তালেবানের একগুঁয়েমি দক্ষিণ এশিয়াকে টেনে নিচ্ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে
আফগানিস্তানের তালেবান আবারও প্রমাণ করলো, এখনো মতাদর্শ ও ক্ষোভের গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে তারা অক্ষম। সীমান্ত সংঘাত অবসানে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-আফগানিস্তান কূটনৈতিক বৈঠকও শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হলো। অথচ অনেক পর্যবেক্ষকই আলোচনাকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এক সম্ভাব্য মাইলফলক হিসেবে দেখছিলেন।
উক্ত আলোচনায়, তালেবান প্রতিনিধিদল কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই আসে, সীমান্তপারের সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তানের লিখিত অঙ্গীকারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং আফগানিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দেওয়া নিয়ে ইসলামাবাদের উদ্বেগকে "অতিরঞ্জিত" বলে উড়িয়ে দেয়। ফলে আলোচনার ভেস্তে যাওয়া পাকিস্তানের জেদ থেকে নয়, বরং কাবুলের কূটনৈতিক সংযমের বদলে উগ্র চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ বেছে নেওয়া থেকেই ঘটে।
এই ব্যর্থতা তালেবানের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকেই উন্মোচন করে—যে মানসিকতা তাদের ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দৃশ্যমান। তারা একদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখায়। বৈধতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি তোলে, কিন্তু সেই সার্বভৌমত্বের মৌলিক শর্ত—নিজের ভূমিকে সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটিতে পরিণত না করা—পূরণ করতে অক্ষমতার পরিচয় দেয়।
ইস্তাম্বুলে তাদের সামনে শান্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার পথে এক ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ হাতছাড়া করে চলে গেছে, এবং আবারও প্রমাণ করেছে—তালেবান সরকারের কূটনীতি এখনো মূলত আত্মপ্রবঞ্চনা ও দোষারোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ইস্তাম্বুল আলোচনা থেকে পাকিস্তানের প্রত্যাশা কোনোভাবেই অবাস্তব ছিল না। কোনো রাষ্ট্রই নিজের সীমান্তে প্রতিবেশীর ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসী হামলা মেনে নিতে পারে না। ইসলামাবাদ বহুদিন ধরেই তালেবান সরকারের কাছে টিটিপির ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে ও জঙ্গিদের হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে।
কিন্তু, তালেবানের পক্ষ থেকে যাচাই ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়টি আলোচনায় তুলতে অস্বীকৃতি শুধুই মতাদর্শগত নয়, বরং রাজনৈতিকও। এটি প্রমাণ করে, তারা এখনো নিজেদের একটি বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবেই দেখে—রাষ্ট্র হিসেবে নয়, যার জবাবদিহি থাকে নিজ দেশের নাগরিকসহ ও প্রতিবেশী দেশ—উভয়ের কাছেই।
তবে এখন আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন—তালেবানের এই অনমনীয়তা কি সম্পূর্ণ তাদের নিজের ভুল সিদ্ধান্তের ফল, নাকি পেছনে অন্য কোনো শক্তি গোপনে তাদের এমন অবস্থানে উৎসাহ দিচ্ছে? প্রশ্নটি সঙ্গত, কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তালেবানের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়েছে।
ভারতীয় কূটনীতিকরা দোহা ও নয়াদিল্লিতে তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যাকে তারা "উন্নয়নমূলক সংলাপ" বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু এই যোগাযোগের সময়সূচি—এবং একইসঙ্গে তালেবানপন্থী ও ভারতঘনিষ্ঠ সামাজিকমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোতে ছড়ানো পাকিস্তানবিরোধী প্রচারণা—উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
তালেবানের এই অটল অবস্থান কি সত্যিই স্বাধীন সিদ্ধান্তের ফল? নাকি অন্তত আংশিকভাবে ভারতের মোদি সরকারের কৌশলগত সমীকরণের প্রতিফলন?
নরেন্দ্র মোদির প্রশাসনের কাছে এক অস্থিতিশীল পাকিস্তান নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত সুবিধা। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়, পাকিস্তানকে একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখে এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করে।
অন্যদিকে এমন আফগানিস্তান—যে পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায় না, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয় এবং সীমান্ত অস্থিতিশীল করে তোলে—নয়াদিল্লির জন্য নিঃসন্দেহে লাভজনক পরিস্থিতি। যদিও দিল্লি-কাবুলের মধ্যে সরাসরি সমন্বয়ের কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই, তবু ঘটনাপ্রবাহের পেছনে উভয়ের স্বার্থের মিল অস্বীকার করা কঠিন।
তালেবান অবশ্য নিছক ক্রীড়নক নয়। তাদের জেদি মনোভাবের পেছনে আরও রয়েছে এক গভীর মানসিক ক্ষোভ—তাদের ধারণা, পাকিস্তান তাদের "ব্যবহার করে ফেলে দিয়েছে।" তারা টিটিপিকে—যাদের "পাকিস্তানি তালেবান" বলা হয়—সন্ত্রাসী নয়, বরং মতাদর্শিক সহযোদ্ধা হিসেবে দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নৈতিক সীমারেখা ঝাপসা করে না, বরং আঞ্চলিক শান্তির জন্য ভয়াবহ হুমকিও তৈরি করে।
এই যুক্তি আঁকড়ে ধরে তালেবান এখন নিজেদের ক্রমশ একঘরে করছে। সন্ত্রাস দমনে নিষ্ক্রিয়তা শুধু পাকিস্তানকেই ক্ষুব্ধ করছে না; বরং বেইজিং, রিয়াদ ও আঙ্কারাও ক্রমবর্ধমানভাবে বিরক্ত—যারা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের শর্ত হিসেবে নীরবে কাবুলকে ইসলামাবাদের সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে আসছে।
ইস্তাম্বুল আলোচনার ব্যর্থতা কেবল কূটনৈতিক নয়, তার প্রভাব সামরিক ও মানবিক উভয় ক্ষেত্রেই পড়বে। সীমান্তের ওপার থেকে হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান আর চুপ থাকবে না—কূটনীতি ব্যর্থ হলে সামরিক প্রতিক্রিয়া ক্রমেই সম্ভাব্য হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান হারাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবশিষ্ট সদিচ্ছাটুকুও।
ফলে এখানে ট্র্যাজেডি কেবল রাজনৈতিক নয়, নৈতিকও। সাধারণ আফগান জনগণ—যারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চাপে ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে—তারা আবারও মূল্য দিচ্ছে তাদের নেতাদের মতাদর্শিক অহংকারের জন্য। প্রতিটি ব্যর্থ সংলাপ মানে কমে যাওয়া বাণিজ্য, কমে যাওয়া বিনিয়োগ এবং তালেবানের একা হয়ে পড়া আরও গভীরতর হওয়া।
তালেবান আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবি করে, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড সেই সার্বভৌমত্বকে ফাঁপা করে তুলছে—যা এখন জঙ্গিবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, অবিশ্বাসে চালিত এবং সম্ভাব্যভাবে বাইরের শক্তিগুলোর প্রভাবের হাতে বন্দি।
যদি তালেবানের এই অবস্থান হয় অদূরদৃষ্টির ফল, তবে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। আর যদি এটি হয় বাইরের শক্তির (বিশেষত ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর) প্ররোচনায় গঠিত, তবে তা ভয়ংকর। উভয় ক্ষেত্রেই আফগানিস্তান আবারও পরিণত হচ্ছে অন্যদের ভূরাজনৈতিক খেলায় ব্যবহৃত এক পুতুলে, আর দক্ষিণ এশিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে অস্থিতিশীলতার নতুন প্রান্তে।
ইস্তাম্বুল বৈঠক হতে পারত এক নতুন সূচনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি আরেকটি নজির হয়ে রইল—কেন শান্তির জন্য প্রয়োজন শাসকদের দূরদৃষ্টির। এই ঘটনা আরও বলছে, যারা নিজেদের অতীত ক্ষোভের বাইরে দেখতে পারে না, তারা ভবিষ্যতেও বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে।
লেখক: অ্যাডভোকেট মাজহার সিদ্দিক খান পাকিস্তানের লাহোর হাইকোর্টের একজন আইনজীবী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এই লেখাটি এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত তার মূল নিবন্ধ থেকে টিবিএসের পাঠকদের জন্য অনূদিত।
