ঐতিহ্যবাহী বনাম ট্রেন্ডি খাবার, কোনটি বেশি জনপ্রিয়?
'খাইখাই কর কেন, এস বস আহারে-
খাওয়াব আজব খাওয়া, ভোজ কয় যাহারে।
যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে
জড় করে আনি সব, - থাক সেই আশাতে।'
খাবারের কথা শুনলেই ভোজনরসিক বাঙালির জিভে জল আসে, মুখে ফুটে ওঠে হাসি। চুলোয় তখনও ফুটছে হাঁড়ি, রান্নাঘরে গিন্নি ব্যস্ত খাওয়ার আয়োজন নিয়ে। অচেখা খাবারের সুঘ্রাণে পেটুক বাঙালি হারিয়ে যায় অতীত ভোজনের সুখস্মৃতিতে। জ্যামে বসে থেকে ঢাকাবাসীর জীবনীশক্তি যতই কমুক না কেন, ভোজনপ্রীতি তেমন কমেনি।
একসময় ঢাকা শহরের জনপ্রিয় খাবার বলতে বোঝাত পুরান ঢাকার অলিগলিতে কড়াইয়ে ফুটতে থাকা নেহারি, পুরি, সিঙাড়া, সমুচা কিংবা জিলাপি, ছানা আর মাঠা। কালের বিবর্তনে সেই ঢাকা এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
ইন্টারনেটের বদৌলতে খাদ্যপ্রেমী ঢাকাবাসীর খাদ্যতালিকায় এসেছে নানা বৈচিত্র্য। ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে চিজে ভরা বার্গার, রামেন, সুশি, নানা ধরনের ডেজার্ট, রঙিন বাবল টিসহ ট্রেন্ডি সব খাবার। এখন আর খাবারদাবারের রেসিপিসহ বিশেষ পাতার অপেক্ষায় থাকে না জেন জি। ফেসবুক আর ইউটিউবজুড়ে ফুড ব্লগারদের রিভিউই তাদের জন্য যথেষ্ট।
তবে ক্যাফের চাকচিক্য রাস্তার ধারের জরাজীর্ণ দোকানের অপূর্ব স্বাদের খাবারের আবেদন কমাতে পারেনি।
হানিফ বিরিয়ানি
এ যেন এক অন্য ঢাকা। রাত তখন ১২টা। হালকা শীতের আমেজে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ রাস্তাঘাটে সুনসান নীরবতা। কিন্তু নাজিরাবাজার এলাকায় গমগম করছে মানুষ। যানবাহনের ভিড় আর কোলাহলমুখর পরিবেশই জানান দিচ্ছে খাদ্যপ্রেমীদের উপস্থিতি। হানিফ বিরিয়ানির দোকানের সামনে পা ফেলার জায়গা নেই বললেই চলে। স্বাদে সেরা তো বটেই, সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তাই খাদ্যপ্রেমীদের কাছে ভরসার জায়গাটাও বেশ শক্ত। ভিড় ঠেলে খানিকটা ইতস্ততভাবেই ঢুকতে হলো ভেতরে। উদ্দেশ্য সবার মতোই—বিরিয়ানি আস্বাদন।
আলাউদ্দিন রোডে হাজী বিরিয়ানির ঠিক বিপরীতেই পুরান ঢাকার এই প্রসিদ্ধ বিরিয়ানির দোকান হানিফ বিরিয়ানি। ১৯৭৫ সালে পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ হানিফের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে দোকানটি।
হানিফ বিরিয়ানির প্রধান আকর্ষণ কাচ্চি। প্রতি প্লেট বিরিয়ানির দাম ২০০ টাকা। মধ্যবিত্ত, স্বল্পাহারী ও ছাত্রদের কথা বিবেচনায় রয়েছে হাফ প্লেট নেওয়ার সুযোগ। পুরান ঢাকার এ ধরনের বিরিয়ানির দোকানে বোরহানি থাকবেই। কারণ বিরিয়ানি-বোরহানির জুটি খাদ্যপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন দাগ কেটে রাখে। সঙ্গে গুরুপাক খাবার হজমেও বেশ সহায়ক।
হাজি বিরিয়ানি
নাকে ভেসে আসে সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ। সরিষার তেল মানেই ভর্তা, মুড়িমাখা কিংবা সরিষা ইলিশ—এমন ভাবনাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরিষার তেলের বিরিয়ানির কথা শুনলে খাদ্যপ্রেমীদেরও খানিকটা হোঁচট খেতে হয়। তবে পাতে নিলে সেই হোঁচট একেবারেই থাকে না, বরং বিমোহিত হতে হয়।
এ দোকানের খাসির মাংসের বিরিয়ানিতে ঘি কিংবা বাটার অয়েলের বদলে ব্যবহার করা হয় সরিষার তেল। পুরোপুরি দেশীয় মসলা ব্যবহারের কারণে স্বাদে ও গন্ধে এটি অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা অবস্থান ধরে রেখেছে।
১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দোকানে আজও কাঠালপাতায় বানানো প্লেটে পরিবেশন করা হয় হাজী বিরিয়ানি। নাজিরাবাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোডের এ দোকানটিতেও খাবারের দাম প্রায় হানিফ বিরিয়ানির কাছাকাছি।
বিসমিল্লাহ কাবাব ঘর
ভিড়ের চাপে কাবাব ঘরের প্রথম শাখায় বসা গেল না। পেটের মধ্যে ছুঁচোর দৌড়ানি পা দুটোকে সচল করে তুলল। শেষমেশ পৌঁছাতে হলো দ্বিতীয় শাখায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাবাসীর কাবাবের আকাঙ্ক্ষাও যেন বাড়তে থাকে।
নাজিরাবাজারেই পাশাপাশি রয়েছে বিসমিল্লাহ কাবাব ঘরের দুটি দোকান। প্রথমটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে মো. খোরশেদের হাত ধরে। পরবর্তীতে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় খোলা হয় দ্বিতীয় শাখা।
বিসমিল্লাহ কাবাব ঘরের সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম চিকেন চাপ। হোম ডেলিভারিতেও এই আইটেমের চাহিদা চোখে পড়ার মতো। এছাড়া বটি কাবাব ও বিফ চাপও বেশ জনপ্রিয়।
এখানে গরুর বটি কাবাব পাওয়া যায় ১০০ টাকায়, গরুর চাপ ৯০ টাকা, খাসির গুদ্দা কাবাব হাফ ১৪০ টাকা, খাসির খিরি কাবাব হাফ ১৩০ টাকা, গরুর মগজ ভুনা ১২০ টাকা, খাসি মগজ ভুনা ১২০ টাকা, মুরগির ব্রেস্ট চাপ ১১০ টাকা, টিকিয়া ৫ টাকা, পরাটা ৮ টাকা। সালাদ দেওয়া হয় ফ্রি।
অনেক সময় অফিসফেরত মধ্যবয়সীদের আড্ডা, কখনো পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আয়োজনে বিসমিল্লাহ কাবাব হয়ে ওঠে ভোজনবিলাসীদের প্রথম পছন্দ। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা—মানুষ আসছেই।
"ঢাকা শহরে মরা মুরগি, মরা গরু বা খাসির মাংস চালিয়ে দেয় অনেকেই। আমাদের কাস্টমাররা এসব ব্যাপারে আমাদের ওপর ভরসা করে। হোটেলের পরিবেশও বেশ পরিচ্ছন্ন," জানালেন বিসমিল্লাহ কাবাব ঘরের কর্মচারী শামীম হোসেন।
আনন্দ কনফেকশনারি
বঙ্গভঙ্গ রদেরও কিছু আগের কথা। সালটা ১৯০৮–১৯০৯। ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে ঢাকায় আসেন চান মিয়া। জীবিকার সন্ধানে নর্থব্রুক হলের পাশে একটি বেকারিতে কাজ নেন তিনি। বয়স তখন কম, কিন্তু বেকারির কাজের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল।
এই আগ্রহের জোরেই অল্প সময়ের মধ্যে দক্ষ কর্মী হয়ে ওঠেন চান মিয়া। একসময় সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই বিস্কুট ও রুটি তৈরি করে ফেরি করে বিক্রি করবেন। যেমন সিদ্ধান্ত, তেমন কাজ। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ঢাকার বিভিন্ন হাটে ঘুরে ঘুরে নিজের পণ্য বিক্রি করেছেন তিনি।
পঞ্চাশের দশকে সেসময়ের খ্যাতনামা গায়িকা লায়লা আর্জুমান্দ বানুর বাবার কাছ থেকে তাদের বাগানবাড়ি কিনে বেকারির জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন চান মিয়া।
ঢাকা শহরে বর্তমানে আনন্দ কনফেকশনারির চারটি শাখা রয়েছে। চান মিয়ার নাতি সিদ্দিকুর রহমান এখন পুরান ঢাকার আব্দুল হাসনাত রোডে অবস্থিত মূল শাখায় বসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেকারিগুলোতে মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে, হাতের মমতা মাখানো খাবারের ছোঁয়া কমেছে কিছুটা। আনন্দ কনফেকশনারিও মেশিনকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে হাতের কাজের ঐতিহ্যকে বিশেষত্ব হিসেবেই ধরে রেখেছে।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, "আমাদের জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে সুতি কাবাব, হালিম, ইলিশ কাবাব, চমচম, চানাচুর, হালুয়া ও লাচ্ছা সেমাই। ইলিশ কাবাব আগে থেকে অর্ডার দিতে হয়। রমজান মাসে সুতি কাবাব ও হালিমের চাহিদা বাড়ে, আর ঈদের দিন লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।"
"আমরা খাবারের স্বাদ ও মান ধরে রাখাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। তাই শাখা বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান দোকানগুলো ভালোভাবে পরিচালনা করতে চাই," যোগ করেন সিদ্দিকুর।
জলিলের আগুন পান
পানে দাউদাউ জ্বলছে আগুন। কিন্তু ভেতরে রঙিন পানমশলা। আপনি তখনই হানিফ বিরিয়ানি কিংবা বিসমিল্লাহ কাবাব ঘর থেকে পেটপুরে খেয়ে বেরিয়েছেন। মনটা পানের জন্য আনচান করছে। না ভেবেই আগুন পানটি মুখে পুরে দিলেন। ভয়ের কিছু নেই, আছে বরং রোমাঞ্চ।
আব্দুল জলিলের আগুন পানের দোকানে সারাক্ষণই ভিড় লেগে থাকে। কেউ আসেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ প্রিয় মানুষের সঙ্গে। কেউ আবার টিকটক ভিডিও বানানোর উদ্দেশ্যেও আসছেন।
দোকানে পান খেতে আসা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি সেলিম বলেন, "জীবনটাই তো দাউদাউ করে জ্বলছে। এই পান আমার আর কীই বা করবে? সবাই দেখি ফেসবুকে আগুন পানের ভিডিও দেয়। সেই দেখে আমিও মুখ পোড়াতে আসছি।"
আব্দুল জলিল জানান, তিনি বেনারসী পান, শাহী পান, মশলা পান ও বউ-জামাই পান বিক্রি করেন। তবে ফায়ার পান চালু হওয়ার পর থেকেই বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মশলার ভেদে প্রতিটি ফায়ার পান তিনি ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করেন। উৎসবের দিনে ক্রেতার সংখ্যা আরও বাড়ে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে মানুষকে আনন্দ দিতে পারাটাকেই নিজের সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।
আলম খান টি
বিরিয়ানির পর কোমল পানীয় খাওয়ার প্রচলিত ধারা ভেঙে নাজিরাবাজারের আলম খান টি স্টলে ঢুকেছেন এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাব্য। তিনি জানান, আলম খান টির নাম এত শুনেছেন যে, একদিন না একদিন আসতেই হতো।
চা-প্রেমীদের জন্য এই স্টলের মেনু দেখেই তিনি অবাক। ১০ টাকার জিরা চা থেকে শুরু করে ১২০ টাকার কাজুবাদাম মালাই চা—বৈচিত্র্যের অভাব নেই। সামনে নির্বাচন থাকায় রাজনৈতিক আলোচনা জমাতেও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় বাড়ছে এই চা-স্টলে। চায়ের প্রতি চুমুকে ক্লান্তি মুছে জমে উঠছে আলাপ।
নাজিরাবাজারের আলম খান টি স্টলের স্বত্বাধিকারী আলম বলেন, "পুরান ঢাকা কখনো ট্রেন্ডে চলে না। পুরান ঢাকা চলে কোয়ালিটিতে। আমাদের চা খেয়েই বুঝবেন।"
প্রতিদিন এই দোকানে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার কাপ চা বিক্রি হয়। সন্ধ্যার পর থেকে ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্মচারীদের।
বিউটি লাচ্চি অ্যান্ড ফালুদা
সময়টা ১৯২২ সাল। পুরান ঢাকার জনসন রোডে লেবুর শরবতের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় বিউটি লাচ্চির। পরে যুক্ত হয় লাচ্চি ও ফালুদা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আবদুল আজিজকে। দোকানের নাম রাখা হয় 'বিউটি লাচ্চি অ্যান্ড ফালুদা'।
একশ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই দোকানের জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে দোকানটি। বর্তমানে নাজিরাবাজারে বিউটি লাচ্চির একাধিক শাখা রয়েছে।
দোকানের অভিজ্ঞ কারিগর জাকির হোসেন প্রায় ৩৪ বছর ধরে এখানে লাচ্চি ও ফালুদা তৈরি করে আসছেন।
তিনি জানান, ফালুদার প্রধান উপাদান খাঁটি দুধের মালাই। লাচ্চি কিংবা ফালুদায় কোনো কৃত্রিম উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। এ কারণেই বিউটি লাচ্চি ও ফালুদার সুনাম এতদিন ধরে অটুট। এখানে ফালুদা পাওয়া যায় দুই ধরনের—নরমাল ও স্পেশাল। নরমালের দাম ৬০ টাকা, স্পেশালের ৮০ টাকা। লাচ্চির ক্ষেত্রেও নরমাল ৩০ টাকা এবং স্পেশাল ৪০ টাকা।
মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার
পুরান ঢাকার লালবাগ শুধু শায়েস্তা খানের বিষাদের স্মৃতি বহন করে না, বহন করে নানা খাবারের ঐতিহ্যও। লালবাগ কেল্লার সামনে মাঝারি আকারের, সাধারণ চেহারার একটি দোকান মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার। মিষ্টির পাশাপাশি সকাল ও বিকেলের নাস্তা হিসেবে এখানে লুচি-সবজিও পাওয়া যায়। রয়েছে কাশ্মীরি হালুয়া, মালাই চপ, সর মালাই ও জাফরান ভোগ। দোকানটিতে সারাক্ষণই ভিড় লেগে থাকে। বসার জায়গা পাওয়াই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দোকান থেকে বের হওয়া ক্রেতাদের মুখে যে তৃপ্তির ছাপ দেখা যায়, সেটিই খাবারের স্বাদের বড় প্রমাণ। মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডারের নিয়মিত ক্রেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মুবিন জানান, একবার খেলে স্বাদের টানে বারবার এখানে আসতে হয়। দামও সাধ্যের মধ্যে থাকায় যে কেউ খেতে পারেন।
বেইলি রোডের স্ট্রিটফুড
কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে অনলাইন সংযোগ ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লকডাউনের সময়ে অনেকেই ভ্লগিং শুরু করেন। খাদ্যপ্রেমীদের জন্য ফুড ভ্লগিং হয়ে ওঠে এক ধরনের গাইড। তবে অতিরঞ্জিত প্রশংসার কারণে অনেক ক্ষেত্রে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। তবুও জেন-জি প্রজন্মের স্ট্রিট ফুডে ঝোঁক বাড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড বড় ভূমিকা রেখেছে।
বেইলি রোডে সন্ধ্যা নামলেই স্ট্রিট ফুডপ্রেমীদের ভিড় বাড়তে থাকে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই নম্বর গেটের পাশে বেশিরভাগ ফুডকার্ট বসে। শীতের নরম আবহে চারপাশ ভরে ওঠে নানা খাবারের গন্ধে। এখানে স্ন্যাকস ও ডিনার—দুই ধরনের খাবারই পাওয়া যায়।
জনপ্রিয় স্ন্যাকসের মধ্যে রয়েছে শাহী মামার পেঁয়াজু, ফুচকা, পানিপুরি ও নানা ধরনের তেলেভাজা। পরিবার নিয়ে ডিনারের পরিকল্পনা করলেও হতাশ হতে হয় না। দ্য গ্রিন লাউঞ্জে রয়েছে বুফে খাবারের ব্যবস্থা।
তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ম্যাডশেফ রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় অ্যাকারি রাইস, থাই ব্যাসিল চিকেন ও কোরিয়ান চার্জড গ্রিল্ড চিকেনের মতো খাবার, যেগুলোর দাম ২০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে। পাশাপাশি নবাবী ভোজে রয়েছে রাজকীয় খাবারের আয়োজন।
মোহাম্মদপুরের স্ট্রিটফুড
বছর ত্রিশেক আগের কথা। তখন মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের সেলিমের কাবাবের খ্যাতি ছিল ঢাকাজুড়ে। সে সময় ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকলেও মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়েছিল এই কাবাবের সুনাম।
আজকের চিত্রটা ভিন্ন। মোহাম্মদপুরের নাম শুনলেই অধিকাংশ জেনজির স্ট্রিট ফুডের ক্ষুধা জেগে ওঠে। মোহাম্মদপুর টাউন হল থেকে নূরজাহান রোড, তাজমহল রোড ও সলিমুল্লাহ রোডজুড়ে সন্ধ্যার পর বসে নানা ধরনের খাবারের দোকান। মোমো, স্যুপ, বার্গার, পিজ্জা, চাপ, কাবাব, চা, লুচি-ডাল, ধোসা, ছোলা-বাটার—সবই মেলে এখানে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা বলেন, "সন্ধ্যার পর এই রাস্তায় বের হলে টাকা বাঁচিয়ে বাসায় ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার অনেক বান্ধবীই প্রায়ই উইকেন্ডে এখানে খেতে আসে। ট্রেন্ডি খাবার নিয়ে ভিডিও বানালে ইনস্টাগ্রামেও ভালো রিচ পাওয়া যায়, এ কারণেও অনেকে এসব খাবারের প্রতি আগ্রহী।"
পরীবাগের বার্গার
রাজধানীর পরীবাগের পুরোনো এলিফ্যান্ট রোডে বিটিসিএল ভবনের নিচে গড়ে উঠেছে ছোটখাটো একটি স্ট্রিট ফুড জোন। ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁর বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য এটি হয়ে উঠেছে নির্ভরযোগ্য আড্ডাস্থল। বার্গার, পিজ্জা, জুস, কাবাব ও চিপসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ফাস্টফুড জোনে খাবারের দাম ৬০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে।
এই খাবারের দোকানগুলোতে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই শিক্ষার্থী। পার্টটাইম কর্মী রফিকুল হক বলেন, "এই কাজ করে যেমন কিছু আয় হচ্ছে, তেমনি খাদ্যপ্রেমীরাও সন্তুষ্ট হচ্ছেন। সন্ধ্যার পর এখানে এসে কাজ করার ভাবনাতেই এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে।"
ইট লাইক এ কিং: হাকিম চত্বর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরের খাবার খাদ্যপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়। শুধু স্বাদেই নয়, দামের দিক থেকেও এসব খাবার ১০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। খিচুড়ি, ফ্রাইড রাইস, আলু-মাশরুম-চিকেন চপ, স্যান্ডউইচ, লাচ্চি, ফলের জুস—পছন্দের সবই মেলে এখানে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী অর্থী হক জানান, এসব দোকানে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকভাবে মানা হয় না। খাবারের মানও খুব ভালো—এ কথা বলা কঠিন। ট্রেন্ডের কারণেই মূলত এগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভাবনা চত্বরের ফুচকা
ফুচকাপ্রেমীদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের বিপরীতে ভাবনা চত্বরের ফুচকা একটি বিশেষ আকর্ষণ। দই ফুচকা, পানিপুরি ও স্পেশাল ফুচকাসহ নানা রকমের ফুচকা পাওয়া যায় এখানে। দামও তুলনামূলকভাবে সহনীয়—৫০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। ফুড ভ্লগারদের মাধ্যমে এই ফুচকার খ্যাতি ক্যাম্পাসের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
উত্তরা থেকে ফুচকা খেতে আসা এক তরুণী বলেন, "আমি মেট্রোরেলে ৯০ টাকার টিকিট কেটে এই ৫০ টাকার ফুচকা খেতে আসি। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও সত্যি।"
গণ চা তন্ত্র
কুষ্টিয়ার পোড়া রুটি আর মাটির ভাঁড়ে মালাই চা—সঙ্গে বন্ধু, প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা। মাত্র ৫০ টাকায় এর চেয়ে মজার খাবার খুব কমই আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএমএল গেট ও হলপাড়ায় দুটি 'গণ চা তন্ত্র' চা-প্রেমী শিক্ষার্থীদের আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, যেহেতু দোকানগুলো ক্যাম্পাসের ভেতরে, তাই দাম আরও কিছুটা কমানো গেলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হতো।
স্বপন মামার চা
টিএসসিতে এসে স্বপন মামার চা না খেয়ে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ৪২ বছরের পুরোনো এই ছোট দোকানটি আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে। ১৯৮৪ সাল থেকে স্বপন মামা শিক্ষার্থীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছেন।
এই দোকানের বিশেষত্ব হলো স্বপন মামার আন্তরিকতা ও সাশ্রয়ী দামে নানা ধরনের চা। টিএসসির ভিড়ের মধ্যে এক কাপ গরম চা আর তার হাসিমুখ শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর করে দেয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জায়গাটি থাকে প্রাণচঞ্চল।
বাঙাল-ঘটি কিংবা ইলিশ-চিংড়ির দ্বন্দ্বের মতোই এখন নতুন বিতর্ক—ট্রেন্ডি খাবার না ঐতিহ্যবাহী খাবার, কোনটি এগিয়ে? এই প্রশ্নে জেনজিরা ঝুঁকছেন ট্রেন্ডের দিকে, আর মধ্যবয়সীরা ভরসা রাখছেন ঐতিহ্যে। তবে অনেক খাদ্যরসিকই আছেন, যারা এসব বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে খাবারের স্বাদকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন—তা যে যুগেরই হোক না কেন।
ছবি: অনুস্কা ব্যানার্জী
