ফুটবল বিশ্বকাপে চার জোড়া ভাই, খেলবেন ভিন্ন দেশের হয়ে
বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন অভিবাসন প্রক্রিয়া ফুটবল মানচিত্রে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছে, এবারের বিশ্বকাপ যেন তারই এক প্রতিচ্ছবি। এবারের আসরে দেখা যাবে এক অনন্য দৃশ্য—চার জোড়া ভাই লড়বেন চারটি ভিন্ন দেশের হয়ে।
ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া দুই ভাই ডেজায়ার ও গুয়েলা দুয়ে। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) উদীয়মান তারকা ডেজায়ার খেলছেন ফ্রান্সের হয়ে। অন্যদিকে, আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক হিসেবে বড় ভাই গুয়েলা খেলছেন আইভরি কোস্টের জার্সিতে, যা তাদের বাবার জন্মভূমি।
উইলিয়ামস ভাতৃদ্বয়—ইনাকি ও নিকো, দুজনেরই জন্ম স্পেনের বাস্ক অঞ্চলে। ২৩ বছর বয়সী নিকো দুই বছর আগে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্পেনের জয়ে 'প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ' হয়েছিলেন। বড় ভাই ইনাকি উইলিয়ামসের বয়স আগামী সপ্তাহে ৩২ পূর্ণ হবে। তিনিও এক সময় স্পেনের হয়ে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলেন। তবে দীর্ঘ বিরতির পর তিনি তার বাবা-মায়ের দেশ ঘানার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘানা দলে আরও আছেন ৩০ বছর বয়সী ডাচ-জাত ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাশেন। চোটজনিত কারণে শেষ মুহূর্তে বিকল্প হিসেবে দলে ডাক পাওয়া ডেরিক এই টুর্নামেন্টে পাশে পাচ্ছেন তার সৎ ভাই ব্রায়ান ব্রবিকে। ব্রবি (২৪) খেলছেন নেদারল্যান্ডসের হয়ে।
সান্ডারল্যান্ডের হয়ে প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় ভাগে দুর্দান্ত পারফর্ম করা এই স্ট্রাইকার ডাচদের ব্যাক-আপ অপশন হিসেবে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের এই আসরে খেলছেন। এই দুই ভাইয়ের মা এক হলেও বাবা ভিন্ন।
অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা করে নিয়েছেন স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ২৭ বছর বয়সী সেন্টার-ব্যাক হ্যারি সাউটার। মজার ব্যাপার হলো, তার দুই বছরের বড় ভাই জন খেলবেন স্কটল্যান্ডের হয়ে। স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনে জন্ম নিলেও মায়ের সূত্রে হ্যারি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং জুনিয়র পর্যায়ে স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলার পর সাত বছর আগে নিজের ফুটবলীয় আনুগত্য পরিবর্তন করেন।
টুর্নামেন্টের প্রাথমিক পর্বে এই ভাইদের একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সূচি নেই। তবে মাত্র গত সপ্তাহে নঁতেতে এক প্রীতি ম্যাচে গ্যালারিতে বসে বড় ভাই গুয়েলার গোল উদ্যাপন করতে দেখেছেন ডেজায়ার। সেই ম্যাচে গুয়েলার গোলেই ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে হারায় আইভরি কোস্ট।
ম্যাচের আগে ভাইদের খুনসুটি ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের গুয়েলা বলেন, 'অবশ্যই, ম্যাচের আগে আমরা একে অপরকে একটু খেঁচিয়েছি। দিনশেষে আমরা পরিবার এবং একে অপরের সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।'
উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের অ্যাঁজাঁতে জন্ম নেওয়া এই দুই ভাইয়ের ফুটবল হাতেখড়ি হয়েছিল স্টাড রেনেই-তে। তবে তিন বছরের বড় গুয়েলা যেন ছোট ভাইয়ের আকাশচুম্বী প্রতিভার আড়ালে কিছুটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন। ডেজায়ার ইতোমধ্যেই পিএসজিতে নাম লিখিয়েছেন এবং টানা দুইবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন।
বিগত কয়েক দশকে ইউরোপে অভিবাসনের ফলে আফ্রিকান জাতীয় দলগুলোর সামনে প্রতিভার এক বিশাল দুয়ার খুলে গেছে। তারা এখন প্রবাসী খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে সেরা প্রতিভা খুঁজে নিচ্ছে। আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, মরক্কো, সেনেগাল এবং তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোর ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে এখন নিজ দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের চেয়ে ইউরোপে জন্ম নেওয়া ফুটবলারের সংখ্যাই বেশি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভাইদের একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নামার ঘটনা মাত্র একবারই ঘটেছে, এবং সেটি ছিল টানা দুটি টুর্নামেন্টে। জোহানেসবার্গে জার্মানির হয়ে রক্ষণ সামলেছিলেন জেরোম বোয়াটেং, আর তার বিপক্ষে ঘানার জার্সিতে ছিলেন বড় ভাই কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং। সেই ম্যাচে জার্মানি ১-০ গোলে জয়ী হয়েছিল।
এর চার বছর পর ফোর্তালেজায় আবারও মুখোমুখি হন তারা। সেবার ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে জেরোম বোয়াটেং বলেছিলেন, 'অবশ্যই এটি বিশেষ কিছু ছিল, তবে চার বছর পরের সেই অনুভূতিটা ছিল একদম অন্যরকম।'
