যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ: ইইউ-র ‘সদস্য’ হতে চায় কানাডা, ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে চলছে আলোচনা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে চান কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তার দেশ এ জোটের 'সহযোগী সদস্য' (অ্যাসোসিয়েট মেম্বার) হতে পারে কি না, সেটিও তিনি খতিয়ে দেখছেন বলে রোববার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
ইইউর পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ কিংবা জোটের একক বাজারে সরাসরি যোগ না দিয়েই কীভাবে কানাডাকে ইইউর আরও কাছাকাছি আনা যায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী তার বিশেষ দূতকে সেই বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। ২৭ সদস্যবিশিষ্ট এই ইউরোপীয় জোট ও ইউরোপের বাইরের একটি দেশের মধ্যে এমন এক নতুন ধরনের জোট নিয়ে কানাডা ও ইউরোপের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হতে পারে।
কানাডা অনেক বছর ধরে প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন এই ঘনিষ্ঠ মিত্রকে কোণঠাসা করতে বিভিন্ন শুল্ক আরোপ ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এমন পরিস্থিতিতে এই নতুন প্রস্তাবটি কানাডার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সদস্যপদের নিয়মের ক্ষেত্রে ইইউ অতীতে খুব একটা নমনীয় ছিল না। তবে ইইউ ও কানাডার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার ধারণার প্রতি জোটটি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই সদস্যপদের মর্যাদাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তৈরি করা হয়নি।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে ব্রাসেলসে অবস্থিত কানাডার দূতাবাস ও ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্রদের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করায় কানাডা এখন অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারের দিকে কৌশলগতভাবে মনোযোগ দিতে বাড়তি তাগিদ বোধ করছে।
২০২৫ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের তীব্র অবনতি ঘটে। বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এই বাণিজ্য বিরোধের জেরে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে কয়েক হাজার কোটি ডলারের শুল্ক আরোপের ঘটনা ঘটেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, আলোচনাধীন এক প্রস্তাব অনুসারে, কানাডার কৌশলগত খাতের বিভিন্ন পণ্য, সেবা ও কর্মীরা ভবিষ্যতে আরও সহজে ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। এর মাধ্যমে জ্বালানি, এআই, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মতো কৌশলগত সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত কানাডার পণ্য, সেবা ও কর্মীরা অবাধে চলাচল করতে পারবে। এর মাধ্যমে কার্যত ইইউর সীমানাই প্রসারিত হতে যাচ্ছে। তাছাড়া ইইউর প্রায় ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল একক বাজারের সঙ্গে কানাডার গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে।
পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে, কানাডা ও ইইউ সাগরের তলদেশে ক্যাবল স্থাপন, যৌথভাবে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, ক্লাউড স্টোরেজ, নতুন স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ও ইইউতে কানাডার জ্বালানি রপ্তানির জন্য অবকাঠামো তৈরির বিষয়েও আলোচনা করছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ভিসা ছাড়াই কানাডীয় নাগরিকদের ইউরোপে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কার্নি নিয়মিত কয়েকজন ইইউ নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। এদের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চলতি মাসের শেষের দিকে এই দুই নেতার বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মাখোঁর প্রেস অফিসে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এছাড়া জার্মানির মার্ৎস ও ইতালির মেলোনির মতো নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার পাশাপাশি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন কার্নি।
কানাডা ও ইইউকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার এই উদ্যোগ অবশ্য সহজ কাজ নয়। এর আগে অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের একটি বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে যে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল, তা থেকেই এর প্রমাণ মেলে।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে স্বাক্ষরিত এবং নয় বছর ধরে আংশিকভাবে কার্যকর থাকা ওই চুক্তিটিই এখন পর্যন্ত জোটটির বেশ কয়েকটি দেশ পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসমর্থন করেনি।
