যে দেশে মানুষ ‘রোলেক্স’ হাতে পরে না, তৃপ্তি করে খায়!
ইমানুয়েল জনাথন ওকেল্লো যখন নিজের রেস্তোরাঁ চালুর কথা ভাবছিলেন, তখন তার মেনুতে কী কী থাকবে, তা নিয়ে মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। তার তালিকার সবার ওপরেই ছিল 'রোলেক্স'।
তিনি বলেন, 'উগান্ডায় একটা কথা খুব প্রচলিত আছে—'আমরা রোলেক্স হাতে পরি না, আমরা রোলেক্স তৃপ্তি করে খাই'।'
পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় এখন জাতীয় খাবারের মর্যাদা পেয়েছে এই মুখরোচক খাবার। তবে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন অন্যান্য জায়গাতেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ডিম আর ভারতীয় রুটি বা চাপাতির এই জাদুকরী মিশেলের নাম রোলেক্স হওয়ার পেছনের মজাদার গল্প শোনালেন ওকেল্লো।
তিনি জানান, 'রোলেক্স মূলত 'রোল্ড এগ' শব্দ থেকে এসেছে। এর প্রথম রূপকাররা ভারতীয় চাপাতি রুটির ওপর ডিমের অমলেট রাখতেন এবং পরিবেশনের সময় তা রোল করে বা মুড়িয়ে দিতেন। এরপর মজার ছলেই মানুষ এটাকে 'রোলেক্স' ডাকতে শুরু করে, যা পরে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।'
'আমরা সবকিছু দিয়েই রোলেক্স বানাতে পারতাম'
এর সবচেয়ে সাধারণ বা আদি রূপে, ডিম ফেটিয়ে হালকা ও পাতলা একটি অমলেট বানানো হয়, অনেকটা ক্রেপের মতো। তারপর সেই গরম অমলেট একটি চাপাতির ওপর উল্টে দিয়ে তাতে বাঁধাকপি এবং টমেটো ছিটিয়ে রুটি ও অমলেটটি একসাথেই মুড়িয়ে নেওয়া হয়।
নীল নদের উৎসের কাছাকাছি অবস্থিত একটি পর্যটন শহর জিনজায় গিয়ে হঠাৎ করেই ওকেল্লো রোলেক্সের ভিন্ন এক রূপ আবিষ্কার করেছিলেন। সেখানকার একজন রাস্তার বিক্রেতা বা স্ট্রিট ভেন্ডর রোলেক্সে সাধারণ সবজির পাশাপাশি কিছু ভাজা মাংসও ব্যবহার করতেন।
সেই মজার স্বাদ মনে করে তিনি বলেন, 'সেটা আমার কাছে খুবই সুস্বাদু লেগেছিল। তখনই আমার মনে হলো—চাইলে আমরা সব ধরনের জিনিস দিয়েই তো রোলেক্স বানাতে পারি! তারপর বসে বসে ভাবতে লাগলাম রোলেক্সে কী কী দেওয়া যায় আর তা লিখে ফেলতে লাগলাম।'
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, তিনি বেশ ডজনখানেক রোলেক্সের রেসিপি লিখে ফেলেন—গরুর মাংসের সসেজ দিয়ে রোলেক্স, চিকেন গ্রেভি, বেকন, অ্যাভোকাডো, মাংসের কিমা—কী ছিল না সেই তালিকায়!
যদি কারও কোন স্বাদটি বাছবেন, তা নিয়ে দোটানা তৈরি হয়, তাহলে তার রেস্তোরাঁতে 'শেফস স্পেশাল' নামে একটি রোলেক্স পাওয়া যায়। এটি মূলত 'এভরিথিং-রোলেক্স'—অর্থাৎ এতে সবকিছুই অল্প করে দেওয়া থাকে।
মজা করে তিনি বলেন, 'একটা সময় এমন ছিল যখন আমরা রোলেক্সের ভেতরে নানা রকম ফলও ব্যবহার করতাম। কিন্তু উগান্ডার মানুষ খাবারে এই ধরনের অভিনব পরীক্ষা খুব একটা পছন্দ করে না, তাই মেনু থেকে সেটা সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে অনেকেই আবার এই ভিন্ন স্বাদটি পছন্দ করতেন।'
ওকেল্লোর এই অভিনব রেস্তোরাঁর নামটাও বেশ জুতসই, 'দ্য রোলেক্স গাই'। মূলত রাস্তার ধারের সাধারণ খাবার আর হোয়াইট-টেবিলের বা নামীদামী রেস্তোরাঁর আকাশছোঁয়া দাম—এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয় এই রেস্তোরাঁ। তার মেনুর সেরা রোলেক্সটির দাম প্রায় সাড়ে পাঁচ ডলার। বর্তমানে তার দুটি শাখা রয়েছে—একটি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় এবং অপরটি দক্ষিণের শহর এন্টেবেতে। এছাড়া ডেলিভারির জন্য শহরের সব জায়গাতেই তার রেস্তোরাঁ সেবা দিয়ে থাকে।
একটি জাতীয় আবেগ
লেখক জোনাথন কাবুগো 'কীভাবে রোলেক্স বানাতে হয়' শিরোনামে পুরো একটি বই-ই লিখে ফেলেছেন। বইটিতে তিনি নিজের তৈরি নানা উদ্ভাবনী রেসিপির কথা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, রোলেক্স উগান্ডার খাদ্যাভ্যাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছিল। আগেকার দিনে উগান্ডার মানুষের সাধারণ খাবার ছিল সসের সঙ্গে রান্না করা মাংস বা সবজির পদ, যা পরিবেশন করা হতো শিকড়জাতীয় বা কন্দ জাতীয় খাবার কিংবা এক ধরনের কলা বা প্লান্টেইনের বিশাল স্তূপের সাথে। এসবের জন্য প্রচুর সময় লাগত। দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলেও দারুণ স্বাদের এবং বৈচিত্র্যের নানা খাবার পাওয়া যেত।
রোলেক্স এসব আয়োজনকে এক ধাক্কায় সহজ করে দিয়েছে। এটা যেন পুরো খাবারটিকে হাতের মুঠোয় আনার এক জাদুকরী উপায়! এ কারণেই নব্বইয়ের দশকে কাম্পালার মাকেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রোলেক্স এতটা জনপ্রিয়তা পায়। ওই সময় রোলেক্সের অনুরাগী হয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাই মূলত এটিকে দেশের একটি জাতীয় আবেগ বা জাতীয় খাদ্যের সম্মান এনে দেয়।
লেখক কাবুগো বলেন, 'এটি বানানো সহজ, সময় বাঁচে, আর বেশ সুবিধাজনক। এর জন্য রন্ধনশিল্পের বিশাল কোনো ডিগ্রিরও প্রয়োজন হয় না। এই খাবার তৈরি করে বিক্রি করেই অনেক তরুণ তাদের ব্যবসার শুরু করতে পারছে, নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে আর জীবনের একটা লক্ষ্য তৈরি করতে পারছে।'
উগান্ডার সংস্কৃতির বদলের সাথে সাথে রোলেক্সের রূপেও আসছে পরিবর্তন। রাজধানী কাম্পালায় বসবাসকারী বড় একটি অংশ হলো ইথিওপিয়ান এবং এরিত্রিয়ান। তারা এই খাবারের সাথে তাদের ঐতিহ্যবাহী সিরো বা 'শিরো' মেশানো শুরু করেছে—যা ছোলা বা মটরশুঁটি থেকে তৈরি এক ধরনের ক্রিমি এবং মসলাদার স্ট্যু। এই দুটি দেশে এই খাবার রান্নার এক অপরিহার্য অংশ।
উপাদানে অভিনব সব পরিবর্তন
এন্ডিও কফি নামের এক পরিচিত ক্যাফেতে গ্রিক স্যালাডের মতোই একটি বিশেষ রোলেক্স পাওয়া যায়। এতে দেওয়া হয় রোদে শুকানো টমেটো, জলপাই, পালংশাক আর ফেটা চিজ।
ওদিকে, জনাথন ওকেল্লো তো আরেক ধাপ এগিয়ে এক ধরনের রোলেক্স পিৎজা বানানোর পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন! এখানে রুটিকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে একটা চমৎকার বেস বা শক্ত নিচের দিক তৈরি করা হয়, যার ওপর থাকে পিৎজার দারুণ স্বাদ।
উগান্ডার সীমানা পেরিয়ে এই জনপ্রিয় খাবার এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পূর্ব আফ্রিকাতেও। কেনিয়া, রুয়ান্ডা বা বুরুন্ডির রাস্তার পাশের অনেক খাবারের দোকানেও এখন এই সুস্বাদু খাবার সহজেই চোখে পড়ে। তবে উগান্ডাতেই রোলেক্স প্রকৃত অর্থে দেশের একটি জাতীয় বা 'ডি ফ্যাক্টো ন্যাশনাল ডিশ'-এর স্বীকৃতি পেয়েছে।
আফ্রিকান কুইজিনের এক শেফ, ফাতি রেহনার্জ বা 'শেফ কোকো', তার ছাদখোলা রেস্তোরাঁ 'এপিকিউরে' পুরো আফ্রিকার বিখ্যাত সব খাবার নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, 'উগান্ডার নিজস্ব খাবার বোঝাতে 'রোলেক্স'-এর চেয়ে সেরা আর কোনো উদাহরণ হতে পারে না।'
তার বানানো বিশেষ রোলেক্সে প্রথমে ডিম সিদ্ধ করে তারপর ছোট করে কুচিয়ে নিয়ে মশলাদার মাংসের কিমার সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। পরে এটিকে রুটির ভেতর মুড়ে একদম আসল রোলেক্সের মতো একটা রূপ দেওয়া হয়।
শেফ কোকো আরও বলেন, 'যদি পূর্ব আফ্রিকার ওই অঞ্চলের খাবার পরিবেশন করতে হয়, তাহলে আপনার মেনুতে রোলেক্স থাকতেই হবে! রোলেক্স ছাড়া সেই অঞ্চলের খাবার থাকা আর পিৎজা ছাড়া কোনো ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ চালানোর মতো—দুটিই একই রকম অসম্পূর্ণ মনে হয়।'
রোলেক্স নাম নিয়ে অনেকে মনে করেন যে এটা নামীদামী ঘড়ির বিখ্যাত 'রোলেক্স' ব্র্যান্ডের সাথে তাল গোল পাকিয়ে ফেলবে কি না। কিন্তু কাবুগোর মতে, এই নামটির যে কদর তৈরি হয়ে গেছে, সেখান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো কারণই দেখেন না তিনি।
'আমাদের দেশে তো প্রায় ৬ কোটি মানুষের বাস! তারা তো সবাই রোলেক্স ঘড়ি কেনে না। আমার বরং মনে হয়, রোলেক্স কোম্পানির উচিত খুশি হওয়া যে তাদের ওই একই নামে এমন সুন্দর একটা জিনিসের নামকরণ করা হয়েছে, যা এত মানুষ প্রতিদিন ভালোবাসা নিয়ে উপভোগ করছে।'
