মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। আবার সর্বোচ্চ প্রান্তে, একই রিজার্ভভিত্তির মূল্য পৌঁছাতে পারে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে।
তুলনার জন্য বলা যায়, চলতি মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বছরে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক পর্যায়ে যা আনুমানিক ১১০ থেকে ১২০ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, তেলের মূল্যচক্রের ভিত্তিতে, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশেরও বেশি, এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশেরও বেশি।
পৃথিবীতে খুব কম সম্পদই—সরকারি বা বেসরকারি—এত বড় পরিসরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এ কারণেই ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহ শুধু জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের কাহিনি বলে না; একইসঙ্গে এটি জাতীয় সম্পদ ও সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাবনিকাশকেও তুলে ধরছে।
ভেনেজুয়েলার তেলের মূল্য 'ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'-এর সমান
যুক্তরাষ্ট্রের ইকুইটি বা শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের পরিচিত ভাষায় ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ বোঝাতে 'ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'-এর কথা ধরা যেতে পারে। মার্কিন পুঁজিবাজারে অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, এনভিডিয়া, মেটা প্ল্যাটফর্মস ও টেসলা—এই সাত জায়ান্ট কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ১৮ থেকে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার। এই মূল্যায়ন বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করলেও, গড় একটা হিসাব এখানে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি তেলের দামের নিম্ন অনুমানে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল রিজার্ভের মূল্যও প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। তাই দেশটির শাসকগোষ্ঠী উৎখাতের একটিমাত্র ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সম্পদের ওপর কার্যকর প্রভাব পুনরুদ্ধার করছে, যার রক্ষণশীল মূল্যও মার্কিন শেয়ারবাজারের—এবং সম্ভবত বিশ্বের—সাতটি সবচেয়ে প্রভাবশালী কোম্পানির সম্মিলিত মূল্যের সমান।
এই সাত কোম্পানি এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মোট মূল্যের ৩৭ শতাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। এটাই সেই সম্পদের পরিসর, যা আবার বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সমীকরণে প্রবেশ করছে। তাই এ তুলনা সম্পদের সরাসরি নগদায়ন বা মূল্যায়নের সমতা বোঝাতে নয়; বরং মাত্রা বোঝাতে ব্যবহার করাই যায়। ভেনেজুয়েলার তেল সক্ষমতার সামান্য অংশও উন্মুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং শেয়ারবাজারের মূল্যায়নে এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা সাধারণত বৈশ্বিক বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্থাৎ জ্বালানির বড় পুনর্মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত।
বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার
প্রেক্ষাপট ছাড়া বড় সংখ্যার অর্থ হারিয়ে যায়। ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের মাত্রা বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এটিকে পুরো জাতীয় অর্থনীতির আকারের সঙ্গে তুলনা করা।
তেলের সর্বোচ্চ দামে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত রিজার্ভের ভূগর্ভস্থ মূল্য প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ক পৃথিবীর বৃহত্তম দেশগুলোর বার্ষিক দেশজ উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্মিলিত জিডিপির প্রায় সমান।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ মূল্যচক্রে ভেনেজুয়েলার তেল রিজার্ভের মূল্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উৎপাদনশীল দেশগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদনের সমান বা তারও বেশি।
এর মানে এই নয় যে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ জিডিপির এককে রূপান্তরিত করে হিসাব করা হয়েছে, বা তেমনটা ধরা হচ্ছে। তবে এটি সম্পদের বিপুলতার ইঙ্গিত দেয়। যখন কোনো সম্পদ পুরো মহাদেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন তার আংশিক উন্মুক্তিও অস্বাভাবিক রকমের বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তিকর সত্য
জ্বালানি তেল কখনোই আদর্শবাদ, ন্যায়বিচার বা নৈতিকতার বিষয় ছিল না। এটি সবসময়ই ক্ষমতার বিষয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেল রিজার্ভগুলোর বেশিরভাগই অবস্থিত দুর্বল প্রতিষ্ঠান, উচ্চ দুর্নীতি বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দেশে।
এর ফলাফল দশকের পর দশক একই থেকেছে। পুঁজি পাচার হয়, অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। উৎপাদন ধসে পড়ে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ে। জ্বালানি তখনই রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়, যখন এটি আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
এই কাঠামোগত বাস্তবতাই ব্যাখ্যা করে কেন জ্বালানি বাজারে স্থায়ী ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম থাকে এবং কেন সেই ঝুঁকির সামান্য অংশও দূর হলে মূল্যস্ফীতি ও সম্পদমূল্যে অস্বাভাবিক প্রভাব পড়ে।
উদ্যোক্তা ঝুঁকি, নেতৃত্ব ও হিসাব করা বাজি
উদ্যোক্তা নেতৃত্ব—হোক ব্যক্তি, কোম্পানি বা রাষ্ট্র—কখনো কখনো হিসাব করে ঝুঁকি নেয়। কেউ তাতে সফল হয়, কেউবা হয় ব্যর্থ। আসল বিষয় হলো ঝুঁকিটি দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়নি, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সুবিধা দিতে পারে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সর্বোচ্চ সময়ে ভেনেজুয়েলা দৈনিক প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল বা তারও নিচে। সম্পদ সবসময়ই ছিল। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারেনি সরকার।
অনেক সম্পদসমৃদ্ধ দেশে নেতারা জাতীয় সম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফা ওইখাতের উন্নয়নে পুনঃবিনিয়োগ না করে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করেছেন। ফলাফল হয়েছে কম উৎপাদন, দুর্নীতি ও জাতীয় সম্পদের ক্ষয়।
এই পরিসরই বোঝায় কেন ভূতত্ত্ব নয়, বরং শাসন ও পুঁজি সুরক্ষাই নির্ধারণ করে সম্পদ বাড়বে নাকি ধসে পড়বে।
নর্থ সি: ঝুঁকি নেওয়া হলে সুফল যেভাবে ধরা দেয়
সব পুঁজি সুরক্ষার ব্যর্থতা দুর্বল রাষ্ট্রে ঘটে না। নর্থ সি বা উত্তর সাগর তেমন একটি উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফিলিপস পেট্রোলিয়াম বহু বছর ও বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এই একটি অঞ্চলে অনুসন্ধান চালায়, যাকে অনেকেই ব্যর্থ মনে করতেন। কোম্পানিটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আর্থিক ও বাস্তবায়ন ঝুঁকি নেয়।
কিন্তু যখন উত্তর সাগরের তলদেশে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং এর উৎপাদনের অর্থনীতি স্পষ্ট হয়, তখন ভারসাম্য বদলে যায়। ১৯৭৫ সালে নরওয়ে সরকার রাতারাতি ফিলিপস পেট্রোলিয়ামের তেল মুনাফার ওপর কর ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করে। রাষ্ট্র অনুসন্ধানে অর্থ দেয়নি, ঝুঁকিও নেয়নি, কিন্তু রাজস্ব ক্ষমতার মাধ্যমে অধিকাংশ সুফল দখল করে নেয়। আজ নরওয়ে মাথাপিছু জিডিপিতে বিশ্বের ধনীতম দেশগুলোর একটি এবং বিশ্বের বৃহত্তম সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর একটি পরিচালনা করে। এখান থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা আদর্শগত নয়, কাঠামোগত। উদ্যোক্তা ঝুঁকিই সম্পদ সৃষ্টি করে; অন্যদিকে পুঁজির সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থাকলে— শেষপর্যন্ত তা অন্য কেউ ওই খনিজ সম্পদের দখল নেয়।
কাজাখস্তান: পুঁজি সুরক্ষিত, কিন্তু ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কাজাখস্তান সদ্য স্বাধীন, স্থলবেষ্টিত এবং আধুনিক যুগের অন্যতম বৃহৎ তেল আবিষ্কারের ওপর বসে ছিল। একই সঙ্গে তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল পারমাণবিক উপাদান, উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি ও সোভিয়েত আমলের সংবেদনশীল অবকাঠামো। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইন প্রয়োজন ছিল, আর সেগুলো যদি রাশিয়ার মধ্য দিয়ে যেত, তবে মস্কো কার্যত কাজাখস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পেত।
এই পরিস্থিতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। কাজাখ সরকার ও শেভরনের মতো মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাজ করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগকারী রপ্তানি পথ তৈরি করা হয়। এটি ছিল একটি সচেতন কৌশলগত হস্তক্ষেপ। মার্কিন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহায়তা—গোয়েন্দা পর্যায়ের সমন্বয়সহ—মস্কোর হস্তক্ষেপ নিরুৎসাহিত করে এবং অবকাঠামো নির্মাণকালে চুক্তি সুরক্ষিত রাখে। শেভরন প্রকৃত উদ্যোক্তা ঝুঁকি নেয়, কিন্তু এমন এক সুরক্ষার ছাতার নিচে, যা সফলতার পর সম্পদ দখলের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। ফলাফল—শেভরনের জন্য দশকের পর দশক মূল্য সংযোজন, কাজাখস্তানের জন্য টেকসই জ্বালানি রপ্তানি এবং রাশিয়ার প্রভাব হ্রাস— একইসঙ্গে তিনটি লক্ষ্য অর্জন হয়।
ভেনেজুয়েলা: পুঁজি কেড়ে নেওয়া, সম্পদ ধ্বংস
ভেনেজুয়েলা সম্পূর্ণ বিপরীত পথ অনুসরণ করেছে। যেখানে নরওয়ে উদ্যোক্তা পুঁজিকে ঝুঁকি নিতে দিয়েছে এবং পরে করের মাধ্যমে মূল্য আদায় করে নিয়েছে, আর কাজাখস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদার হয়ে পুঁজি সুরক্ষিত করে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ বাড়িয়েছে, সেখানে ভেনেজুয়েলা পদ্ধতিগতভাবে সেই শর্তগুলো ভেঙে দিয়েছে। তেল শিল্পে চুক্তি বাতিল, সম্পদ জাতীয়করণ, পুঁজি সুরক্ষা ক্ষয় এবং দক্ষতা বিতাড়ন করা হয়েছে। জাতীয় সম্পদ বাড়ানোর বদলে দেশটি এর মুনাফা শুধু ব্যয়ই করেছে।
ফলাফল ছিল অনুমেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও, ভেনেজুয়েলার উৎপাদন নব্বইয়ের দশকের শেষের দৈনিক ৩০–৩৫ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে আসে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল বা তারও কমে। পুনঃবিনিয়োগ বন্ধ হয়, অবকাঠামো ভেঙে পড়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্ত হয়। সর্বোচ্চ সময়ে মুদ্রাস্ফীতি বছরে ১০ লাখ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তেল মাটির নিচেই রয়ে যায়। হারিয়ে যায় পুঁজি, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা। ভেনেজুয়েলার সমস্যা সম্পদের অভাব ছিল না; ছিল এমন শাসন কাঠামোর অভাব, যা ঝুঁকি, পুঁজি ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টিকে একসঙ্গে টিকিয়ে রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপ এই গতিপথ উল্টে দেওয়ার চেষ্টা—ভেনেজুয়েলার জ্বালানি উৎপাদনের চারপাশে কার্যকর ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনঃস্থাপন করা। কাজাখস্তানের মতোই লক্ষ্য সম্পদের মালিকানা নয়; বরং পুঁজি, চুক্তি ও অবকাঠামো সুরক্ষা, যাতে বিনিয়োগ ফিরে আসে, উৎপাদন বাড়ে এবং বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ আবার সাড়া দিতে পারে।
এখান থেকেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব শুরু হয়। এই পরিসরের একটি রিজার্ভভিত্তি যখন রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থেকে বিশ্বাসযোগ্য সরবরাহের দিকে এগোয়, তখন এর প্রভাব কেবল তেল বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, ডিসকাউন্ট রেট এবং শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারের মূল্যায়নে ছড়িয়ে পড়ে।
তেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়
জীবাশ্ম তেলের অর্থনৈতিক প্রভাব জ্বালানি ও পরিবহন ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অপরিশোধিত তেল প্লাস্টিক, পেট্রোকেমিক্যাল, সার, প্যাকেজিং, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নির্মাণসামগ্রী, সিন্থেটিক কাপড়সহ অসংখ্য শিল্প ও ভোক্তা পণ্যের মৌলিক উপাদান। এগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রে অবস্থান করে। ফলে তা সরাসরি ভোক্তাদের চোখে না পড়লেও করপোরেট ব্যয় কাঠামোর প্রধান চালিকাশক্তি।
যখন তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে কমে, তখন এর প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও ভোক্তা পণ্যে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় কমে, মুনাফা বাড়ে এবং অর্থনীতির বিস্তৃত খাতে মূল্যচাপ হ্রাস পায়। এটি চক্রাকার নয়, কাঠামোগত প্রভাব।
এ কারণেই তেল শুধু ভোক্তা মূল্যসূচককে নাড়া দেয় না; এটি নীরবে পুরো অর্থনীতির ব্যয় ভিত্তি নতুন করে নির্ধারণ করে। ভেনেজুয়েলার মতো বিশাল জ্বালানি রিজার্ভ থেকে সরবরাহের টেকসই বৃদ্ধি—তাই জ্বালানি বাজারের বাইরেও করপোরেট মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মূল্যস্ফীতি, ফেডারেল রিজার্ভ ও বহুগুণ প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য মূল্যস্ফীতির সামান্য উন্নতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বাজার বিশ্বাস করে যে সরবরাহের দিকে পরিবর্তনটি অস্থায়ী নয়, বরং স্থায়ী, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিচে নেমে আসে।
কম মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ফেডারেল রিজার্ভকে দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সুদের হার কমানোর সুযোগ দেয়। সুদ কমলে মূল্যায়নের গণিত বদলে যায়। ঝুঁকিমুক্ত হার কমলে ইকুইটি বা শেয়ারের মতো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
এখানেই শেয়ারবাজারের প্রভাব অসমমিত হয়ে ওঠে। আয় ধীরে বাড়ে, কিন্তু মাল্টিপল দ্রুত প্রসারিত হতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি স্বনির্ভরতা ও বাজার আস্থা
জ্বালানি স্বনির্ভরতা শুধু জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা নয়; এটি বাজার আস্থার ধারণাও। যুক্তরাষ্ট্র যখন বাইরের জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমায়, তখন অর্থনীতি যেকোনো ধাক্কা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আরও সহনশীল হতে পারে। ফলে বাজারে অস্থিরতা কমে, ঝুঁকি প্রিমিয়াম সংকুচিত হয়।
ভেনেজুয়েলার উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অধীনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হলে পশ্চিম গোলার্ধের সরবরাহ শক্তিশালী হবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে রাশিয়া, চীন ও ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
দিনশেষে বাজার স্থিতিশীলতাকেই পুরস্কৃত করে। আর স্থিতিশীলতা উচ্চ মূল্যায়নকে সমর্থন করে।
ডেটা সেন্টারের বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সময়ের মিল
ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য সরবরাহ পরিবর্তনের সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ গ্রিড, উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি ইনপুটের ওপর চাপ এমন গতিতে বাড়ছে, যা আগের অর্থনৈতিক চক্রে দেখা যায়নি।
এআই প্রশিক্ষণ মডেল, হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ও পরবর্তী প্রজন্মের ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের জন্য বিপুল ও ধারাবাহিক শক্তি প্রয়োজন। ফলে গ্রিড নির্ভরযোগ্যতা, প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাপ্যতা, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানির প্রাচুর্য বিলাসিতা নয়; এটি টেকসই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। ডিজিটাল ও এআই-চালিত জ্বালানি চাহিদা বাড়ার ঠিক সময়ে পশ্চিম গোলার্ধে তেলের সরবরাহ বাড়া এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারত না।
তেলের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারদর বাড়ায়
যদি ভেনেজুয়েলার সম্পদের একটি অংশও বিশ্বাসযোগ্য কার্যকর ও আইনি কাঠামোর মধ্যে টেকসই উৎপাদনে ফিরে আসে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইকুইটির ওপর এর প্রভাব সরলরৈখিক হবে না; বরং বহুগুণে বাড়বে।
কম জ্বালানি ব্যয় অধিকাংশ খাতে মুনাফা বাড়ায়। কম মুদ্রাস্ফীতি প্রকৃত মজুরি ও ভোগ বাড়ায়। কম সুদ মূল্যায়ন মাল্টিপল বাড়ায়। পুঁজি বিনিয়োগ বাড়ে। আর্থিক পরিবেশ শিথিল হয়। প্রতিক্রিয়া চক্র নিজেই নিজেকে শক্তিশালী করে।
ডেটা সেন্টারের বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সময়ের মিল
ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য সরবরাহ পরিবর্তনের সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ গ্রিড, উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি ইনপুটের ওপর চাপ এমন গতিতে বাড়ছে, যা আগের অর্থনৈতিক চক্রে দেখা যায়নি।
এআই প্রশিক্ষণ মডেল, হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ও পরবর্তী প্রজন্মের ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের জন্য বিপুল ও ধারাবাহিক বিদ্যুৎশক্তি প্রয়োজন। ফলে গ্রিড নির্ভরযোগ্যতা, প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাপ্যতা, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানির প্রাচুর্য বিলাসিতা নয়; এটি টেকসই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। ডিজিটাল ও এআই-চালিত জ্বালানি চাহিদা বাড়ার ঠিক সময়ে পশ্চিম গোলার্ধে তেলের সরবরাহ বাড়া এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারত না।
তেলের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারদর বাড়ায়
যদি ভেনেজুয়েলার সম্পদের একটি অংশও বিশ্বাসযোগ্য কার্যকর ও আইনি কাঠামোর মধ্যে টেকসই উৎপাদনে ফিরে আসে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইকুইটির ওপর এর প্রভাব সরলরৈখিক হবে না; বরং বহুগুণে বাড়বে।
কম জ্বালানি ব্যয় অধিকাংশ খাতে মুনাফা বাড়ায়। কম মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরি ও ভোগ বাড়ায়। কম সুদ মূল্যায়ন মাল্টিপল বাড়ায়। পুঁজি বিনিয়োগ বাড়ে। আর্থিক পরিবেশ শিথিল হয়। প্রতিক্রিয়া চক্র নিজেই নিজেকে শক্তিশালী করে।
২০২৬ ও তার পরের জন্য পুঁজিবাজারে কাঠামোগত সহায়ক হাওয়া
ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দশকের পর দশক অব্যবহৃত ছিল। এর সামান্য অংশও উন্মুক্ত হলে মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে, সুদের হার নামতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিতে পারে।
যদি এই সরবরাহ পরিবর্তন টেকসই প্রমাণিত হয়, তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে অনুকূল সামষ্টিক প্রেক্ষাপট পেতে পারে—মূল্যস্ফীতি হ্রাস, সুদ কমা, মুনাফা বাড়া এবং আস্থা বৃদ্ধি।
বাজার এখনো এই সম্ভাবনার মূল্যায়ন শুরু করেছে মাত্র। ঐকমত্য তৈরি হওয়ার আগেই এর বড় অংশ হয়তো দামে প্রতিফলিত হয়ে যাবে। ইতিহাস বলছে, সবচেয়ে বড় বাজার উত্থান ঘটে নিশ্চিততার পরে নয়, বরং অবিশ্বাস থেকে স্বীকৃতির দিকে যাত্রাপথে।
