ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতা করতে চাপ দিয়েছিল হোয়াইট হাউজ
ইরানের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিল হোয়াইট হাউস।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, একদিকে হোয়াইট হাউস ইরানের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নানা হুমকি দিয়ে বেড়িয়েছেন। এমনকি ইরান 'চুক্তির জন্য কাকুতি-মিনতি করছে' এমন দাবিও করেছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদকে লাগাতার চাপ দিয়েছে ইরানকে যুদ্ধবিরতির জন্য রাজি করাতে, যাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা যায়।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি তেহরানে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে ব্যাক-চ্যানেল আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল মঙ্গলবার রাতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। অথচ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন- ইরান যদি তার শর্ত না মানে, তিনি 'পুরো ইরানি সভ্যতাকেই নিশ্চিহ্ন' করে দেবেন।
জ্বালানির মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইরানের দৃঢ় প্রতিরোধ দেখে বিস্মিত ট্রাম্প ২১ মার্চ তার দেওয়া প্রথম আল্টিমেটামের সময় থেকেই সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য আগ্রহী ছিলেন।
মঙ্গলবারের ডেডলাইন ঘিরে মুনির শীর্ষ আমেরিকান কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ শুরু করেন, যার মধ্যে ছিলেন ট্রাম্প, ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান বিশ্বাস করেছিল, ইরান যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরপেক্ষ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাধ্যমে এই প্রস্তাব পায়, তবে সে এটি গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেশি।
মুনিরের সঙ্গে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির আলোচনার পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সামাজিক মাধ্যমে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি প্রকাশ করেন।
শেহবাজ শরীফ এই চুক্তিকে পাকিস্তানের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে তিনি ভুলবশত তার পোস্টের শুরুতে একটি বিষয়শিরোনাম যুক্ত করে দেন: 'ড্রাফট — পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এক্সে বার্তা।'
ট্রাম্প হরমুজ খোলার জন্য প্রথম আলটিমেটাম দেওয়ার পর থেকেই মুনির ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ইরানি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বার্তা আদান-প্রদান শুরু করেন।
তারা ইসলামাবাদকে শান্তি সম্মেলনের স্থান হিসেবে প্রস্তাব করেন, মার্কিনিদের ১৫ দফা প্রস্তাবের খসড়া, ইরানের ৫ ও ১০ দফা প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া শেয়ার করেন এবং ৪৫ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির বিকল্প তুলে ধরেন।
দুই পক্ষের চাহিদার মধ্যে বড় ফারাক থাকলেও, সময়ের সঙ্গে ইরান ইউরেনিয়ামের মজুত সীমিত করতে এবং গ্রহণযোগ্য করতে রাজি হয়ে যায়।
অবশেষে তেহরানের রাজনীতিকরা নীতিগতভাবে হরমুজ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মতি দেন। তবে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া ছিল চ্যালেঞ্জিং।
ইরানের আধিপত্যশালী সামরিক ও রাজনৈতিক বাহিনী আইআরজিসির মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। এর একটা অংশ যুদ্ধ শেষ করার, প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার ও আমেরিকানদের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার বিরোধিতা করছিল।
মঙ্গলবার সৌদি আরবের পেট্রোকেমিক্যাল শহর জুবাইলে ইরানি ড্রোন হামলা হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এটি 'আলোচনাকে ব্যাহত করার শেষ চেষ্টা।'
ইসলামাবাদ ইরানকে সতর্ক করে যে হামলা শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পারে।
এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে পাকিস্তান।
শেষ পর্যন্ত বুধবার দুপুরে শেহবাজ শরীফের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিশ্চিত করেন যে ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠাবে ইরান।
পাকিস্তানি কূটনীতিকরা আশা করছেন, ইসলামাবাদে আলোচনায় ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং উইটকফ অংশ নেবেন। বিপরীতে থাকবেন আরাগচি, সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ এবং আইআরজিসির একজন 'জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা'।
ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন, এই যুদ্ধবিরতির বাইরে থাকবে লেবানন।
একই সঙ্গে ইসলামাবাদে সন্দেহ রয়েছে যে আইআরজিসির কিছু অংশ এখনও উপসাগরীয় স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
বুধবার বিকেলে আসিম মুনিরের সঙ্গে এক ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাকে ধন্যবাদ জানান।
তবে ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি 'ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের' বিষয়টি তুলে ধরেন।
দুই পাকিস্তানি কর্মকর্তার মতে, ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তানেরও আপত্তি রয়েছে, বিশেষ করে প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং টোল আদায়ের অধিকারের বিষয়ে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘোষিত পাঁচ দফা পরিকল্পনা পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে এবং ইরানের ওপর হরমুজ খোলার চাপ তৈরি করেছে।
তবে মঙ্গলবার শেষ মুহূর্তে হওয়া এই চুক্তি গ্রহণে বেইজিং তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে—এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
মঙ্গলবার এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হলে, চীন কি তেহরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে চাপ দিয়েছে? জবাবে তিনি বলেন, 'আমি শুনেছি, হ্যাঁ।'
তবে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে চীনের সরাসরি চাপের কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
ওই সূত্র আরও জানায়, ইরান চীনের কাছ থেকে আরও বেশি সমর্থন আশা করেছিল। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বেইজিংও যুদ্ধবিরতি চেয়েছিল।
