সহায়তার আর্জি জানাচ্ছে দেশের অর্থনীতি
হাইলাইটস
- গ্যাস সংকটে স্থবির বিনিয়োগ
- ৯ শতাংশের উপরে থাকা মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস করছে, বাড়াচ্ছে দারিদ্র্য
- বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে
- সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একদিকে প্রান্তিক মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো এবং অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা দেওয়ার এক জটিল নীতিগত ভারসাম্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি।
এই শহরেরই কোনো এক প্রান্তে, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করা এক তরুণ গত পাঁচটি বছর ধরে একটি মানসম্মত চাকরির খোঁজ করছেন।
তিনি একা নন। বিডিজবস ডটকম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের মাত্র ২,৪০০টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল ৪২ লাখ ৫৭ হাজার। অন্যদিকে, তৈরি পোশাক খাতের ১১,৩৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৫২ লাখ ১৮ হাজার চাকরিপ্রার্থী। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের দিকে এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন দেশের লাখ লাখ তরুণ। তাঁরা চান কর্মসংস্থান, সুযোগ এবং দিন দিন তীব্র হতে থাকা প্রতিযোগিতাপূর্ণ শ্রমবাজার থেকে উত্তরণের একটি নিশ্চিত পথ।
এই সংকটের কারণ আংশিকভাবে লুকিয়ে আছে অর্থনীতির অপর প্রান্তে।
শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ ছয় বছরেরও বেশি সময় আগে— ছয়টি বড় শিল্প ইউনিট গড়ে তুলতে প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় কারখানাগুলো আজও অলস পড়ে রয়েছে। এখন ব্যবসায়ীরা এই বাজেট থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা দাবি করছেন।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা গল্প নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বিএনপি সরকার যে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, এই চিত্রগুলো যৌথভাবে তারই বহিঃপ্রকাশ। এমন এক সময়ে এই বাজেট আসছে, যখন সীমিত আর্থিক সম্পদের মধ্যেও প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট লাঘব করার মতো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের তীব্র চাপ রয়েছে সরকারের ওপর।
খুব কম সরকারকেই এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। আজ দুর্বল বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা এবং লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি – দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে, যা অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
গত প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে স্থবির হয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে মজুরি বাড়েনি, যার ফলে লাখ লাখ পরিবার তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে হিমশিশ খাচ্ছে। এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানে; ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ১৮.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.২ শতাংশে। এই পরিস্থিতি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সম্প্রসারণ, করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, "মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বাজেটে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।"
তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যে তাদের খরচ কমিয়ে এবং কেবল মৌলিক চাহিদাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতা ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো।
তবে এই অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা কেবল সাধারণ পরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে আরও বহু দূরে।
গত এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে। এর ফলে বাজেটে কর সুবিধা, সহজে অর্থায়ন লাভের সুযোগ এবং দ্রুত অবকাঠামো ও জ্বালানি সহায়তার জন্য ব্যবসায়ীদের দাবি জোরালো হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে দুর্বল চাহিদার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুতের অব্যাহত সংকট এবং ভোক্তাদের পকেটে টাকা কমে যাওয়ার কারণে বেচাকেনায় মন্দা চলছে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) ক্ষেত্রে, ব্যবসা সম্প্রসারণের চেয়ে টিকে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, "শুধু ফাঁকা বুলি বা আশ্বাসে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায় না; এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন।"
তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে সচল এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখছে এমন শিল্পকারখানাগুলোকে রেশনিংয়ের মাধ্যমে হলেও জ্বালানি দেওয়া উচিত। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলায়, যা শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জোগান দিতে পারবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "এটি ছাড়া শিল্পায়ন এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানো কেবলই স্বপ্ন হয়ে থাকবে।"
বেশ কয়েকটি স্পিনিং মিল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান লিটল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খোরশেদ আলম জ্বালানি সংকট নিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি টিবিএস-কে বলেন, "আমি অন্তত ১০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নীতি দেখতে চাই, যাতে আমি অগ্রিম জানতে পারি কী পরিমাণ জ্বালানি আমি পাব এবং কতটা আমাকে বিকল্প উপায়ে ব্যবস্থা করতে হবে।" তিনি বলেন, কেবল জ্বালানির স্বল্পতা নয়, বরং এই নীতিগত অনিশ্চয়তাই বিনিয়োগের আসল ঘাতক।
খোরশেদ আলম যিনি বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির-ও সভাপতি আরেকটি ভিন্ন উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায়, শুল্কমুক্ত আমদানি স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়া যদি বন্ড সুবিধা আরও বেশি শিল্পে সম্প্রসারিত করা হয়, তবে বাংলাদেশ একটি শিল্পোন্নত দেশ হওয়ার পরিবর্তে— কেবলই আমদানিনির্ভর 'ট্রেডিং নেশনে' পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
সুতরাং, সরকারের সামনেও এখন এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ।
দরিদ্র মানুষের জন্য আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রয়োজন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় থেকে মুক্তি। বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার উপায় খুঁজছে। আর ব্যবসায়ীরা চান বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা।
কিন্তু সরকারের হাত পা-ও বাঁধা, নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এখানে বেশ সীমিত। রাজস্ব আদায় দুর্বল, বাড়ছে ঋণ পরিশোধের ব্যয়, ভর্তুকির বোঝাও দিন দিন ভারী হচ্ছে। একই সাথে ব্যবসায়িক খাতে সহায়তা বজায় রাখা এবং উন্নয়নমূলক ব্যয় সচল রাখার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। ফলে স্বস্তি দেওয়ার জন্য প্রতিটি অতিরিক্ত টাকা খরচের পেছনেই এখন কঠিন দরকষাকষি ও আপস করতে হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এমন এক সময়ে বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন, যখন সাধারণ পরিবারগুলো চাইছে স্বস্তি, ব্যবসায়ীরা চাইছেন নীতিগত নিশ্চয়তা এবং দেশের যুবসমাজ চাইছে কর্মসংস্থান। অথচ সরকারের সম্পদ সীমিত এবং দেশের অর্থনীতি রয়ে গেছে চরম ভঙ্গুর অবস্থায়।
সমস্যাগুলো কী, তা নতুন করে চিহ্নিত করার কোনো প্রয়োজন নেই; বাংলাদেশ সেগুলো খুব ভালো করেই জানে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, এই বাজেট কি সেই সমস্যাগুলো সমাধানের পথ দেখাতে পারবে?
