কানাডার পর ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ হতে পারে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডও, ইইউ পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্টের ইঙ্গিত
কানাডার পথ অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) 'সহযোগী সদস্য' হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্টা মেটসোলা।
গত বুধবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন তার বার্ষিক 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন' ভাষণে কানাডাকে ইইউর প্রথম সহযোগী সদস্য করার সম্ভাবনার কথা তোলেন।
ইইউর পূর্ণ সদস্যপদের চেয়ে এক ধাপ নিচের এই 'সহযোগী সদস্যপদ' ব্যবস্থার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অস্তিত্ব নেই। তবে এ ধরনের মর্যাদা পেলে দেশগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, ইইউর একক বাজারের কিছু অংশে প্রবেশাধিকার এবং ইইউর কিছু কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কানাডার ক্ষেত্রে এমন একটি চুক্তি হতে এখনো বেশ সময় লাগতে পারে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির রাজনৈতিক বিরোধীদের কেউ কেউ এ প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তবে কানাডার মতো একই পথে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও এগোতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মেটসোলা। 'যেসব দেশের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাই, এমন দেশ রয়েছে,' ইউরোপ টুডেকে তিনি বলেন।
'আমি নিশ্চিত, এর মধ্যে আরও কিছু দেশ থাকবে এবং আরও অনেক দেশ আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে। এমন অনিশ্চয়তার সময়ে বন্ধু থাকা গুরুত্বপূর্ণ।'
মেটসোলা বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ইইউর ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, যা তাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের উদাহরণ।
তিনি বলেন, 'বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা এটি করছি; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিশু, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ—এসব বিষয়ে আমরা কী করছি, তা নিয়েও আলোচনা করছি। এভাবেই জোট গড়ে তোলা যায়।'
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম এবিসি।
ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি বলেন, ইউরোপ ও কানাডা একসঙ্গে আরও শক্তিশালী এবং নিজেদের নাগরিকদের সমৃদ্ধি রক্ষায় তাদের সম্পর্ক আরও গভীর করা উচিত।
এর আগে, উরসুলা ফন ডার লেয়েনের কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রস্তাবকে 'হাস্যকর' বলে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রস্তাবটিকে বৈরী উদ্যোগ মনে হলে ইউরোপের ওপর আরও শুল্ক আরোপ করবেন।
স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের উদ্দেশে কার্নি বলেন, 'ইউরোপ ও কানাডা—দুটিই শক্তিশালী। একসঙ্গে ইউরোপ ও কানাডা আরও শক্তিশালী।'
তিনি বলেন, 'আমি তৃতীয় কোনো জোট গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছি না, যা পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে—শুধু আমাদের আচরণ হবে আরও ভালো।'
কার্নি আরও বলেন, 'আমরা অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য ক্ষমতা চাই না। বরং আমরা এমন স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে চাই, যাতে কেউ আমাদের উন্মুক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে, আমাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে, আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি তৈরি করতে কিংবা আমাদের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন দুর্বল করতে না পারে।'
বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে ইইউ ও কানাডা। একই সঙ্গে চীনেরও বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের।
বুধবার রাতে কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার বিষয়ে ফন ডার লেয়েনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইইউর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন ট্রাম্প।
উত্তর ক্যারোলাইনায় একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'তারা যদি তা করে, যদি আমার মনে হয় এটি কোনোভাবেই বৈরী পদক্ষেপ, তাহলে আমি খুব বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করব অথবা ইউরোপের সঙ্গে অনেক পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ করে দেব।' তিনি প্রস্তাবটিকে 'হাস্যকর' বলেও মন্তব্য করেন।
ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, ফন ডার লেয়েনের প্রস্তাবটি—যার বিস্তারিত এখনো নির্ধারণ করা হয়নি এবং বাস্তবায়নের জন্য ইইউর সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন—কোনো বৈরী পদক্ষেপ নয়।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল বলেন, 'আমাদের প্রেসিডেন্ট (ফন ডার লেয়েন) যেমন গতকাল স্পষ্ট করেছেন, কানাডার সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদারের এই প্রস্তাব অন্য কারও বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি আমাদের সম্মিলিত শক্তির জন্য।'
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে কার্নি স্পষ্ট করেন, ইইউর মতো কানাডাও সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়।
তিনি বলেন, 'আমরা শুধু সুসময়েই পাশে থাকা মিত্র নই।'
'আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সমৃদ্ধি তখনই বাড়ে, যখন তা ভাগাভাগি করা হয়। লক্ষ্য স্বনির্ভরতা নয়; লক্ষ্য হলো সম্মিলিত স্থিতিস্থাপকতা।'
ফন ডার লেয়েনের প্রস্তাবের প্রসঙ্গে কার্নি বলেন, 'আমরা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানাই।'
ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটিং, জ্বালানি নিরাপত্তা, মহাকাশ এবং অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে গভীর সহযোগিতার মাধ্যমে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের কথা বলেন।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্য এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে আরও নিরাপদ ব্রডব্যান্ড সংযোগ গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।
