বিয়ে মানেই যৌন সম্পর্কের বাধ্যবাধকতা নয়: ফ্রান্সে বাতিল হচ্ছে ‘দাম্পত্য অধিকার’
বিয়ে হয়েছে মানেই যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্যবাধকতা আছে—এমন ধারণার দিন শেষ হতে যাচ্ছে ফ্রান্সে। তথাকথিত 'দাম্পত্য অধিকার' বা 'কনজুগাল রাইটস' বাতিলের পথে হাঁটছে দেশটি। বিয়ে মানেই যৌন সম্পর্কের কর্তব্য—আইনের বই থেকে এই ধারণা মুছে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার ফরাসি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। দেশটির সিভিল কোড বা দেওয়ানি বিধিতে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ধারা। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, 'একসঙ্গে বসবাস' বা 'কমিউনিটি অফ লিভিং' মানে এই নয় যে যৌন সম্পর্কের 'বাধ্যবাধকতা' তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত এই আইনে আরও একটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এখন থেকে ডিভোর্স বা বিচ্ছেদের মামলায় যৌন সম্পর্কের অভাবকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বিশেষ করে 'দোষ-ভিত্তিক' বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এটি আর প্রযোজ্য হবে না।
যদিও আদালতের রায়ে এর খুব বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম, তবুও সমর্থকরা আশাবাদী। তারা মনে করছেন, এই আইন বৈবাহিক ধর্ষণ রোধে সহায়তা করবে।
বিলটির স্পনসর গ্রিন পার্টির এমপি মারি-শার্লট গ্যারিন বলেন, 'এই ধরনের অধিকার বা কর্তব্য বজায় রাখার মানে হলো আমরা স্বামীর আধিপত্য ও নির্যাতনকেই সমর্থন দিচ্ছি। বিয়ে এমন কোনো গণ্ডি হতে পারে না যেখানে যৌন সম্মতি একবার দিলে তা সারাজীবনের জন্য হয়ে যায়।'
কোনো আইনি নথিতে 'দাম্পত্য কর্তব্য' বা 'কনজুগাল ডিউটি'র কথা সরাসরি উল্লেখ ছিল না। তবুও বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ছিল। নতুন আইন সেই ধোঁয়াশা দূর করবে।
বর্তমানে ফরাসি সিভিল কোডে বিয়ের কর্তব্য হিসেবে সম্মান, বিশ্বস্ততা, সমর্থন ও সহায়তার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা আছে দম্পতিরা 'একসঙ্গে বসবাস'-এর প্রতিশ্রুতি দেন। নথিপত্রের কোথাও 'যৌন' অধিকারের কথা নেই। এই ধারণার উৎপত্তি মূলত মধ্যযুগীয় গির্জার আইনে।
তবে আধুনিক বিচ্ছেদের মামলায় বিচারকরা অনেক সময় 'একসঙ্গে বসবাস'-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যৌন সম্পর্ককেও এর মধ্যে টেনে এনেছেন।
২০১৯ সালের একটি বিখ্যাত ঘটনার কথা ধরা যাক। এক নারী কয়েক বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে চাননি। আদালত তখন স্বামীকে 'দোষ-ভিত্তিক' বিচ্ছেদ মঞ্জুর করে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে স্ত্রীর ওপরই দোষ চাপানো হয়।
ওই নারী পরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে (ইসিএইচআর) যান। গত বছর আদালত ফ্রান্সের নিন্দা জানায়। তারা বলে, যৌন সম্পর্ক করতে না চাওয়া 'দোষ-ভিত্তিক' বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে না। নারীবাদী কর্মীরা একে বড় অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
ইসিএইচআর-এর সিদ্ধান্তের পর ফরাসি বিচারকদের পক্ষে আর আগের মতো রায় দেওয়া কার্যত অসম্ভব। তাই নতুন আইনটি মূলত বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্যই করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের মতে, স্ত্রীর ওপর স্বামীর যৌন অধিকার আছে—সমাজে এমন ধারণা এখনো রয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
২০২৪ সালের 'মাজান ট্রায়াল' বা বিচার এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে জিসেল পেলিকট নামের এক নারীকে ড্রাগ দিয়ে অজ্ঞান করে তার স্বামী। এরপর স্বামীকে খুশি করতে আসা অন্য পুরুষরা তাকে বারবার ধর্ষণ করে। অনেক আসামি দাবি করেছিল, স্বামীর অনুমতি ছিল বলে তারা ভেবেছিল স্ত্রীরও সম্মতি আছে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো ফ্রান্সেও এখন বৈবাহিক ধর্ষণ আইনের চোখে অপরাধ। তবে ১৯৯০ সালের আগে পুরুষরা দাবি করতে পারত যে বিয়ে মানেই সম্মতি।
গত বছরের নভেম্বর থেকে ফ্রান্সে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞাও প্রসারিত হয়েছে। এতে অসম্মতির বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। আগে ধর্ষণ বলতে বোঝানো হতো সহিংসতা, বাধ্যবাধকতা, হুমকি বা আচমকা আক্রমণের মাধ্যমে যৌন কাজ। এখন সংজ্ঞা বদলেছে। যেখানে 'জানাশোনা, সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যাহারযোগ্য' সম্মতি নেই, সেটিই ধর্ষণ। আইন বলছে, নীরব থাকা বা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো মানেই সম্মতি নয়।
