ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর পথে আরব আমিরাত, সৌদিসহ উপসাগরীয় মার্কিন মিত্ররা
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তাদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা ধারাবাহিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কার কারণেই তারা এই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
সম্প্রতি নেওয়া পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে এবং ইরানের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। তবে এখনো এসব দেশ প্রকাশ্যে নিজেদের সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেনি—যদিও পরিস্থিতির চাপে সেই অবস্থান বদলাতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সৌদি আরব সম্প্রতি আরব উপদ্বীপের পশ্চিমাংশে অবস্থিত তাদের 'কিং ফাহদ বিমানঘাঁটি' মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে রিয়াদ জানিয়েছিল, তারা ইরানের ওপর হামলায় তাদের কোনো স্থাপনা বা আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। যুদ্ধের বাইরে থাকার এই চেষ্টা ব্যর্থ হয় যখন ইরান সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা এবং রাজধানী রিয়াদে একের পর এক মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
সূত্রের মতে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছেন এবং হামলায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। 'সৌদি আরবের যুদ্ধে প্রবেশ করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার', বলেন ওই সূত্র।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান গত সপ্তাহে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার পর সাংবাদিকদের বলেন, 'ইরানের হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের ধৈর্য অসীম নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিক্রিয়া জানাতে অক্ষম—এমন যেকোনো ধারণা ভুল।'
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানি মালিকানাধীন সম্পদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে, যা তেহরানের শাসকদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে দেশটি তাদের সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠাবে কি না তা নিয়ে আলোচনা করছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখবে এমন যে কোনো অস্ত্রবিরতির বিরুদ্ধে লবিং করছে।
দুবাইয়ে অবস্থিত 'ইরানিয়ান হসপিটাল' এবং 'ইরানিয়ান ক্লাব' সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার হাসপাতালটির ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল এবং ওয়েবসাইট অচল ছিল। দুবাই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি আর চালু নেই।
আমিরাত সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'ইরানি শাসনব্যবস্থা এবং আইআরজিসি-র (ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী) সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে বন্ধ করা হবে, কারণ এগুলো ইরানি জনগণের সেবার পরিবর্তে অন্য উদ্দেশ্য হাসিলে অপব্যবহার করা হচ্ছিল, যা ইউএই আইনের লঙ্ঘন।'
ইউএই দীর্ঘদিন ধরে ইরানি ব্যবসা ও ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র ছিল। তবে এখন তারা সতর্ক করেছে, প্রয়োজনে ইরানের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রায় ইরানের প্রবেশাধিকার আরও সীমিত হতে পারে, বিশেষ করে যখন মুদ্রাস্ফীতি ও নিষেধাজ্ঞার চাপে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধুঁকছে।
যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে বলেছে যে তারা ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেবে না বা তাদের আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দেবে না, তবে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মূল কোম্পানি নিউজ কর্প-এর মালিকানাধীন 'স্টোরিফুল' দ্বারা যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত কিছু গ্রাউন্ড-বেসড মিসাইল বাহরাইন থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি মিসাইল হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং প্লেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আরব দেশগুলো যুদ্ধে সহায়তা করছে কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বলেছে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের হয়ে কথা বলবে।
ইউএই এবং সৌদি আরবের এই পদক্ষেপগুলো দেখায় কীভাবে আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার গভীরে জড়িয়ে পড়ছে, যদিও তারা এমন অবস্থানে থাকতে চায়নি।
সরাসরি ইরানে হামলা চালানোর অর্থ হলো, সরু একটি জলভাগের ওপারে থাকা বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি হঠাৎ করে যুদ্ধ শেষের ঘোষণা দেন, তবে তেহরানের সঙ্গে এই বৈরী পরিস্থিতি আরব দেশগুলোকে একাই মোকাবিলা করতে হবে। তারা এ নিয়ে আরও শঙ্কায় আছে যে, যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ কেবল নামমাত্রই হবে এবং তা দিয়ে যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।
কিন্তু ইরান তাদের বাধ্য করছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান এটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে নিজেদের পছন্দের কিছু জাহাজকে তারা পার হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তেহরান সম্প্রতি আরব কর্মকর্তাদের বলেছে যে তারা সুয়েজ খালের মতো এখানেও (হরমুজ প্রণালি) শুল্ক আদায় করতে চায়।
এই অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্রে এমন হুমকি তখন এল, যখন ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর মিসাইল ও ড্রোন বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। তারা বিলাসবহুল হোটেল, বিমানবন্দর, শোধনাগার এবং জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালিয়েছে। কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতকেই (ইউএই) দুই হাজারেরও বেশি হামলা প্রতিহত করতে হয়েছে।
আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা, বিশেষ করে ইউএই এবং সৌদি আরব, নিয়মিত ফোনালাপে ট্রাম্পকে কাজ শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তারা চাইছেন, অন্য পদক্ষেপে যাওয়ার আগে ট্রাম্প যেন ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনীতি তাদের নিরাপদ রাখবে—এমন ভরসা ভেঙে পড়েছে। গত সপ্তাহে ইরান যখন কাতারের রাস লাফান জ্বালানি কেন্দ্র, সৌদি আরবের লোহিত সাগরের জ্বালানি হাব এবং কুয়েত ও ইউএই-র স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখন এই বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়।
কাতার এই হামলাকে একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
আরব কর্মকর্তারা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। তবে তারা এই ভেবেও হতাশ যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তাবিষয়ক বড় অংশীদারিত্ব ও বিপুল বিনিয়োগ করার পরও ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তারা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না।
গত সপ্তাহে আরবদের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের ওই হামলাগুলো মূলত ইসরায়েলি হামলারই প্রতিশোধ ছিল। ইসরায়েল এর আগে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র 'সাউথ পার্স'-এ হামলা চালিয়েছিল। আরব দেশগুলো ভেবেছিল, তেহরানের জ্বালানি ডিপোতে ইসরায়েলের আগের হামলার পর নতুন করে এ ধরনের আক্রমণ ঠেকাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সফলভাবে রাজি করাতে পেরেছে।
কিন্তু মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এর বদলে যুক্তরাষ্ট্র আগাম নোটিশ পাওয়ার পরও ইসরায়েলকে সাউথ পার্স-এ হামলার অনুমতি দেয়।
যুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র তুলে নেওয়ার এই আসন্ন সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, আমেরিকার মিত্ররা কতটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এই সংঘাত তাদের বছরের পর বছর ধরে করা কৌশলগত পরিকল্পনাকে উল্টে দিয়েছে এবং সামনে এগোনোর মতো কোনো ভালো বিকল্প রাখেনি।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের মার্কিন-উপসাগরীয় সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক গ্রেগরি গউস বলেন, 'তারা এমন এক কাঠামোগত ফাঁদে আটকা পড়েছে, শক্তিশালী পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলে দুর্বল পক্ষগুলোর ক্ষেত্রে যা সবসময়ই হয়। শক্তিশালী পক্ষ যখন আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়, তখন দুর্বল মিত্ররা এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে থাকে, যে যুদ্ধে তারা আদতে জড়াতেই চায় না।'
