হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা চান ট্রাম্প; বাস্তবায়নে যা করতে হবে
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালি। বর্তমানে ইরানের অবরোধের কারণে এই জলপথটি বন্ধ রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কাজটি যে মোটেও সহজ হবে না, তা স্পষ্ট।
ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী তেল ট্যাঙ্কার ও অন্যান্য জাহাজকে এই প্রণালি পার হতে প্রতিরক্ষা-সহচর দেবে।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, এই নিরাপত্তা অভিযান 'খুব শিগগিরই' শুরু হবে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এ কাজে সাহায্য করার জন্য অন্যান্য দেশের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনই এই সরু প্রণালিতে (যার সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২১ মাইল চওড়া) যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে চাইছে না।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ইরানের ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী মিসাইলের কারণে ওই এলাকা মার্কিন নাবিকদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে।
নিরাপত্তা অভিযানের পথ পরিষ্কার করতে একটি বিকল্প হতে পারে বিমান হামলার মাত্রা বাড়ানো।
এর মাধ্যমে জাহাজগুলোর দিকে তাক করার আগেই ইরানের মিসাইল ও ড্রোনগুলো ধ্বংস করা যেতে পারে।
আরেকটি বিকল্প হলো, জলপথের আশপাশের এলাকা দখলে নিতে স্থলবাহিনী বা গ্রাউন্ড ট্রুপস ব্যবহার করা।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, স্থলবাহিনী ব্যবহারসহ সব বিকল্পই তাদের টেবিলে রয়েছে।
শুক্রবার ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সাধারণত এই ইউনিটে হাজার হাজার নাবিক, অ্যাটাক জেট এবং ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনাসহ যুদ্ধজাহাজ থাকে।
প্রতিরক্ষা-সহচর অভিযান
প্রতিরক্ষা-সহচর অভিযানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, সম্ভবত মিত্র দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে মিলে, তেল ট্যাঙ্কারের পাশাপাশি প্রণালি পার হবে।
তাদের কাজ হবে মাইন পরিষ্কার করা এবং আকাশপথের পাশাপাশি ইরানের ছোট ও দ্রুতগতির বোট বা 'মশা বহর'-এর আক্রমণ ঠেকানো।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ৫ থেকে ১০টি ট্যাঙ্কারের কনভয়কে আকাশপথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ডজনখানেক যুদ্ধজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ প্রতি ট্যাঙ্কারের বিপরীতে দুটি জাহাজ। দূরত্ব কম হওয়ায় এত কাছ থেকে মিসাইল ও ড্রোন ভূপাতিত করা অনেক বেশি কঠিন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের নৌ ও সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই গুঁড়িয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তাদের কমান্ডাররা এখনো পাল্টা আক্রমণ চালানোর ক্ষমতা দেখাচ্ছেন।
হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং প্রবীণ নৌ-কর্মকর্তা ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি আকাশে অন্তত এক ডজন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন টহল দিতে হবে।
এগুলো উপকূল থেকে ইরানি মিসাইল ও ড্রোন লঞ্চার বের হলেই তাতে আঘাত হানবে।
ক্ল্যার্ক বলেন, 'এর জন্য হাজার হাজার সেনা ও নাবিক লাগবে, এবং প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। আর এই কাজ হয়তো মাসের পর মাস চালিয়ে যেতে হবে।'
অন্যান্য সামরিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিরক্ষা-সহচর সহায়তা হিসেবে মেরিনদের হ্যারিয়ার জাম্প জেটের মতো বিমান ব্যবহারেরও প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে ট্যাঙ্কার পাহারায় জাহাজ নিয়োজিত করার মানে হলো, সেগুলোকে আক্রমণাত্মক বা বৃহত্তর মিসাইল প্রতিরক্ষার কাজ থেকে সরিয়ে আনা।
ট্রাম্প শনিবার আশা প্রকাশ করেন যে চীন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য এই কাজে সাহায্য করতে জাহাজ পাঠাবে।
শীর্ষস্থানীয় শিপিং বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের মতে, নিরাপত্তার কারণে সৃষ্ট বিলম্ব এবং উপলব্ধ যুদ্ধজাহাজের সংখ্যার সীমাবদ্ধতায় প্রণালি দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ১০ শতাংশে নেমে আসবে।
এই ধীরগতিতে চললে, উপসাগরে আটকে পড়া ৬০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জট ছাড়াতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।
এত চেষ্টার পরও ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়। তারা যুদ্ধজাহাজ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ব্যাপক ক্ষতি বা ডুবিয়েও দিতে পারে।
তাদের জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইলগুলো স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় তারা সহজেই 'হিট-অ্যান্ড-রান' বা আঘাত করে পালানোর কৌশল নিতে পারে।
সেনা পাঠানো
আরও বড় পরিসরের সামরিক বিকল্প হলো দক্ষিণ ইরানের একটি অংশ দখল বা সেখানে অভিযান চালানো, যাতে তারা প্রণালিতে জাহাজের ওপর গুলি ছুড়তে না পারে।
এর জন্য হাজার হাজার সেনার প্রয়োজন হবে এবং হয়তো মাসের পর মাস ধরে অভিযান চালাতে হবে। এই সময়ে মার্কিন সেনারা এমন একটি সরকারের আক্রমণের মুখে থাকবে, যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে।
এই বিকল্পটি শুরু হতে পারে উপকূল বরাবর ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে। এরপর মার্কিন সেনারা দক্ষিণ ইরানে অবতরণ করবে।
সম্ভবত মেরিনরা পাহাড়ি ও দুর্গম ওই এলাকায় উভচর বা অ্যাম্ফিবিয়াস হামলা চালাবে।
কমান্ডাররা হয়তো ড্রোন ও মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করে বারবার ফিরে আসার কৌশল নিতে পারে। কিন্তু ইরানও লুকোচুরি খেলতে পারে। মেরিনরা চলে গেলেই তারা আবার ফিরে আসতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে আগ্রাসন চালানো ছাড়া উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের স্থলবাহিনীকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। তবে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মাটিতে থাকা যেকোনো মার্কিন সেনাই ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্যের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং তাদের এলিট কুদস ফোর্স এ ধরনের অসম যুদ্ধে পারদর্শী।
তারা কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে আসছে। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর ইরাকে মার্কিন সেনাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলায়ও তারা সাহায্য করেছিল।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানিয়েল বাইম্যান বলেন, 'আপনি যদি অল্প কিছু স্পেশাল ফোর্সের সেনা দিয়ে শুরু করেন, তবে তাদের রক্ষায় কি আরও সেনার প্রয়োজন হবে? আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি যা পেয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকবেন নাকি আরও ঝুঁকি নেবেন।'
শিপিং রুট বা জাহাজ চলাচলের পথ সুরক্ষিত করতে মার্কিন সেনাদের হয়তো মাসের পর মাস বা তারও বেশি সময় ইরানে থাকতে হতে পারে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের ইরান ডেস্কের সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, 'আপনার সময় লাগবে। পরিকল্পনার জন্য সময় লাগবে। তাদের সক্ষমতা কমাতেও সময় লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রণালির ইরানি অংশ দখল করতে চাইলে আপনাকে আইআরজিসির কমান্ড ও কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করতে হবে, যার জন্য প্রচুর সময় প্রয়োজন।'
শিপিং কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্ত
প্রণালির উপকূল দখলে নিলেও জাহাজের ওপর ইরানের হুমকি পুরোপুরি দূর হবে না। ইরানের কাছে দূরপাল্লার মিসাইল ও ড্রোন রয়েছে, যা তারা দেশের ভেতর থেকে উপসাগরে ছুড়তে পারে।
চলতি সপ্তাহেই তারা প্রণালি থেকে কয়েকশ মাইল দূরে, পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে ইরাক উপকূলে ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের হামলার ঝুঁকি কমালেও তা পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলে শিপিং কোম্পানিগুলো এই প্রণালি ব্যবহারে রাজি নাও হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান জাহাজের ওপর দুই ডজনেরও বেশি হামলা চালিয়েছে এবং উপসাগরে একাধিক জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
সামরিক এবং তেল ও শিপিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দিনে ১০০টিরও বেশি জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল পুনরায় শুরু করতে হলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ হতে হবে।
সেই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলা না চালানোর বিষয়ে ইরান সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিক মুলরয় বলেন, 'ট্রানজিট বা পারাপার যে যথেষ্ট নিরাপদ, তা আপনাকে বিমা ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে বোঝাতে হবে।'
