‘যত খুশি খাও’: ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ এখন এক ‘বুফে’!
ফ্রান্সের সবচেয়ে বেশি আয় করা রেস্তোরাঁটি কোনো মিশেলিন-স্টার পাওয়া বিস্ট্রো বা প্যারিসের কোনো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান নয়। বরং নারবোনের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক 'অল-ইউ-ক্যান-ইট বুফে'। মাত্র ৬৭.৫০ ইউরোতে (প্রায় ৭ হাজার টাকা) এখানে পাওয়া যায় 'প্রেসড ডাক' থেকে শুরু করে ট্রাফল পর্যন্ত রাজকীয় সব পদ। 'লে গ্রঁদ বুফে' এখন ফরাসি ভোজনরসিকদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ ফ্রান্সের নারবোনের উপকণ্ঠে একটি ম্যাকডোনাল্ডসের উল্টো দিকের সাদামাটা এক পার্কিং লটে গাড়ি থামাতেই মনে হলো—এটাই কি সেই জায়গা? কিন্তু আধঘণ্টা যেতে না যেতেই দ্বিধা ভাঙল। চোখের সামনে তখন চলছে ফরাসি রন্ধনশৈলীর এক ঐতিহাসিক নাট্য।
ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ওয়াগনারের 'রাইড অব দ্য ভ্যালকাইরিস'। ধবধবে সাদা শার্ট ও কালো এপ্রোন পরা এক পরিবেশক হাতে তুলে ধরেছেন আস্ত এক ঝলসানো হাঁস। যেন অলিম্পিকের মশাল! এরপর গুরুগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা এল:
'ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, এটি ১৯ শতকের ঐতিহ্যবাহী ক্যানার্ড অ সাং বা প্রেসড ডাক তৈরির রীতি। হাঁসটি প্রথমে শিকের ওপর ঝলসানো হয়েছে। এখন হাঁসের হাড় গুঁড়িয়ে এর রক্ত ও নির্যাস বের করা হবে, যা পরে সসে ব্যবহার করা হবে।'
আমি দেখলাম, মার্বেল পাথরের টেবিলে হাঁসটি কাটা হলো। হাড়গুলো একটি রুপার যন্ত্রে চেপে গুঁড়ো করা হলো। সেখান থেকে কালচে তরল—নিশ্চিতভাবেই রক্ত—বেরিয়ে এল। তাতে আগুন ধরিয়ে ফ্লেম করা হলো এবং মাংসের ওপর ঢেলে দেওয়া হলো।
দৃশ্যটা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এটি ফরাসিদের অন্যতম ধ্রুপদি পদ। আজকাল খুব কম রেস্তোরাঁতেই এই পদ দেখা যায়, আর এমন আড়ম্বর তো দূরের কথা। ফ্রান্সে একমাত্র এই রেস্তোরাঁতেই লাঞ্চ ও ডিনারে নিয়মিত এই পদ পরিবেশন করা হয়। আর আমি ঠিক সেখানেই ছিলাম—লে গ্রঁদ বুফে।
আক্ষরিক অর্থে এর নাম 'বড় বুফে'। এটি বিশ্বের বৃহত্তম 'যত খুশি খাও' রেস্তোরাঁ। তবে ছোটবেলার দেখা সাধারণ বুফের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এখানে ছিল সাত তলা গলদা চিংড়ির ফোয়ারা বা নয় পদের ফোয়া গ্রা (হাঁসের কলিজা)। ছিল ৫০টিরও বেশি ডেজার্ট বা মিষ্টি। আর ১১১ পদের চিজ বা পনির দিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ার ব্যাপার তো আছেই। এত সব আয়োজন মাত্র ৬৭.৫০ ইউরোতে!
১৯৮৯ সালে লুই ও জেন প্রিভাট এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি এখন ফরাসিদের স্বপ্নের রেস্তোরাঁ। কয়েক মাস আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। স্প্যানিশ সীমান্তের কাছে ৫৬ হাজার মানুষের ছোট্ট শহর নারবোনে মানুষ কেবল খেতে আসতেই ভিড় জমায়। বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষ এখানে আসে, যাদের ৮৬ শতাংশই ফরাসি। বছরে প্রায় ৩৫ লাখ বুকিংয়ের অনুরোধ আসে। ২০২৫ সালে এর আয় ছিল ৩ কোটি ইউরো (২৬০ কোটি টাকার বেশি), যা ফ্রান্সে সর্বোচ্চ।
লুই প্রিভাট বলেন, 'আমরা যখন শুরু করি, তখন ফ্রান্সে এমন কোনো বুফে ছিল না। ধারণাটাই নতুন ছিল।' তিনি পেশায় একজন হিসাবরক্ষক ছিলেন। তিনি জানতেন,ফরাসিরা নিজেদের খাবারের ব্যাপারে ভীষণ গর্বিত। এই দুইয়ের মেলবন্ধনই লে গ্রঁদ বুফে।
সময়ের সঙ্গে প্রিভাট বুঝতে পারেন, তাদের রেস্তোরাঁ অজান্তেই একজন শেফের রেসিপিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমি ঐতিহ্যবাহী খাবার ভালোবাসি। তাই শেফদের ট্রাইপ বা শামুকের মতো ক্লাসিক পদ রাঁধতে বলেছিলাম। একদিন খেয়াল করলাম, সব রেসিপিই অগাস্ট এসকফিয়ারের 'লে গাইড কুলিনেয়ার' বইয়ে আছে।'
এসকফিয়ারকে আধুনিক ফরাসি রান্নার জনক বলা হয়। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বইটি আজও শেফদের বাইবেল। ২০২৪ সালে এসকফিয়ার ফাউন্ডেশন এই রেস্তোরাঁকে 'এসকফিয়ারের রান্নার বিশ্বমঞ্চ' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
শেফের প্রপৌত্র মিশেল এসকফিয়ার বলেন, 'এই রেস্তোরাঁটি সত্যিই অগাস্ট এসকফিয়ারের চেতনায় তৈরি।'
সেই চেতনা মেনেই মেনু সাজানো হয়। গত বছরের শেষে এখানে ট্রাফল যুক্ত করা হয়েছে। এটি একমাত্র অল-ইউ-ক্যান-ইট বুফে যেখানে এই দামি উপাদান পরিবেশন করা হয়। প্রিভাট বলেন, 'এসকফিয়ারের বইয়ে ১,২০০টি ট্রাফলের রেসিপি আছে। তাই আমাদেরও এটি রাখতে হয়েছে।'
ট্রাফল স্টেশনে আমি পাফ পেস্ট্রি দেওয়া ট্রাফল স্যুপ এবং কালো ট্রাফল ছড়ানো অর্গানিক ডিম ভাজি খেলাম। চোখের সামনেই কাঠের কাউন্টারে এটি রান্না করা হলো।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো পরিবেশ। লবস্টার বা চিংড়ির ফোয়ারার সামনে কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। মানুষ প্লেট উপচে খাবার নিচ্ছে না, বরং ভদ্রভাবে অল্প করে নিচ্ছে। গরম খাবারের জন্য তারা ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। সেখানে পোচ করা লবস্টার বা বিফ ফিলেটের মতো লোভনীয় সব পদ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
এসকফিয়ারের বই থেকে প্রায় ১৫০টি পদ সরাসরি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পদের পাশে বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বরও দেওয়া আছে। আমি সাবধানে খাচ্ছিলাম যাতে চিজ আর ডেজার্টের জায়গা খালি থাকে। লাঞ্চের সময় দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। আর ডিনারের সময় সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত।
খাবার ছাড়াও এখানে সাজসজ্জার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের বিখ্যাত লা ট্যুর ডি'আর্জেন্ট রেস্তোরাঁ থেকে নিলামে কেনা ৪০ হাজার ইউরোর রুপার ডাক প্রেস এবং নিস থেকে আনা রুপার ট্রলি এখানে শোভা পাচ্ছে।
চারটি ডাইনিং রুমের প্রতিটির আলাদা থিম আছে। একটি ব্রিটিশ শিল্পী অ্যান ক্যারিংটনের নামে। সেখানে কাঁটাচামচ দিয়ে তৈরি একটি ফুলের তোড়া রাখা আছে। ক্যারিংটন বলেন, 'কাঁটাচামচ দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যের জন্য রেস্তোরাঁই তো সেরা জায়গা!'
খাবার অপচয়ের কথা জিজ্ঞেস না করে পারলাম না। হিসাবরক্ষক প্রিভাট জানান, মানুষ গড়ে ৪৯ গ্রাম ফোয়া গ্রা খায়। বেঁচে যাওয়া খাবার ১০০ জনেরও বেশি কর্মীর মধ্যে বিলি করা হয়। তিনি বলেন, 'আমরা ১,০০০ মানুষকে খাওয়াই এবং দিনে মাত্র ১০ কেজি খাবার ফেলে দিই। অর্থাৎ জনপ্রতি মাত্র ১০ গ্রাম অপচয় হয়।'
ভবনেও পরিবর্তন আসছে। জ্যাক গার্সিয়া নামের স্থপতির সঙ্গে মিলে নেপোলিয়ন তৃতীয় যুগের গ্যালারির আদলে নতুন প্রবেশপথ তৈরি করা হচ্ছে।
আজ নারবোনের পর্যটনের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি এই রেস্তোরাঁ। খেতে আসা পর্যটকরা গড়ে সাড়ে তিন দিন শহরে থাকেন।
সে অঞ্চলের রিজিওনাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ক্যারল ডেলগা বলেন, 'লে গ্রঁদ বুফে অন্য কোথাও হতে পারত না। আর যখন কোনো রেস্তোরাঁয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিজের সমাহার থাকে, তখন মানুষ সেখানে বারবার ফিরে আসতে চাইবে।'
