নভেম্বরের নির্বাচনে জিতলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব তদন্তের পরিকল্পনা করছেন ডেমোক্র্যাটরা
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ– প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ক্ষমতা এখনো ডেমোক্র্যাটদের হাতে ফেরেনি। তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আবারও নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণে ফেরার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হতেই আগেভাগে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন দলটির নেতারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসন এবং তাঁর পরিবারকে আগামী বছর এক কঠোর আইনি ও সংসদীয় কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে একটি বিস্তৃত 'জবাবদিহিমূলক রূপরেখা' তৈরি করছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সম্ভাব্য বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব দেবেন এমন এক ডজন ডেমোক্র্যাট কংগ্রস সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। তাঁরা জানান, প্রেসিডেন্ট পদে থেকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো আমূল বদলে ফেলা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত চালানোর পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। কীভাবে কার্যকর ও জোরদার তদন্ত পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা পেতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাইরের অভিজ্ঞ গ্রুপগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছেন তাঁরা।
সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ হাউজে 'ওভারসাইট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি' (তদারকি ও জবাবদিহি) কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেতে পারেন ক্যালিফোর্নিয়ার রবার্ট গার্সিয়া। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, " (ট্রাম্প প্রশাসনে) দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এতটাই ব্যাপক যে, বিষয়গুলোর যথাযথ তদন্ত করতে ডেমোক্র্যাটদের পুরো হাউসকেই কাজে লাগাতে হবে। আমরা সবাই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি।"
তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় প্রতিনিধি পরিষদে থাকা ডেমোক্র্যাটদের কেউ কেউ তাঁদের সহকর্মীদের সতর্ক করে বলছেন, তদন্ত কতটা সফল হবে সে বিষয়ে অতিরিক্ত আশা বা প্রতিশ্রুতি না দেওয়াই শ্রেয়। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের এই উদ্যোগকে একেবারেই পাত্তা দিচ্ছে না হোয়াইট হাউস। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেও যেন তদন্তগুলো আইনি জটিলতায় আটকে দেওয়া যায়, সে কৌশলও সাজাচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, "আমেরিকান জনগণের জীবনের মানোন্নয়নে ডেমোক্র্যাটদের কোনো কার্যকর এজেন্ডা নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনকল্যাণমুখী সাধারণ এজেন্ডাগুলো ব্যাহত করা এবং ভিত্তিহীনভাবে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানো ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই।"
ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক পরিকল্পনায় যেসব বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে:
ট্রাম্প পরিবারের সম্পদ ও ব্যবসা বৃদ্ধি
ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদে আসীন থাকার সময় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কীভাবে আরও ধনী হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে জোর তদন্তের প্রাথমিক ভিত্তি প্রস্তুত করছেন ডেমোক্র্যাটরা।
রবার্ট গার্সিয়ার কমিটি ইতিমধ্যেই ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিভিন্ন বৈদেশিক চুক্তি থেকে অর্জিত মুনাফার একটি বিস্তারিত হিসাব বা ট্র্যাকার তৈরি করেছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই বিদেশি খাত থেকে প্রায় ২২৫ কোটি ডলার পকেটে পুরেছেন।
এদিকে, ডেমোক্র্যাটরা হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বিচার বিভাগীয় কমিটির (জুডিশিয়ারি কমিটি) গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে আসবেন মেরিল্যান্ডের আইনপ্রণেতা জেমি রাসকিন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম '১৭৮৯ ক্যাপিটাল' এবং 'আমেরিকান ভেঞ্চার্স'-এর বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিশদ তথ্য চেয়েছেন। ট্রাম্পপুত্ররা যেসব কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, সেগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসন সুবিধাজনক সরকারি চুক্তি বা নমনীয় নীতি দিয়ে কোনো সুবিধা দিয়েছে কি না, তা রাসকিনের তদন্তে উঠে আসবে।
এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সেবার (আইআরএস) সঙ্গে ট্রাম্পের একটি গোপন সমঝোতা (যার মাধ্যমে তাঁর পরিবার ও ব্যবসাকে ভবিষ্যৎ অডিট থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে), তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ অর্থের বিনিময়ে পোস্টের দ্রুত এক্সেস বিক্রি করা এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের বিতর্কিত ব্যবসায়িক লেনদেনও ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের তালিকায় রয়েছে।
সমর্থক ও দাতাদের অনুকম্পা বিতরণ
ট্রাম্পের নির্বাচনী তহবিলে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছেন বা তাঁর রাজনৈতিক বৃত্তের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ—এমন দণ্ডপ্রাপ্ত জালিয়াতদের প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতাবলে ক্ষমা (পার্ডন) করে দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। ক্ষমাপ্রাপ্ত এমন অনেক অপরাধীকে ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের জন্য ডেমোক্র্যাটদের চিহ্নিত করা একটি অন্যতম ঘটনা হলো নার্সিং হোম নির্বাহী জোসেফ শজার্টজের ঘটনা। শজার্টজ সরকারের সঙ্গে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার জালিয়াতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর—গত বছর প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমার জন্য প্রায় ১০ লাখ ডলার লবিংয়ের পেছনে ব্যয় করেন। এই প্রেক্ষাপটে, সাজা ঘোষণার মাত্র সাত মাসের মাথায় ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
হাউস ন্যাচারাল রিসোর্সেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যারেড হফম্যান মূলত ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ও ব্যবসায়ীদের লাভবান করা খনি ও জ্বালানি চুক্তিগুলোর দিকে নজর রাখছেন। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন একটি জার্মান জ্বালানি কোম্পানিকে অফশোর উইন্ড লিভ (উপকূলীয় বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প) ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১২০ কোটি ডলারের একটি বিশাল সেটেলমেন্ট সুবিধা দিয়েছে। চুক্তিটির শর্ত ছিল কোম্পানিটিকে এই অর্থের সিংহভাগই ট্রাম্পের এক প্রধান দাতার মালিকানাধীন লুইজিয়ানার একটি এলএনজি প্রকল্পে নতুন করে বিনিয়োগ করতে হবে।
হফম্যান বলেন, "ট্রাম্প সরকারি সেটেলমেন্ট ফান্ডকে নিজের ব্যক্তিগত তহবিলের মতো ব্যবহার করছেন। এটি জনগণের বিশ্বাসের প্রতি চরম আঘাত এবং করদাতাদের অর্থের অপচয়ের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।"
এ ছাড়া ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল হিলে হামলায় যুক্তদের ট্রাম্পের ঢালাও ক্ষমা প্রদর্শন এবং এক দশক আগে বড় ধরনের তেল নিঃসরণের পর বন্ধ থাকা— দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও তদন্তের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
হোয়াইট হাউস ও ওয়াশিংটনের নির্মাণ প্রকল্প
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের মনোযোগের একটি বড় অংশ ছিল হোয়াইট হাউসের আধুনিকীকরণ, ওয়াশিংটন ডিসির সৌন্দর্যবর্ধন এবং নতুন নতুন স্মৃতিসৌধ ও ভবন নির্মাণ। ডেমোক্র্যাটরা এমন কিছু বড় প্রকল্পের ভেতরে অনিয়ম খুঁজতে চান, যেমন— ন্যাশনাল মলের রিফ্লেক্টিং পুলের ত্রুটিপূর্ণ মেরামত কাজ, কেনেডি সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনুমোদন ছাড়াই হোয়াইট হাউসে তড়িঘড়ি করে নতুন একটি বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ।
@আগ্রাসী অভিবাসন নীতি ও তৎপরতা
গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল অভিবাসন নীতিকে প্রধান হাতিয়ার করেছিল ট্রাম্পের প্রচার শিবির। তবে ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসীদের নিয়ে তাঁর প্রশাসনের অতি-আগ্রাসী ও কড়া পদক্ষেপ সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে—বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন সংক্রান্ত এক অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনার পর—পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়।
এখন ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নীতিগুলোর ওপর নজর রাখছেন। অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ, বৈধ বাসিন্দা ও নাগরিকদের অহেতুক আটক, ডিটেনশন সেন্টারে মৃত্যু বৃদ্ধি, লিবারেল বা ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন এবং তৎকালীন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক সেক্রেটারি ক্রিস্টি এল নোয়েমের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের অর্থ ও চুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।
কেন্দ্রীয় প্রশাসন ঢেলে সাজানো ও সরকারি সংস্থা ভেঙে দেওয়া
নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ট্রাম্প যেভাবে ফেডারেল আমলাতন্ত্রের পুনর্গঠন করছেন, তা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর থাকা প্রথাগত নিয়ন্ত্রণকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে ডেমোক্র্যাটরা। সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারির দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন হাউস কমিটি এখন খতিয়ে দেখবে—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্টুডেন্ট লোন প্রোগ্রাম বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মক্ষেত্র সুরক্ষা দপ্তর তাদের ওপর অর্পিত আইনি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে কি না।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির র্যাংকিং সদস্য জিম হেইমস অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্টের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য মত প্রকাশ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নির্বিচারে চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব ছাঁটাইয়ের শিকার কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার মূল্যায়নে ট্রাম্পের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভেনিজুয়েলার কথিত গ্যাং সদস্যদের বের করে দেওয়ার যুক্তিকে খণ্ডন করা হয়েছিল। এ ছাড়া অন্য একটি রিপোর্টে দেখা যায়, গত বছর ইরানি পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে মার্কিন সামরিক হামলায় ক্ষতি হয়েছিল খুবই সীমিত। আর এমন মুল্যায়ন দেওয়ার ফলেই রোষানলে পড়েন তাঁরা।
জিম হেইমস বলেন, "যাঁরা এভাবে অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিষয়ে আমরা পৃথকভাবে কেস-বাই-কেস ধরে তদন্ত পরিচালনা করব।"
এ ছাড়াও ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের তালিকায় রয়েছে—মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্মেন্ট এফিসিয়েন্সি ( বা ডোজ)-এর অধীনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণছাঁটাই, ইউএসএআইডি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা, শিক্ষা বিভাগ ভেঙে দেওয়া, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি সংকুচিত করার চেষ্টা এবং কংগ্রেসে অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও সরকারি তহবিল আটকে রাখা।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রতিপক্ষ দমন
ডেমোক্র্যাটরা এমন বেশ কিছু প্রসিকিউশন বা বিচারিক পদক্ষেপ তদন্ত করতে চায়, যা তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক এফবিআই -এর পরিচালক জেমস বি কোমি, নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং যেসব ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা গত নভেম্বরে সামরিক কর্মীদের বেআইনি আদেশ প্রত্যাখ্যানের পরামর্শ দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
অন্যদিকে ট্রাম্প বারবার নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাবি করে সরকারের "অপব্যবহার"-এর শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য ১৮০ কোটি ডলারের একটি সহায়তা তহবিল তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। তবে ক্যাপিটল হিল হামলার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিরোধিতা করে নিজ দলের রিপাবলিকানরাই বেঁকে বসলে ট্রাম্পের সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ডেমোক্র্যাটরা এই বিষয়টিও ফের তদন্তের আওতায় আনতে চায়।
@বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ
ট্রাম্প যেভাবে ফেডারেল নিয়ন্ত্রককারী সংস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশের বড় বড় ল ফার্ম, বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতি বদলাতে বাধ্য করেছেন—এবং অনেক প্রতিষ্ঠান যেভাবে চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে—তাতে ক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাটরা।
শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে যেসব ল ফার্ম তাদের ডাইভারসিটি, ইকুইটি অ্যান্ড ইনক্লুশন (ডিইআই) বা বৈচিত্র্যের নীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে, তাদের প্রধানদের শুনানিতে ডেকে আনা হতে পারে। এ ছাড়া অ্যাপল ও গুগল-এর নির্বাহীরা যাঁরা প্ল্যাটফর্ম থেকে অভিবাসন তদারকি সংক্রান্ত অ্যাপ তুলে নিতে রাজি হয়েছিলেন, তাঁদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করা হতে পারে। একই সঙ্গে প্যারামাউন্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ফেডারেল অনুমোদন পেতে সিবিএস -এর সংবাদের কাভারেজ ডানপন্থার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ডেভিড এলিসনকেও ডেমোক্র্যাটদের জেরার মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে অ্যাপল ও গুগল দাবি করেছে যে অ্যাপগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করায় তারা সেগুলো সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে ডেভিড এলিসন প্যারামাউন্ট চুক্তিকে দর্শকদের জন্য লাভজনক হিসেবে রক্ষা করেছেন এবং সিবিএসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কূটনীতি
প্রশাসনে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না থেকেও ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরান, ইসরায়েল, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শান্তি আলোচক বা মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজ করেছেন।
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস বলেন, ট্রাম্প কীভাবে ঐতিহ্যবাহী সরকারি কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একপাশে সরিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনে পাঠিয়েছেন—যাঁদের অনেকের আবার স্বার্থের সংঘাত রয়েছে—তা খতিয়ে দেখতে চান তিনি।
মিকস দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন, গত বছর ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের ঠিক কয়েক দিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্প ও উইটকফের ছেলেদের পরিচালিত একটি ক্রিপ্টো কোম্পানিতে ৫০ কোটি ডলারের শেয়ার কিনেছিলেন।
মিকস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সবকিছুই স্টিভ উইটকফ আর কুশনার সামলাচ্ছেন। তাহলে সেখানে আর কে আছে? মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভূমিকা এখানে ঠিক কী?"
তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, উইটকফ তাঁর ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে মালিকানা সরাতে কাজ শুরু করেছেন এবং উইটকফ ও কুশনারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে তাঁদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।
এক বিবৃতিতে অ্যানা কেলি বলেন, "(প্রেসিডেন্টের) বিশেষ দূত উইটকফ এবং মি. কুশনার উভয়েই অভিজ্ঞ ডিলমেকার। ট্রাম্প-বিদ্বেষে অন্ধ হওয়া ডেমোক্র্যাটরা তাঁদের পুরো কর্মজীবনে যা করতে পারেনি, এই দুজন গত এক বছরে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন।"
এ ছাড়া তদন্তের তালিকায় রাখা হয়েছে—আন্তর্জাতিক সংঘাত মেটাতে তৈরি করা 'বোর্ড অব পিস', কাতারের উপহার দেওয়া প্রেসিডেন্টের নতুন বিমান; শুল্ক আরোপ ও নতুন বাণিজ্য চুক্তি; ইরান যুদ্ধ এবং ভেনিজুয়েলার কথিত মাদক পাচারকারী নৌকায় সামরিক হামলা এবং গাজার পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত ট্রাম্পের রূপরেখা।
এপস্টেইন ফাইলস বিতর্ক
দণ্ডপ্রাপ্ত প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের কেলেঙ্কারিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ডেমোক্র্যাটরা। গত বছর, ট্রাম্প যখন এপস্টেইনের পুরনো ফেডারেল তদন্ত সম্পর্কিত নথি প্রকাশের— নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন, তখন ডেমোক্র্যাটরা তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলে এবং বাধ্য করে সেই গোপন নথি জনসমক্ষে আনতে। নথি তৈরিতে প্রশাসনের শ্লথগতির মুখেও তারা চাপ বজায় রেখেছিল।
জনমানসে এই কেলেঙ্কারিকে তাজা রাখতে ডেমোক্র্যাটরা নতুন শুনানির পরিকল্পনা করছে। এপস্টেইন কীভাবে এতদিন তাঁর যৌন পাচার চক্র চালিয়ে পার পেয়ে গেলেন, সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে তাঁর পুরনো সঙ্গীদের তলব করা হতে পারে, যা ডেমোক্র্যাটদের ট্রাম্পের দিকে অনায়াসে ইঙ্গিত করার সুযোগ তৈরি করে দেবে।
উল্লেখ্য, ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আগে ট্রাম্প ও এপস্টেইনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। তবে কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনেনি।
