দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন কি নিষিদ্ধ? কী রীতি অনুসরণ করা হয়?
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভোটকেন্দ্রের ভেতর মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। কর্তৃপক্ষের মতে, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা, ভোটারদের জোরজবরদস্তি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন রোধ ও নির্বাচনের সময় সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ভোটারদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে দেশভেদে এই নিয়মগুলোর ভিন্নতা দেখা যায়।
বাংলাদেশ
আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যেও মোবাইল ফোনসহ অবস্থান করা নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শুধু 'ইলেকশন সিকিউরিটি ২০২৬' অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীরা এই বিধিনিষেধের আওতামুক্ত থাকবেন।
ভারত
ভোটকক্ষের ভেতর মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। পুনে ও মাভালের মতো কিছু এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা ভোটকেন্দ্রের ১০০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত কার্যকর। নির্বাচন কর্মকর্তারা এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে একাধিক কারণ দেখিয়েছেন। এর অন্যতম হলো কনডাক্ট অফ ইলেকশন রুলস, ১৯৬১-এর ৪৯এম ধারা কার্যকর করা, যা ভোটের গোপনীয়তা নিশ্চিত করে। এছাড়া, অনেক ভোটার ভোট দেওয়ার সময় নিজের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন—এই প্রবণতা রোধ করাও এর একটি উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালের বিহার নির্বাচনের সময়, যেসব ভোটার ফোন নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদর সুবিধার্থে নির্বাচন কমিশন ভোটকক্ষের বাইরে মোবাইল জমা রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (যেমন: ছোট খোপওয়ালা বাক্স বা পাটের ব্যাগ) চালু করেছিল।
পাকিস্তান
ভোটগ্রহণের সময় ভোটার, নির্বাচনি এজেন্ট ও পোলিং এজেন্টদের মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করার অনুমতি নেই। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
আফগানিস্তান
ফ্রিডম হাউসের তথ্যমতে, ২০১৪ সালসহ অতীতের গণতান্ত্রিক নির্বাচনগুলোতে ভোটকেন্দ্রের ভেতর মোবাইল ফোন ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ছিল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাতে কেউ হামলা সমন্বয় বা ভোটারদের ভয় দেখাতে না পারে, সেজন্যই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা দেশজুড়ে স্মার্টফোন ব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করার নির্দেশ দেন। বর্তমানে দেশটিতে আনুষ্ঠানিক 'নির্বাচন' স্থগিত রয়েছে। তবে দ্য স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় কোনো ভোটাভুটি বা শুরা (পরামর্শক সভা) কার্যক্রম এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং 'পাপ প্রতিরোধ ও পুণ্য প্রচার' মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। নিরাপত্তা রক্ষা ও 'দৃশ্যমান পাপাচার' রোধে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে ক্যামেরাযুক্ত ফোন নিষিদ্ধ করার নজির প্রায়ই দেখা যায়।
ভুটান
ভোটকেন্দ্রের অন্যান্য স্থানে ফোন রাখার অনুমতি থাকলেও ভোটিং কম্পার্টমেন্টে ফোন নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভুটানের নির্বাচন কমিশনের মতে, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষার্থেই এই নিয়ম করা হয়েছে। বিশেষ করে সিল মারা ব্যালট পেপারের ছবি তোলা ভোটারদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মালদ্বীপ
পোলিং বুথের ভেতরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যাতে কেউ সিল মারা ব্যালট পেপারের ছবি তুলতে না পারেন। মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশনের মতে, নির্বাচনি কারচুপি কমানোই এর লক্ষ্য। বিশেষ করে ভোট কেনাবেচা বা জবরদস্তির মতো ঘটনায় ভোটাররা যাতে কাকে ভোট দিয়েছেন তার প্রমাণ হিসেবে ছবি দেখাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নেপাল
নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। নেপালের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনি আইন ও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মেনে চলার স্বার্থে মোবাইল ফোনকে 'নিষিদ্ধ পণ্য' হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। দেয়াশলাই, লাইটার ও ক্যামেরাও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
শ্রীলঙ্কা
ভোটকেন্দ্র ও ভোট গণনা কেন্দ্র—উভয় জায়গাতেই মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। পছন্দক্রম অনুযায়ী ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলাকালীন অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়াতে এবং ভোটার, এজেন্ট ও পর্যবেক্ষকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষ ভোটারদের বাড়িতেই ফোন রেখে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলজুড়েই এই নিষেধাজ্ঞাগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখার তাগিদ থেকে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষগুলোর বক্তব্য হলো, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা এর উদ্দেশ্য নয়; বরং গোপনীয়তা রক্ষা, নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খলভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য।
