ক্রিকেট মাঠের ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার থেকে যেভাবে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে উঠলেন ‘ডেভিড ইমন’
একসময় ক্রিকেট মাঠে নিজের পরিচয় গড়ার স্বপ্ন দেখতেন মোবারক হোসেন ইমন। বাঁহাতি 'চায়নাম্যান' স্পিনার হিসেবে চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় তরুণদের একজন ছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিচয় মুছে গিয়ে জায়গা নেয় আরেকটি নাম—'ডেভিড ইমন'। অপরাধ জগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে আলোচিত এই ব্যক্তিকে বুধবার (২৯ জুলাই) যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সামনে এসেছে একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার থেকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়ার নানান সব তথ্য।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের জেলা পুলিশ সুপার জানান, ডেভিড ইমন চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকেই পুলিশ তাকে অনুসরণ করছিল। কুমিল্লার দাউদকান্দি, পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা, খুলনার রূপসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হলেও তিনি বারবার রুট পরিবর্তন করেন। পরে গোপালগঞ্জ হয়ে নড়াইলে প্রবেশ করেন তিনি। সেখান থেকে যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় বুধবার ভোরে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় ক্রিকেট একাডেমির কোচ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের তথ্যমতে, ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল ইমনের। স্থানীয় পর্যায়ে খেলার পর তিনি চট্টগ্রাম ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে যোগ দেন। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি মাঠে। বাঁহাতি 'চায়নাম্যান' স্পিনার হিসেবে দ্রুতই কোচদের নজরে আসেন তিনি। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করতেন বলেও জানিয়েছেন তার প্রশিক্ষকেরা।
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ মাসুম দোলা বলেন, 'ইমন আমাদের একাডেমিতে ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে আসে। সে বাঁহাতি চায়নাম্যান স্পিনার ছিল। বাংলাদেশে এ ধরনের বোলার খুবই কম, তাই তাকে সহজেই মনে রাখা যায়। ওর মধ্যে সম্ভাবনা ছিল।'
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, 'করোনা মহামারির আগে পর্যন্ত সে নিয়মিত অনুশীলন করেছে। লিগ ক্রিকেট খেলার মতো প্রস্তুতিও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন খেলা বন্ধ থাকার পর আর ফিরে আসেনি। এরপর তাকে মাঠেও দেখা যায়নি। অনেক খেলোয়াড়ই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে খেলা চালিয়ে যেতে পারে না। ইমনের ক্ষেত্রেও কী হয়েছিল, সেটা আমরা জানি না। তবে একজন কোচ হিসেবে খুব খারাপ লাগে। যে ছেলে ক্রিকেটে ভালো করতে পারত, সে আজ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত—এটা সত্যিই দুঃখজনক।'
একাডেমির আরেক কোচ আমিনুল হকও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, 'ইমন ছিলেন শান্ত ও স্বল্পভাষী। অনুশীলনে মনোযোগী ছিলেন এবং কোভিড-১৯ মহামারির আগে পর্যন্ত নিয়মিত মাঠে আসতেন। পরে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গণমাধ্যমে 'ডেভিড ইমন' নামটি আলোচনায় আসার পরই আমরা জানতে পারি যে সেটিই আমাদের সাবেক ক্রিকেটার মোবারক হোসেন ইমন।'
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন ইমন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে তার নাম দ্রুত আলোচনায় আসে। ওই সময় থেকেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেতে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আওতায় ১৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে সাতটি হত্যা মামলা। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আরও ২১টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ১১ থেকে ১২টি হত্যা মামলা।
পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত একটি অস্ত্র মামলায় তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অস্ত্রের উৎস, সহযোগী নেটওয়ার্ক, অর্থের জোগান এবং অন্যান্য অপরাধ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
