আরও কম খরচে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা তুঙ্গে
ব্যালিস্টিক-ক্ষেপনাস্ত্র বিধ্বংসী নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে পরীক্ষিত ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সিস্টেম এবং এর লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম (হিট-টু-কিল) 'প্যাক-৩' ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের ওপর কয়েক দশক নির্ভর করার পর, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশ্বব্যাপী জরুরি চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এখন তুলনামূলক সস্তা ইন্টারসেপ্টর প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও উৎপাদনের তিনটি নতুন ক্ষেত্র বা ধারা সামনে আসছে।
এদিকে, বর্তমান সংকটের তাগিদকে কাজে লাগিয়ে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নতুন এই প্রোটোটাইপগুলো সার্ভিসে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা। বর্তমানে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে যে সময় লাগে, তার চেয়ে কয়েক বছর আগেই এসব নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে এটি বেশ বড় ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাছে আকাশপথে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার কৌশলটি দীর্ঘদিন ধরেই 'আকাশে উড্ডীয়মান একটি বুলেটকে আরেকটি বুলেট দিয়ে আঘাত করার' মতো কঠিন কাজ হিসেবে বিবেচিত। একযোগে একের পর এক হুমকি ধেয়ে এলে এই কাজের জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়—যা ইরান ও ইউক্রেনে দেখা যাওয়া ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। এই ধরনের ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক সমরাস্ত্রের বর্তমান এই তোড়জোড় শুরু হয় চলতি মাসের শুরুর দিকে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অনানুষ্ঠানিক মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। সে সময় তিনি ইউক্রেনকে প্রথমবারের মতো প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ট্রাম্প বলেন, "প্যাট্রিয়ট তৈরির জন্য আমরা আপনাদের লাইসেন্স দেব। এটি খুবই দারুণ বিষয়। এর ফলে আমরা পর্যাপ্ত সরবরাহ করছি না বলে আপনারা আর অভিযোগ করতে পারবেন না।" তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনসহ অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে তখন পর্যন্ত কোনো পরামর্শ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
এর পাঁচ দিন পর ইউক্রেন ও ইউরোপের ৯টি দেশ প্যারিসে একজোট হয়ে 'ফ্রেয়া' নামের সম্পূর্ণ নতুন একটি অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জোট গঠন করে। এই জোটের সহায়তায় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে ইউক্রেন, যার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
এর এক সপ্তাহ পর লকহিড মার্টিন তাদের নিজস্ব কম খরচে ও দ্রুত উৎপাদনযোগ্য একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। আর গত বুধবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পেন্টাগন প্যাক-৩ উৎপাদনের জন্য তাদের সঙ্গে আরও ৫৩.৮৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। এতে বহুবছর মেয়াদী চুক্তিটির মোট মূল্য দাঁড়াল ৫৮.৬২ বিলিয়ন ডলারে, যার মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন সক্ষমতা তিনগুণ বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর মিসাইল) চরম ঘাটতির ফলেই মূলত অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক এই নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রকাশ্যে এসেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)-এর নতুন এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী প্রতিটি প্রায় ৩৯ লাখ ডলার মূল্যের অন্তত ১,০৬০ থেকে ১,৪৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই বিপুল ব্যবহার যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মজুতের দুই-তৃতীয়াংশই খালি করে ফেলেছে।
ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের এই কমে যাওয়া মজুতকে আরও জটিল করে তুলেছে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ। সেখানে আকাশপথে ধেয়ে আসা হুমকির মধ্যে কেবল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতেই কিয়েভের সহায়তার প্রয়োজন এবং তাদের কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে।
কেবল জুলাই মাসেই ব্যালিস্টিক-বিরোধী নতুন তিনটি ক্ষেত্র উন্মোচিত হওয়ায় ন্যাটো ও তার মিত্ররা যত দ্রুত সম্ভব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে মনোযোগ দিয়েছে।
