ফলের রসের রহিম বিরিয়ানি: আট দশকেও সমান জনপ্রিয়
১৪/১ ওয়াল্টার রোড, সূত্রাপুর থানা। আর ঠিক এর পেছনেই রহিম বিরিয়ানি হাউস। প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান ছোট্ট এই খাবারের দোকানটির খ্যাতি শুধু বয়সের জন্য নয়, বরং খাবারের বৈচিত্র্যময় স্বাদের কারণেও।
অথচ বাইরে থেকে দেখলে খুব সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে দোকানটি। বড় কোনো সাইনবোর্ড বা আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা নেই এখানে। তবুও ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রহিম বিরিয়ানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ও অভ্যাসের গল্প।
সাধারণত বিরিয়ানির কথা উঠলে আমাদের চোখে একটি খুব পরিচিত দৃশ্যই ভেসে ওঠে—ঘন মসলা, কেওড়া জল, আলু, মাংস আর বাসমতী চালের সংমিশ্রণ। কিন্তু রহিম বিরিয়ানির ক্ষেত্রে সেই চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন।
এতে মসলার কোনো অতিরঞ্জন নেই। ঝলমলে রঙ বা তীব্র সুগন্ধিও নেই। কেওড়া বা গোলাপ জলের ব্যবহারও করা হয় না। বরং এটি বেশ সাদামাটা, শ্বেতশুভ্র বিরিয়ানি। ঝরঝরে ভাত, অনেকটা পোলাওয়ের মতো সাদা। খাওয়ার সময় নাকে আসে মৃদু মিষ্টি একটি সুঘ্রাণ।
তবে অন্যান্য বিরিয়ানির তুলনায় এর রান্নার ধরন খুব আলাদা—এমনও নয়। পরিমাণমতো চাল, খাসির মাংস এবং প্রচলিত মসলাই ব্যবহার করা হয়। পার্থক্যটা মূলত অনুপাতে। মসলার ব্যবহারে সামান্য তারতম্য রাখা হয়, যাতে কোনো উপাদানই অন্যটির ওপর বেশি প্রাধান্য না পায়। ফলে মসলার বাড়াবাড়ি থাকে না, আবার খুব অল্প উপকরণেই সম্পন্ন হয়ে যায় পুরো রান্নার প্রক্রিয়া।
খাসির মাংসটি অবশ্য রান্না করে রাখা হয় আগের রাতে। সকালে সেটিকে আবার দমে দেওয়া হয়।
বিষয়টি পরিষ্কার করলেন রহিম বিরিয়ানির বর্তমান কর্ণধার মো. আবদুল কাদের সুজন। পঞ্চাশোর্ধ সুজন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই রান্নার কাজে অভিজ্ঞ। তিনি কাজটি শিখেছেন তার বাবা মো. আব্দুর রহিমের কাছ থেকে। আর তার বাবার হাতেখড়ি হয়েছিল দাদার কাছে। অর্থাৎ প্রজন্ম ধরে চলছে এই বিরিয়ানি রান্নার ধারা।
তিন প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা এই দোকানের মালিকানা সুজনের হাতে এলেও দোকানের নামকরণ হয়েছে তার বাবা রহিমের নামেই।
খাবারের আলাদা স্বাদ ও মিষ্টি ঘ্রাণের রহস্য জানতে চাইলে সুজন বলেন, "এইডা রান্না করার সময় আমি ফলের রস মিশাইয়া দিই। আঙুর আর বেদানার রস কইরা রাখি, ওইটা দিয়া দিই। রস মিশাইয়া দিলে বিরিয়ানির থেইকা একটা সুন্দর বাসনা আসে। আবার খাইতেও হালকা মিষ্টি মিষ্টি লাগে। অত বোঝা যায় না, কিন্তু অন্য কোনো বিরিয়ানির সাথে মিলাইলে বুঝতে পারবেন। এইডা আমার দাদাই করসিলো প্রথম। তার থেইকা আব্বা শিখসে। মনে করেন এইডা আমাদের নিজস্ব রান্না—একেবারে আলাদা।"
ফলের রসে বিরিয়ানি রান্নার কথা কিছুটা অবাক করার মতো শোনালেও সত্য হলো, এই রেসিপিই যুগের পর যুগ ধরে মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। তার প্রমাণ মেলে ভোরবেলা দোকানের সামনে ভিড় জমানো ক্রেতাদের দেখলেই।
ভোর হতেই ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন এখানে। যদিও দোকানটি আকারে ছোট। দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটুকুও ঠিকঠাক নেই। বসে খাওয়ার মতো ব্যবস্থাও আছে হাতে গোনা কয়েকজনের জন্য। তবু ভিড় কমে না। কেউ অপেক্ষা করেন, কেউ পার্সেল নিয়ে চলে যান, আবার কেউ ঠাসাঠাসি করেই বসে পড়েন। যেন দিনের শুরুটা এই বিরিয়ানি দিয়ে না করলে চলে না।
এমন এক ক্রেতা নুরুল আজিম। এসেছেন মিরপুর থেকে। তিনি বলেন, "এইটা নিয়া অনেক জানার পরে বন্ধুদের সাথে খাইতে আসলাম। এত ভোরে আসাটা কষ্টকর হলেও খাওয়ার পরে সেই কষ্ট দূর হয়ে গেসে। স্বাদের কথা বলতে গেলে আমি এই বিরিয়ানিকে ১০০/১০০ দেব।"
আরেক ক্রেতা আজিজুল বলেন, "আমি এই পর্যন্ত যত বিরিয়ানি খেয়েছি, এটি বেস্ট।"
নিয়মিত যারা আসেন, তারা জানেন—সকাল ৯টা বা ১০টার মধ্যে না এলে বিরিয়ানি মিস করা প্রায় নিশ্চিত। কারণ সারাদিনে কেবল একবারই রান্না হয়। ফলে শেষ হয়ে গেলে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।
রমজান এলে এই বিরিয়ানির চাহিদা যেন নতুন করে বাড়ে। মসলার বাড়াবাড়ি বা অতিরিক্ত তেলের ব্যবহার না থাকায় সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে এটি অনেকের কাছেই স্বস্তিদায়ক ও রিফ্রেশিং একটি খাবার হয়ে ওঠে।
এই সময় দুপুর গড়ালেই শুরু হয় হাঁড়ি থেকে বিরিয়ানি তুলে প্যাকেট করে সাজিয়ে রাখার কাজ। এরপর একে একে ক্রেতারা এসে নিজেদের প্রয়োজনমতো কিনে নেন। কেউ পরিবারের জন্য, কেউ অতিথি আপ্যায়নে, কেউ আবার দীর্ঘদিনের অভ্যাসের অংশ হিসেবেই ইফতারে যুক্ত করেন এটি।
রোজায় বিক্রির সময়সূচিও বদলে যায়। দুপুর ২টার দিকে রান্নার প্রক্রিয়া শেষ হয়। এরপর আড়াইটার দিকে শুরু হয় বিক্রি, যা চলে বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। দামও থাকে আগের মতোই—হাফ প্লেট ১৬০ টাকা, আর ফুল প্লেট বিরিয়ানির দাম ৩২০ টাকা।
মজার বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস থাকলেও তাদের কখনও নিজস্ব স্থায়ী দোকান হয়নি। ভাড়া জায়গাতেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোকানের অবস্থান বদলেছে, কিন্তু এলাকা বদলায়নি। সবকিছুই থেকেছে সূত্রাপুর ঘিরে—কখনও এক গলিতে, কখনও আরেক মোড়ে।
তবু পুরোনো ক্রেতাদের এই বিরিয়ানির প্রতি টান কমেনি। বরং যারা একবার এখানে খেয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার ফিরে আসেন। সুজনের ভাষায়, "আমাদের পুরোনো কাস্টমারই বেশি। না হলে এত বছর ব্যবসা চলতো না।"
ছবি: আসমা সুলতানা প্রভা/টিবিএস
