দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে কেন ‘ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স’ কম? উত্তর মিলল দুধ পানের হাজার বছরের অভ্যাসে
ভাতের শেষ পাতে একটু দই, ডালের ওপর ঘি কিংবা সন্ধ্যায় এক কাপ দুধ চা—দক্ষিণ এশীয়দের খাদ্যাভ্যাসে দুগ্ধজাত পণ্য যেন দৈনন্দিন সংস্কৃতিরই অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব খাবার এই অঞ্চলের মানুষ খেয়ে আসছেন স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি খুব একটা সাধারণ নয়।
বিজ্ঞান বলছে, দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজম করার ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবে সব মানুষের নেই। বরং মানবদেহ কীভাবে এই সক্ষমতা অর্জন করল, তা দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল এক বড় রহস্য।
তবে সম্প্রতি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষের ওপর করা এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে—দুধ হজম করার এই বিশেষ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে জটিল জিনগত ও বিবর্তনীয় ইতিহাস।
জন্মের পর প্রতিটি শিশুর শরীরে 'ল্যাকটেজ' নামক একটি এনজাইম বা পাচক রস তৈরি হয়। এটি দুধের শর্করা 'ল্যাকটোজ'কে ভেঙে শরীরে শোষণযোগ্য করে তোলে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের শরীর এই এনজাইম তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বড় হওয়ার পর দুধ পান করলে অনেকেরই পেটব্যথা বা হজমের সমস্যা দেখা দেয়, যা 'ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স' নামে পরিচিত।
তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ল্যাকটেজ তৈরির ক্ষমতা আজীবন বজায় থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ল্যাকটেজ পারসিস্টেন্স'। এই বিশেষ সক্ষমতার কারণেই অনেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও অনায়াসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খেতে পারেন, কোনো শারীরিক অস্বস্তি ছাড়াই।
নতুন গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই ল্যাকটেজ পারসিস্টেন্সের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার বছরের খাদ্যাভ্যাস, পশুপালন এবং পরিবেশগত অভিযোজনের ইতিহাস।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ এশীয়দের এই দুধ হজমের ক্ষমতার শেকড় প্রোথিত প্রায় ৫০০০ বছর আগে। বর্তমান পশ্চিম রাশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চলের একদল পশুপালক যাযাবর জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এই জিনটি এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
হাড়কাঁপানো শীতে সেখানে ফসল ফলানো অসম্ভব ছিল বলে তারা জীবনধারণের জন্য গবাদি পশুর দুধ ও মাংসের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। টিকে থাকার লড়াইয়েই তাদের শরীরে এই বিশেষ বিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে এই যাযাবর দলগুলো যখন ইউরোপ ও ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে দুধ হজমের সেই 'ম্যাজিক জিন'।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বংশগতিবিদ প্রিয়া মুরজানির নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রায় ৮ হাজার মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা যায়, উত্তর ইউরোপের ৮০-৯০ শতাংশ মানুষের এই জিন থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় চিত্রটি ভিন্ন। উপমহাদেশটির উত্তরাঞ্চলে এর উপস্থিতি ৬৫ শতাংশের বেশি হলেও দক্ষিণে তা মাত্র ৩০ শতাংশের মতো।
গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মানুষের জন্য দুধ হজম করতে পারাটা মূলত একটি 'উত্তরাধিকার'। অর্থাৎ, অভিবাসনের মাধ্যমে আসা যাযাবরদের থেকে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। ইউরোপে যেমন প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য এই জিন থাকা 'বাধ্যতামূলক' ছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় ঠিক তেমনটি ছিল না।
তবে এই সাধারণ নিয়মের বাইরে পাওয়া গেছে দুটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে—দক্ষিণ ভারতের 'টোডা' এবং পাকিস্তানের 'গুজ্জর' সম্প্রদায়। এই দুই পশুপালক গোষ্ঠীর মধ্যে দুধ হজমকারী জিনের উপস্থিতি অত্যন্ত প্রবল। গবেষকদের মতে, এটি মানব বিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ। আজও এই দুই সম্প্রদায়ের পুরো অর্থনীতি ও খাদ্যাভ্যাস গবাদি পশুর ওপর নির্ভরশীল। দুধ ছাড়া জীবনধারণ অসম্ভব ছিল বলেই বিবর্তনের ধারায় তাদের শরীরে এই জিনটি এত শক্তিশালীভাবে জেঁকে বসেছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বংশগতিবিদ জোহানেস ক্রাউস মনে করেন, এই গবেষণা এক দীর্ঘ ধাঁধার অবসান ঘটিয়েছে। আগে ধারণা করা হতো, হয়তো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অন্য কোনো কারণে মানুষের শরীরে এই জিনটি জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এখন এটি স্পষ্ট যে, দুধই ছিল সেই মূল চালিকাশক্তি যা মানুষের জিনগত বিন্যাস বদলে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ল্যাকটেজ পারসিস্টেন্স–সংক্রান্ত এই জিনের রূপভেদটি বিশেষভাবে উপকার করেছে সেই সব পশুপালক গোষ্ঠীকে, যাদের জীবনধারণ প্রায় পুরোপুরি দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দুধ তাদের জন্য শুধু খাবার নয়, ছিল টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। ত
বে যেসব জনগোষ্ঠী কৃষিকাজ ও পশুপালন—উভয় ব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত ছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তাদের জন্য এই বিবর্তনীয় সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর হয়েছে।
