দক্ষিণ এশিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নানামুখী হুমকির মুখে: বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে বিশেষজ্ঞরা
দক্ষিণ এশিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা রাজনৈতিক মেরুকরণ, আর্থিক ও কর্পোরেট প্রভাব এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার কারণে ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত 'বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে' বক্তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য জোরালো প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম 'দ্য ডন'-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন কেবল প্রতিবেদকের সাহসের ওপর নির্ভর করে না। এটি অনেকাংশে নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি নিতে কতটা ইচ্ছুক—তার ওপর।
রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণ হওয়া সমাজে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ক এক অধিবেশনে তিনি বলেন, "দুর্নীতি ফাঁস করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই পরিকল্পিত অপপ্রচার, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া এবং কণ্ঠরোধের জন্য নানা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে পড়েন। যখন আপনি বেসরকারি খাত বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করবেন, তখন পাল্টা আঘাত আসা অনিবার্য।"
তিনি আরও বলেন, সংবাদ কক্ষের সম্পাদকরা প্রতিবেদন নির্বাচন ও গুরুত্ব নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করলেও প্রকাশকদের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন ছাড়া সম্পাদকীয় স্বাধীনতা টিকে থাকা সম্ভব নয়। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রোপার্টি, ফিন্যান্স ও সরকারি খাতের দুর্নীতি তদন্ত করতে গিয়ে তার সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
কানাডীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলিয়ান শের বলেন, দুর্নীতি এখন বিশ্বায়িত হয়েছে, যার ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, "কানাডাসহ বিশ্বজুড়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি যে দুর্নীতি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। টাকা বিশ্বজুড়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘোরে, তাই এটি তদন্তে সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।" অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রাকৃতিকভাবেই একটি বিপজ্জনক কাজ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায় কর্তৃপক্ষের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে মূলত নীরব থেকেছে, তা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়।"
তিনি অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এবং বারবার হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানানো হলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি আরও বলেন, "এমন নয় যে সরকারের কাছে তথ্য ছিল না কিংবা কোনো আবেদন করা হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।"
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সংবাদ শিল্পের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ জবাবদিহিতামূলক সাংবাদিকতাকে দুর্বল করছে এবং এই অঞ্চলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। তারা জোর দিয়ে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের 'ওয়াচডগ' বা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সংবাদকর্মী, মিডিয়া বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
