৫+২+২+২-২: থালাপতি বিজয়ের সরকার গঠনের অঙ্ক মিলছে না কেন?
সরকার গঠনের দাবি নিয়ে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বিজয় তিন দিনে তিনবার তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে তিনবারই বিজয়কে ফিরিয়ে দিয়েছেন রাজ্যপাল।
২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজগম (টিভিকে) ১০৮টি আসন নিয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু বিজয় নিজে দুটি আসন থেকে জয়ী হওয়ায় তাকে নিয়ম অনুযায়ী একটি আসন ছেড়ে দিতে হবে। ফলে দলের মোট বিধায়ক সংখ্যা এখন ১০৭।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে ছোট দল এবং ডিএমকে জোটের সাবেক শরিকদের কাছ থেকে এই বাকি ১১টি আসন জোগাড় করতে এখন রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছে টিভিকে শিবিরকে।
প্রাথমিক খবরে বলা হয়েছিল, বাম দলগুলোর সমর্থন এবং ভিসিকে-এর (বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচি) ইতিবাচক ইঙ্গিতে টিভিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কিন্তু ভিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনের কোনো চিঠি না দেওয়ায় বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
এর মধ্যেই আম্মা মাক্কাল মুনেত্রা কাজগমের (এএমএমকে) একটি ভুয়া সমর্থনপত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। দলটির প্রধান টিটিভি দিনাকরণ অভিযোগ করেন, টিভিকে সমর্থকেরা বিজয়ের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে—এমন একটি ভুয়া চিঠি ছড়াচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তার দলের একমাত্র বিধায়ক এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকেই সমর্থন করবে।
সূত্র জানিয়েছে, রাজ্যপাল অন্তত ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনের লিখিত প্রমাণ ছাড়া বিজয়কে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাতে রাজি নন। সম্ভাব্য মিত্রদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, অস্পষ্ট সমর্থনপত্র এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর পাল্টাপাল্টি দাবির কারণে সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
শর্তসাপেক্ষে পাশে কংগ্রেস (৫ আসন)
ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে টিভিকে-কে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেওয়া প্রথম বড় দল হলো কংগ্রেস। তবে এই সমর্থন কোনো শর্তহীন ব্যাপার ছিল না। কংগ্রেস জানিয়েছিল, টিভিকে যদি জোট থেকে 'সাম্প্রদায়িক শক্তিকে' (পরোক্ষভাবে বিজেপি ও এনডিএ) দূরে রাখে, তবেই তারা সমর্থন দেবে।
পরে তামিলনাড়ু কংগ্রেসের প্রধান কে সেলভাপেরুন্থাগাই জানান, টিভিকে তাদের দুটি মন্ত্রী পদ এবং একটি রাজ্যসভা আসন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া আগামী স্থানীয় ও সংসদীয় নির্বাচনেও এই জোট অটুট রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে কংগ্রেস।
তবে শুধু কংগ্রেসের পাঁচ বিধায়কের সমর্থন বিজয়কে ম্যাজিক ফিগার পার করানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
'স্থিতিশীল সরকারের' জন্য সিপিআইয়ের সমর্থন (২ আসন)
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) বিজয়কে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে তামিলনাড়ুতে 'স্থিতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শাসন' নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একে তারা 'শর্তসাপেক্ষ সমর্থন' বলছে।
সিপিআইয়ের রাজ্য সম্পাদক এম ভিরাপান্ডিয়ান জানান, জনগণের রায়কে সম্মান জানাতে এবং রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা রাষ্ট্রপতির শাসন এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দেবে এবং মন্ত্রিসভায় কোনো পদ চাইবে না।
সিপিআই(এম)-এর নিঃশর্ত সমর্থন (২ আসন)
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম) সরকার গঠনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকে-কে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। তারাও জানিয়েছে যে তারা মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে না।
দলের রাজ্য সম্পাদক পি শানমুগাম বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এড়াতে এবং তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিজেপির 'পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ' আটকাতেই বাম দলগুলো এই হস্তক্ষেপ করেছে।
তবে মার্ক্সবাদী দলটি জানিয়েছে, রাজ্যের অধিকারের মতো ইস্যুতে তারা আদর্শগতভাবে ডিএমকের পক্ষেই থাকবে।
ক্ষমতার ভাগ নিয়ে ভিসিকে-এর অবস্থান অনিশ্চিত (২ আসন)
এই নম্বর গেমে ভিসিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ অনিশ্চিত খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাম নেতারা বারবার দাবি করেছেন যে ভিসিকে বিজয়কে সমর্থন করবে, কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে রাজ্যপালের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি জমা পড়েনি।
শুক্রবার রাতে দলটির অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে একটি পোস্ট দিয়ে জানানো হয়, তারা বিজয়কে সমর্থনের চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যেই টুইটটি মুছে ফেলা হয় এবং অ্যাকাউন্টটি স্থগিত (সাসপেন্ড) করা হয়।
ভিসিকে প্রধান থল থিরুমাভালাভান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেননি। তবে দলের উপসাধারণ সম্পাদক ভান্নি আরাসু সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ এবং মন্ত্রিসভায় একটি পদ দাবি করেছেন। ভিসিকে-এর এই অস্পষ্ট অবস্থান সরকার গঠনে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
'হ্যাঁ' বলেও সরে গেল আইইউএমএল (২ আসন)
ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল) শুরুতে বিজয়ের সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও, পরে প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তোলে।
শুক্রবার আইইউএমএলের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, তাদের দুই বিধায়ক 'সরকার গঠনের জন্য রাজ্যপালের যেকোনো উদ্যোগকে' সমর্থন করবেন। এটিকে বিজয়ের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কয়েকজন বাম নেতাও দাবি করেছিলেন যে আইইউএমএল সমর্থনপত্র জমা দিয়েছে।
কিন্তু পরে একই দিনে আইইউএমএল নেতা এ এম শাহজাহান এসব দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সমর্থনপত্রের খবরকে 'গুজব' বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, 'আমরা কাউকে সমর্থন দিইনি বা কোনো চিঠিও দিইনি। আমরা ডিএমকের নেতৃত্বাধীন জোটেই থাকছি।'
জালিয়াতির অভিযোগ এএমএমকে-এর (১ আসন)
বিজয়কে সবচেয়ে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে টিটিভি দিনাকরণের নেতৃত্বাধীন এএমএমকে। দিনাকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যপালকে চিঠি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পালানিস্বামীকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং এআইএডিএমকে-কে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি টিভিকে সমর্থকদের বিরুদ্ধে এএমএমকে-এর সমর্থনের 'ভুয়া' চিঠি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে একে 'হর্স-ট্রেডিং' এবং 'গণতন্ত্রের প্রহসন' বলে মন্তব্য করেছেন।
তফাতে দুই প্রধান দল
তামিলনাড়ুর দুই চিরশত্রু দ্রাবিড় দল—ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে—এখন পর্যন্ত বিজয়কে সমর্থন দেয়নি।
মাঝে ডিএমকে-এআইএডিএমকে জোটের একটি জল্পনা তৈরি হলেও, দুই শিবিরের নেতারাই একান্তে এই ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এর পরিবর্তে, ৫৯টি আসন পাওয়া ডিএমকে এবং ৪৭টি আসন পাওয়া এআইএডিএমকে নীরব দর্শকের মতো নির্বাচন-পরবর্তী এই দর-কষাকষি দেখছে এবং নিজেদের জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
বিজয় ১১৬, ১১৭ নাকি ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থন পেয়েছেন, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি চলছেই। টিভিকে নেতারা আত্মবিশ্বাসী যে শনিবারই বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তবে রাজভবনের সূত্রগুলো বলছে, রাজ্যপালের কাছে যে হিসাব পেশ করা হয়েছে, তাতে তিনি এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
সব সমর্থনকারী দলের আনুষ্ঠানিক চিঠি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এবং বিধায়কের সংখ্যা স্পষ্টভাবে ১১৮ পার না হওয়া পর্যন্ত তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ঝুলেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
