ভারত, পাকিস্তানসহ হরমুজ প্রণালিতে যেসব দেশকে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মাঝে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ছাড়া হরমুজ প্রণালি সবার জন্যই উন্মুক্ত।
রোববার মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, অনেক দেশ তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তেহরানের সঙ্গে 'যোগাযোগ করেছে' এবং 'এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের সামরিক বাহিনীর।'
তিনি বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, 'বিভিন্ন দেশের' একদল জাহাজকে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোন কোন দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে এবং কারা নিরাপদ যাতায়াতের জন্য আলোচনা করছে, তার একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
পাকিস্তান
রোববার 'করাচি' নামের একটি পাকিস্তানি পতাকাবাহী আফরাম্যাক্স ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি হয়ে উপসাগর থেকে বেরিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ নিউজ।
ভারত
শনিবার ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি জানান, তেহরান কিছু ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা এই অবরোধের মাঝে এটি একটি বিরল ব্যতিক্রম।
ফাতহালি জাহাজের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করেননি। তবে একই দিনে নয়াদিল্লি জানায়, পশ্চিম ভারতের বন্দরগুলোর উদ্দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার প্রণালিটি পার হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর, নৌপরিবহন ও পানিপথ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা বলেন, 'তারা ভোরে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং এখন ভারতের পথে রয়েছে।'
তুরস্ক
শুক্রবার তুর্কি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোলু জানান, তেহরানের অনুমতি পাওয়ার পর ইরানের কাছে অপেক্ষমাণ তুরস্কের মালিকানাধীন একটি জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
উরালোলু বলেন, 'সেখানে তুরস্কের মালিকানাধীন ১৫টি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে একটি জাহাজ এর আগে ইরানের একটি বন্দর ব্যবহার করেছিল।
আমরা ওই নির্দিষ্ট জাহাজটির জন্যই ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি জোগাড় করতে পেরেছি এবং সেটি পার হয়েছে।'
চীন
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৫ মার্চ তিনটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, অপরিশোধিত তেল ও কাতারের এলএনজি বহনকারী জাহাজগুলোকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পেতে চীনের সঙ্গে আলোচনা করছে ইরান।
সূত্রগুলোর মতে, ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল চীন, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নয়।
তাই তারা তাদের জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তেহরানকে চাপ দিচ্ছে।
চীন তাদের চাহিদার ৪৫ শতাংশ তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই আমদানি করে।
ফ্রান্স ও ইতালি
যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই দুই ইউরোপীয় দেশ তাদের জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রণালির জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নৌজোট কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের জন্য একটি নৌজোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, 'আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশ—যারা এই কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—তারা এই অঞ্চলে জাহাজ পাঠাবে। যাতে করে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া একটি জাতি দ্বারা হরমুজ প্রণালি আর কখনো হুমকির মুখে না পড়ে।'
তবে ট্রাম্প যেসব দেশের নাম উল্লেখ করেছেন, তারা এই ধরনের কোনো জোটে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
সোমবার জার্মানি এবং গ্রিস এই সামরিক জোটে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, 'যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, ততদিন কোনো ধরনের অংশগ্রহণ থাকবে না।
এমনকি সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো প্রচেষ্টায়ও আমরা অংশ নেব না।'
গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিসও জানান, তারা হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে জড়াবে না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ থাকা সত্ত্বেও, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমরা বৃহত্তর এই যুদ্ধে জড়াব না।'
মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক রজার শানাহান আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে চাইছে, মার্কিন মিত্ররা হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করার সেই কাজে জড়াবে, এমন সম্ভাবনা 'খুবই কম'।
শানাহান বলেন, যেহেতু বেশিরভাগ মার্কিন মিত্রই 'শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে', তাই তারা 'এতে সমর্থন দিতে তুলনামূলকভাবে কম আগ্রহী'।
তিনি আরও বলেন, 'তাছাড়া এখানে একটি বাস্তবসম্মত সমস্যাও আছে। আপনি যদি কোনো যৌথ সুরক্ষা অভিযানের জন্য নৌ-সমর্থন চান, তবে সেই অঞ্চলে জাহাজ পাঠাতে অনেক সময় লাগে। আপনি চাইলেই হুট করে এমন কিছু করতে পারবেন না।'
এর আগে গত ২ মার্চ, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা দেন যে, প্রণালিটি 'বন্ধ' করে দেওয়া হয়েছে।তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনো জাহাজ যদি এই পথ অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তবে আইআরজিসি এবং নৌবাহিনী 'সেই জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেবে'।
এই ঘোষণার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার থেকে এক লাফে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
সোমবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ২.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৫.৭০ ডলারে দাঁড়ায়, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৪০ শতাংশেরও বেশি।
