অভিবাসী কমাতে নজিরবিহীন পরিকল্পনা সুইজারল্যান্ডের, জনসংখ্যা রাখতে চায় ১ কোটির মধ্যে; হবে গণভোট
বিদেশি অভিবাসনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডে এবার জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমিত রাখার একটি প্রস্তাব জাতীয় গণভোটে উঠছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে দেশটির ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
রোববার অনুষ্ঠিত ভোটে সুইস নাগরিকরা সিদ্ধান্ত দেবেন, আগামী কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যা ১ কোটির বেশি হতে দেওয়া হবে কি না। সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে সুইজারল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে নিয়মিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
প্রস্তাবটির পক্ষে রয়েছে ডানপন্থী ও জনতাবাদী সুইস পিপলস পার্টি, যা বর্তমানে দেশটির পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল। দলটি বহু বছর ধরে অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করে আসছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ভোটের ফলাফল হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।
প্রস্তাবের সমর্থকদের দাবি, প্রতিবেশী ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনে সুইজারল্যান্ডের অবকাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা, সামাজিক সেবা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশটির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তাদের যুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক খাত, ওষুধশিল্প এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশি কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের ওপর সুইজারল্যান্ড ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফেডারেল সরকার ও পার্লামেন্ট উভয়ই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছে। দেশটির ব্যবসায়ী সংগঠন ইকোনোমিসুইস একে 'অযৌক্তিক প্রস্তাব' আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি সুইজারল্যান্ডের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
তবে সুইস পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা বার্নার্ড বাপস্ট দাবি করেন, উন্মুক্ত সীমান্ত নীতি চালুর পর থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নাগরিকদের সীমান্ত পেরিয়ে বসবাস ও কাজ করার বিধিনিষেধ শিথিল করার পর থেকে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত বছরের শেষ নাগাদ ৯১ লাখে (৯.১ মিলিয়ন) দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদনও ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তর সুইজারল্যান্ডের সেন্ট গ্যালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেটো ফেলমি বলেন, 'আমরা মূলত নিজেদের সাফল্যেরই শিকার।'
গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট জিতলে সরকারকে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর আগেই জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছে গেলে আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ, পরিবার পুনর্মিলন কর্মসূচি এবং আবাসিক অনুমতিপত্রের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে হতে পারে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তিও বাতিলের পথে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক বা জনসংখ্যাগত প্রভাব সীমিত থাকবে। তবে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক রেনে শভোকের মতে, এটি অনুমোদিত হলে ব্রাসেলসের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্কের অবনতি হতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নই দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। এ তালিকায় সুইজারল্যান্ডের ওপরে রয়েছে কেবল লাক্সেমবার্গ (যেখানে অর্ধেক বাসিন্দা বিদেশি) এবং অস্ট্রেলিয়া।
অভিবাসন প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। একদিকে জনসংখ্যার বার্ধক্য, অন্যদিকে বিদেশিবিরোধী মনোভাব—এই দুই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে অনেক দেশ। তবে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী অধিকাংশ বিদেশিই ইউরোপীয় নাগরিক।
গত অর্ধশতকে অভিবাসন ইস্যুতে একাধিক গণভোট হয়েছে সুইজারল্যান্ডে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের 'অতিরিক্ত অভিবাসনের বিরুদ্ধে' শীর্ষক গণভোটটি অল্প ব্যবধানে পাস হয়েছিল।
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ফিলিপ ভ্যানারের মতে, বিশ্বের কোনো দেশই এখন পর্যন্ত গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেনি। যদিও চীনের মতো কিছু দেশ অতীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অনুসরণ করেছে।
নিউশাতেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ এতিয়েন পিগের মতে, অনেক দেশই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সুইজারল্যান্ডে এ নিয়ে বিতর্ক কয়েক দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে।
সহস্রাব্দের শুরুতে যখন দেশটিতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছিল, তখনকার প্রেসিডেন্ট আদলফ ওগি বলেছিলেন, 'বিদেশিদের কারণেই আমাদের অর্থনীতি চলে। পর্যটন খাতের জন্য শ্রমিক দরকার, আর সুইজারল্যান্ডের জন্য মেধাবী মানুষেরও প্রয়োজন।'
