নন-বন্ডেড ১,১০০ পোশাক কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর
দেশে বন্ড লাইসেন্স এর আওতার বাইরে থাকা রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে শত শত পোশাক কারখানার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে এবং রপ্তানি কার্যক্রমও গতি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান টিবিএসকে বলেন, এ বাধা অপসারণে রাজস্ব বোর্ড সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, "প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে বন্ড লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহে বিদ্যমান বাধা অপসারণে আমরা কাজ করছি। যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।"
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন সম্পন্ন হলে শিগগিরই এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে আইনি সংশোধনের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য একটি সামারি (সারসংক্ষেপ) তৈরি করা হয়েছে। এটি পাশ হলে ভ্যাট পলিসি বিভাগ থেকে একটি আদেশ জারি করা হবে। এর ভিত্তিতে কিছু শর্তসহ কাস্টমস বন্ড উইং আরেকটি আলাদা আদেশ জারি করবে, যাদের অধীনে এ সুবিধা দেওয়া হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে বন্ডেড লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত ১,১০০-এর বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব কারখানা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালায়। এসব কারখানার বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার এবং শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ বলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন- বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানিয়েছে।
এই সুবিধা দিলে যে অনিয়মের সুযোগ থাকবে, তা কীভাবে রোধ করা যাবে- এমন প্রশ্নে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, স্বয়ংক্রিয়তা (অটোমেশন) ও ডেটা সিস্টেমের সমন্বয়ের মাধ্যমে অপব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, "আমরা অটোমেশনের দিকে চলে যাচ্ছি। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইন্টিগ্রেশনের ফলে তথ্য সংগ্রহ করা এবং কার্যক্রমের মনিটরিং করা সম্ভব হবে। ফলে অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।"
দীর্ঘদিনের বাধা
পোশাক শিল্পের নেতারা বহু বছর ধরে এই সমস্যা সমাধানে এনবিআরের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন।
এতদিনেও কেন জটিলতা দূর হয়নি—এ প্রশ্নের জবাবে এনবিআরের কাস্টমস উইংয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে কাঁচামাল ক্রয় করে রপ্তানি না করলে বা অন্য কোন অনিয়ম করলে— তা বের করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু, নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল সরবরাহ করলে তা বের করা করা বিদ্যমান ব্যবস্থায় কঠিন।"
"মূলত এসব অনিয়ম বের করার ক্ষেত্রে কাস্টমসের সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এ ব্যবস্থা এতদিন চলমান ছিল" – বলেন তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে, গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বিষয়টি আবারও উত্থাপন করে বিজিএমইএ। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর এনবিআরকে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলতে না পারা বা বন্ডেড কোম্পানি থেকে কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক (এক্সেসরিজ) পণ্য সংগ্রহ করতে না পারার কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, "বাদবাকী কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও কমছে এবং তারাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।"
রপ্তানিকারকেরা মনে করেন, প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের ব্যবসা সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিজিএমইএ'র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী , যিনি গত এক বছর ধরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এনবিআরের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছেন, উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, "এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। সমস্যা সমাধানে একাধিক কমিটি গঠন করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১১ মাস আগে আমাদের চিঠির পর এনবিআর কিছু উদ্যোগ নিলেও পরে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। তবে দুই সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে।"
"তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যদি এখনই সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়, তাহলে এত সময় লাগল কেন? এতদিন প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত" – তিনি যোগ করেন।
নন-বন্ডেড রপ্তানিকারকদের যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয়
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, বন্ডেড লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মাস্টার এলসির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অন্য বন্ডেড কোম্পানি থেকে সুতা, ফেব্রিক বা এক্সসরিজ পণ্য সংগ্রহ করতে পারে। তবে বন্ডেড লাইসেন্স না থাকা কারখানাগুলো এ সুবিধা পায় না।
রপ্তানিকারকেরা জানান, পরবর্তীতে এনবিআরের সঙ্গে আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো অনেক সময় নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের এলসি খুলতে চায় না। ফলে স্থানীয় উৎস থেকে তাদের কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যায়। এতে অনেক ছোট রপ্তানিকারক স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থে বেশি দামে কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ কিনতে বাধ্য হন।
আবার এ প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল সংগ্রহ করার পর রপ্তানির সময় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ওই কাঁচামালের বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ চায়। এছাড়া বছর শেষে ভ্যাট অফিস কর্তৃক অডিট করার সময়ও তারা বিপাকে পড়ে। ফলে একদিকে লাইসেন্স না থাকায় তাদের বাড়তি টাকা খরচ করে কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ সংগ্রহ করতে হয়, অন্যদিকে কাস্টমস ও ভ্যাট অফিসে 'বাড়তি টাকা খরচ' করতে হয়। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যায়।
রাজধানীর বাড্ডায় অবস্থিত নিটওয়্যার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরএল অ্যাপারেলস লিমিটেড এমনই একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, "বিদ্যমান নিয়মে অনুমতি না থাকায় ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলতে রাজি হয় না। ফলে আমাদের ক্যাশ টাকায় বাড়তি দরে খোলাবাজার থেকে কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ ক্রয় করে রপ্তানি করতে হয়।"
"এর ফলে একদিকে বাড়তি দরে কিনতে হয়, আবার বন্দরে রপ্তানিতে ঝামেলা এবং ভ্যাট অফিস থেকেও সমস্যা হয়। ফলে বাড়তি খরচ করতে হয়" – জানিয়ে তিনি বলেন, "এসব কারণে এক সময়ে ১৬০ জন শ্রমিকের তার কারখানা এখন ১০০ জনে নেমে এসেছে।"
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সোয়েটার ও ওভেন পোশাক রপ্তানিকারকরা, যাদের বন্ড লাইসেন্স নেই।" তবে এ বাধা দূর হলে আমাদের জন্য ব্যবসা করা সহজ হবে বলে জানান রোকনুজ্জামান।
কেন অনেক রপ্তানিকারক বন্ডেড লাইসেন্স নেন না
উদ্যোক্তারা জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স পাওয়া বেশ কঠিন।
রোকনুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়—যেমন নির্দিষ্ট আকারের গুদামঘর, প্রশস্ত সড়কসংযোগ এবং অন্তত এক কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন।
তিনি বলেন, "এসব শর্ত পূরণ করলেও আবেদন জমা দেওয়ার পর অনেক সময় মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।"
এসব শর্তের পাশাপাশি লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
এক পোশাক রপ্তানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি একসময় বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরে জানতে পারেন, বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, "ঘুষ দেওয়া হলে শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না, সেটি আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।"
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পোশাক, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬,০০০ কারখানা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র তথ্য বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৮৭ ধরনের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উৎপাদিত পণ্যের মোট রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
অটোমেশনের মাধ্যমে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ
রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, এই সুবিধা দিতে এতদিন সরকারের অনীহার কারণ ছিল মূলত এই আশঙ্কা যে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল রপ্তানি না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিলে একদিকে সরকারের রাজস্ব হারানার শঙ্কা, অন্যদিকে একই পণ্য শুল্ক পরিশোধ করে আনা আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন।
তবে এখন তারা মনে করছেন, ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সরকারের বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে অনলাইনে চলে গেছে, যেমন ই-ভ্যাট সিস্টেম এবং কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
এসব সিস্টেমের মাধ্যমে কাস্টমস, ভ্যাট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, "অনলাইনে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সহজেই জানা যাবে নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ডেড কোম্পানি থেকে কাঁচামাল কিনছে কি না এবং সেই কাঁচামাল শেষ পর্যন্ত রপ্তানিতে ব্যবহার হচ্ছে কি না।"
তার মতে, এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা ভুয়া রপ্তানি ঘোষণা বা শুল্কমুক্ত কাঁচামালের অপব্যবহারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে।
