ইরান সংঘাতের ক্ষত: যেভাবে বদলে যেতে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ
আচমকা কোনো সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ পুরো একটি দেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। ১৯৯০ সালের আগের কথাই ধরা যাক। তখন কুয়েত তার প্রতিবেশীদের চেয়ে বেশ আলাদা ছিল, উন্মুক্ত সমাজ, জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি আর আধুনিক সব অবকাঠামো।
এরপর একদিন ইরাকি ট্যাংক দেশটিতে ঢুকল, শুরু হলো প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ। শুধু দালানকোঠাই ভাঙল না, তার চেয়েও গভীর কিছু ভেঙে পড়ল। সেই মানসিক ধাক্কা কুয়েতের কয়েক দশকের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিয়েছিল।
এখন উপসাগরের আকাশে আবারও ইরানি মিসাইল উড়ছে। মনে হচ্ছে, ইতিহাস তার সেই নিষ্ঠুর অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলায় স্তম্ভিত আরব প্রতিবেশীরা। তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নগুলোই যেন আজ সত্যি হচ্ছে। ইরান এবার সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে আঘাত হেনেছে।
এমনকি তেহরানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী ওমানও এই হামলার থেকে রেহাই পায়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ছোড়া বেশির ভাগ মিসাইল ঠেকিয়ে দিলেও, কিছু আঘাত বিমানবন্দর, বন্দর এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে প্রাণহানিও ঘটেছে। এই হামলা শুধু নাগরিকদের নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক বিদেশির মনেও চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।
মিসাইলের আঘাত হয়তো একসময় থেমে যাবে, কিন্তু এর ক্ষত সহজে শুকাবে না। উপসাগরীয় অঞ্চল এই ধাক্কা সামলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, তার ওপর বিশ্বের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এই যুদ্ধ দুটি কঠিন সত্য সবার সামনে তুলে ধরেছে।
প্রথমত, মার্কিন শেল তেল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব সত্ত্বেও, জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ত, চরম অস্থিতিশীল এক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠা উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন আর বিপদমুক্ত নয়।
এই সংকট উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পদ ব্যবহারের ধরনও হয়তো বদলে দেবে। তাদের বিনিয়োগ এখন আর শুধু ইংলিশ ফুটবল ক্লাব, মিসরের রিয়েল এস্টেট বা সিলিকন ভ্যালিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ কমিয়ে রেখেছে। এখন তাদের এই বিনিয়োগ কৌশলে কোনো পরিবর্তন এলে তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারকেও (যুক্তরাষ্ট্র) নাড়িয়ে দিতে পারে।
এই সংঘাতের পর কোনো উপসাগরীয় নেতাই আর আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। তাদের সামনে আসবে কঠিন সব প্রশ্ন: কীভাবে নিজেদের সীমান্ত ও শহর রক্ষা করবেন?
ওয়াশিংটনকে আর কতটা বিশ্বাস করবেন? বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারের সঙ্গে কীভাবে তাল মেলাবেন? আর একে অপরের সঙ্গে কীভাবে সহযোগিতা করবেন?
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এই পরিবর্তনের মাত্রাও তত গভীর হবে।
প্রতিরক্ষায় বিপুল ব্যয়
যেসব দেশ বর্তমানে কোনো যুদ্ধে নেই, তাদের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোই এমনিতেই প্রতিরক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে। ২০২৬ সালের এই সংঘাত সেই প্রবণতাকে আরও উসকে দেবে।
এর প্রথম কারণ হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের প্রমাণ করেছে। প্রথম চার দিনে আরব আমিরাতের দিকে ছোড়া ১৯৬টি ইরানি মিসাইল ও ১ হাজার ড্রোনের মধ্যে অল্প কয়েকটিই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে।
তাই যুদ্ধ শেষে এই দেশগুলো তাদের ফুরিয়ে যাওয়া অস্ত্রের ভাণ্ডার আবার পূর্ণ করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য হয়তো তা আরও বাড়াবে।
দ্বিতীয় কারণ হলো, উপসাগরীয় অঞ্চল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলতে এবং বিশ্ববাজারকে অস্থির করতে ইরান নিজের আরব প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালিয়ে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।
কাল যদি যুদ্ধবিরতিও হয়, এই হুমকি দূর হবে না। বরং একটি দুর্বল, ক্ষুব্ধ এবং অপমানিত ইরান ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
আর শুধু ইরানই উপসাগরীয় অঞ্চলের একমাত্র মাথাব্যথার কারণ নয়। গত দুই বছরে ইসরায়েল প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের সীমানার অনেক বাইরে গিয়েও হামলা চালাতে দ্বিধা করে না। গত সেপ্টেম্বরে দোহায় ইসরায়েলি হামলায় এক কাতারি সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন।
ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন পেয়ে ইসরায়েল এখন এই অঞ্চলের এক অপ্রত্যাশিত ও ভয়ংকর শক্তি হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরাকি গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং এই সংঘাতের ফলে জন্ম নেওয়া নতুন জঙ্গি দলগুলোর হুমকি।
সব মিলিয়ে উপসাগরীয় নেতাদের কাছে এখনকার পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা বলয় এখনো উপসাগরীয় প্রতিরক্ষার মূল ভরসা। ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের অপরিহার্য অংশীদার—অন্য কোনো পরাশক্তি এর ধারেকাছেও নেই।
কিন্তু এই সম্পর্কটি এখন বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের কারণে, যারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে মানবাধিকার, তেল উৎপাদন এবং আঞ্চলিক মৈত্রী নিয়ে নানাভাবে চাপ দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন উপসাগরীয় শাসকরা বেশ আশাবাদী ছিলেন। ইরানের ওপর তার 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগের নীতি বেশ কাজের মনে হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৯ সালে তেহরান যখন উপসাগরে ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে রাতারাতি সৌদি আরবের তেল উৎপাদন অর্ধেক করে দিল, তখন ওয়াশিংটন কোথায় ছিল? উপসাগরীয় দেশগুলোর মনে হয়েছিল—ওয়াশিংটনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালে ট্রাম্প যখন আবারও হোয়াইট হাউসে ফিরলেন, উপসাগরীয় নেতারা দ্রুতই তাকে স্বাগত জানান। তারা তার প্রথম বিদেশ সফরের জমকালো আয়োজন করেন, ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন এবং তার শপথের পরপরই তেল উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেন (যা তারা কয়েক মাস ধরে করতে চাইছিলেন না)।
বিনিময়ে তারা কী চেয়েছিল? শুধু নিজেদের নিরাপত্তা এবং একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠেকানো।
কিন্তু তারা এর কোনোটিই পায়নি। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্পের উপসাগর সফরের ঠিক এক মাস পরই ইসরায়েল সেই যুদ্ধ শুরু করে, যা তারা ঠেকাতে চেয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও তার সঙ্গে টেনে নেয়। ট্রাম্পের দোহা সফরের চার মাস পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল দোহায় হামলা চালায়।
উপসাগরীয় মিত্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বেছে নেওয়ার সময় হলে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকেই বেছে নেয়। অর্থাৎ, ট্রাম্পের পেছনে এত সময় ও অর্থ ব্যয় করে উপসাগরীয় দেশগুলোর কপালে খুব সামান্যই জুটেছে।
এই সংঘাত থেকে সব উপসাগরীয় দেশ একই শিক্ষা নেবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়তো ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও মজবুত করবে, কারণ এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ভাবনা অনেকটা একই রকম। কাতার আমেরিকার সঙ্গে অংশীদারিত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর নীরব চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার টোপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক চিপস, পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন শান্তি আগের চেয়েও অনেক দূরে এবং রিয়াদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হয়তো সবচেয়ে জটিল অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির বিপদ
উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব অর্থনীতিতে মূলত তিনটি জিনিস সরবরাহ করে: জ্বালানি, মূলধন এবং বাণিজ্য পথ। বর্তমান যুদ্ধ একই সঙ্গে এই তিনটিকেই ব্যাহত করেছে। হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়—তা এখন কার্যত বন্ধ।
এর ফলে বিশ্ব হারাল এক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির উৎস, আর উপসাগরীয় অঞ্চল হারাল তাদের আয়ের এক বিশাল উৎস।
এই যুদ্ধ তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক বিপজ্জনক সংকীর্ণ পথের (চোকপয়েন্ট) কথা সামনে এসেছে, যা এখন আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সৌদি আরবের 'পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন' এবং আরব আমিরাতের 'ফুজাইরাহ লিংক' এই সংকটের সময় তাদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
কারণ এই দুটি পথই হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলে। সামনের দিনগুলোতে এই দুটি পথের সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই: ভবিষ্যতে আর কখনোই একটিমাত্র প্রণালির ওপর জিম্মি হয়ে না থাকা।
বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের অবশ্য হরমুজ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সরাসরি পথ নেই—ভৌগোলিক অবস্থানই তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। বিকল্প পথ বের করতে হলে তাদের প্রতিবেশীর ভূখণ্ড দিয়ে (সম্ভবত সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে) পাইপলাইন নিতে হবে।
এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আর শুধু ইচ্ছার বিষয় নয়, বরং একান্ত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওমানের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। তাদের উপকূল সরাসরি আরব সাগরে গিয়ে মিশেছে, যা হরমুজ প্রণালির বাইরে। যদিও এটি এখনো ইরানের নাগালের মধ্যেই পড়ে, তবু অন্তত হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নির্ভরতা নেই।
সহযোগিতা নাকি প্রতিযোগিতা?
কাতার পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানি করে না। তারা গ্যাসকে তরলে (এলএনজি) পরিণত করে জাহাজে পাঠায়। এর কারণ ভৌগোলিক নয়, বরং রাজনৈতিক। কাতারের একমাত্র স্থলসীমান্ত সৌদি আরবের সঙ্গে এবং এই দুই রাজতন্ত্রের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না।
২০১৭ সালে সৌদি আরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাত কাতারের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এরপর বছরের পর বছর কাদা-ছোড়াছুড়ি চলে এবং অবশেষে ২০২১ সালে তাদের মধ্যে আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
তাই দোহার পক্ষে তাদের একমাত্র পাইপলাইনটি সেই প্রতিবেশীর ওপর ছেড়ে দেওয়াটা হয়তো মোটেও স্বস্তিদায়ক হবে না।
শুধু কাতার ইস্যুই নয়, সম্প্রতি আরও কিছু ফাটল দেখা গেছে। ২০২৬ সালে মিসাইল ছোড়াছুড়ি শুরুর ঠিক আগেও সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের (এই জোটের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতি) মধ্যে বিভেদ বাড়ছিল। যুদ্ধ সাময়িকভাবে সেই উত্তেজনা চাপা দিলেও, তার কোনো সমাধান করেনি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ভাষা, ধর্ম, উপকূল এবং সাধারণ হুমকির মতো অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ইসলাম, ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, এবং ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়া নিয়ে তাদের মধ্যে চরম মতভেদও রয়েছে।
এমনকি তেল নীতিও মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে সংঘাত তৈরি করে। একই শত্রুর মুখে পড়লেই যে তারা একই কৌশলে চলবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।
তারা একে অপরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতাও করে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রতিযোগিতায় নেমে সবাই একই খাতে—যেমন পেট্রোকেমিক্যালস, আর্থিক পরিষেবা, লজিস্টিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং পর্যটনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
প্রতিটি দেশই একই রকম চকচকে বিমানবন্দর বানাচ্ছে, একই বিদেশি বিনিয়োগকারীকে টানার চেষ্টা করছে, বড় ডেটা সেন্টার বানাতে চাইছে এবং তেল-পরবর্তী ভবিষ্যতের একই স্বপ্ন বিক্রি করছে।
চলমান যুদ্ধ এই ফাটলগুলোকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। দুর্বল বা পরিবর্তিত ইরানকে কীভাবে সামলাতে হবে, ইসরায়েল থেকে কতটা দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, ওয়াশিংটনকে কতটা বিশ্বাস করা যায়, আর তুরস্কের ভূমিকাই বা কী হবে—এসব প্রশ্নের কোনো অভিন্ন উত্তর তাদের কাছে নেই।
এমনকি ফুরিয়ে যাওয়া অস্ত্রের ভাণ্ডার পূর্ণ করার প্রতিযোগিতাও প্রতিবেশীদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে, কারণ সবাই একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে একই অস্ত্র চাইবে।
এই যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় জীবনের এমন সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যা কেউ হয়তো ভাবেইনি।
স্থাপত্যের কথাই ধরা যাক। এই অঞ্চলের আকাশজুড়ে শুধু কাঁচের তৈরি সুউচ্চ সব টাওয়ার। কিন্তু মিসাইল হামলার সাইরেন বাজার পর যখন বাসিন্দাদের জানালা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়, তখন এক অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে আসে: ৪০ তলার কাঁচের দেয়াল ঘেরা অ্যাপার্টমেন্ট মোটেও নিরাপদ আশ্রয় নয়।
২০২৬ সালের এই অভিজ্ঞতা হয়তো উপসাগরীয় অঞ্চলের শহর তৈরির ধরনই বদলে দেবে।
এরপর আসে সেই প্রশ্ন, যা কেউ প্রকাশ্যে মুখে আনতে চায় না। আমেরিকার দেওয়া নিরাপত্তা যখন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইসরায়েল যখন আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে এবং একটি আহত ইরান যখন নিজের পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ছুটছে—তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে হাঁটার যৌক্তিকতা উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সৌদি আরব কখনোই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার সমকক্ষ হওয়ার ইচ্ছা লুকায়নি। যুদ্ধের আগে যদি এই চিন্তাভাবনা থেকে থাকে, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা আরও জোরালো করেছে।
নিরাপত্তাহীনতা একটি রাষ্ট্রকে কীভাবে ধ্বংস করতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো কুয়েত। ইরাকের আগ্রাসনের পর ভয় তাদের পুরো নীতি বদলে দিয়েছিল: সম্পদ বিদেশে চলে গিয়েছিল, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ তলানিতে ঠেকেছিল এবং দেশের অবকাঠামো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ফলাফল? এই অঞ্চলের অন্যতম ধনী একটি তেল শক্তি, যারা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ গরমের শিকার, তাদেরও দিনের পর দিন বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে হয়েছে।
যুদ্ধ যদি কালই শেষ হয়ে যায়, তবুও এটি উপসাগরীয় অঞ্চলকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
সেই পরিবর্তন কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে এই সংঘাত কতদিন চলে এবং পথে আর কতটা ধ্বংসযজ্ঞ রেখে যায় তার ওপর।
