কুশনার, উইটকফ দুজনেই নির্বোধ, তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের দুই শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার আদৌ কি পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন, যাতে তারা ইরানের সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্পকে ব্যাখ্যা করতে পারেন—অথবা দেশটির সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন?
কয়েকজন পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ এই দুই উপদেষ্টার প্রযুক্তিগত বোঝাপড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ তারা ইরানের গবেষণা রিয়্যাক্টর সম্পর্কে এমন একটি মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছিলেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সোমবার জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম এমএস নাউ।
যারা বিষয়টি সম্পর্কে কম জানেন তাদের জন্য পারমাণবিক শক্তির একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ পারমাণবিক রিয়্যাক্টরে সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। ২০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বলা হয়, আর ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-মানের (বা পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী) ইউরেনিয়াম হিসেবে বিবেচনা করা হয়—এমন তথ্য দিয়েছে সেন্টার ফর আর্মস কনট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফেরেশন।
তেহরানের গবেষণা রিয়্যাক্টরটি প্রায় ৬০ বছর পুরোনো একটি স্থাপনা, যা ২০ শতাংশের কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করার জন্য নকশা করা হয়েছে। এটি গবেষণা এবং চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত আইসোটোপ উৎপাদনের জন্য তৈরি, সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য নয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছে যে এই স্থাপনাটি গোপনে অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম মজুত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা এ দাবিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না।
অবসরপ্রাপ্ত পারমাণবিক পদার্থবিদ এবং ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অফ ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রিসপন্সিবিলিটি-র বোর্ড সদস্য ক্লাউস মন্টেনন বলেন, "একটি চালু পারমাণবিক রিয়্যাক্টরকে মজুতাগার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এমন ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে আমি জানি না।"
অন্যদিকে ভিয়েনা সেন্টাফ্র ফর ডিজআর্মামেন্ট অ্যান্ড নন-প্রলিফেরেশন-এর নির্বাহী পরিচালক এলিনা সোকোভা বলেন, প্রশাসনের এই মূল্যায়ন ছিল "বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্যপূর্ণ", যেখানে "প্রযুক্তিগত ভুলে ভরা" ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, "এতে পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন উপাদান এবং তাদের সম্ভাব্য বিস্তার সক্ষমতাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। গবেষণা রিয়্যাক্টর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা রাখে না—তা বেসামরিক বা সামরিক যে উদ্দেশ্যেই তৈরি হোক না কেন।"
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এমএস নাউ-কে জানান, জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় উইটকফ ও কুশনার পারমাণবিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি রাখেননি। পরে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েনা-তে নির্ধারিত প্রযুক্তিগত আলোচনাতেও অংশ নেয়নি।
পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো জটিল বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো তার প্রয়োজনীয় জ্ঞান আছে কিনা এমন প্রশ্ন যখন উঠছে, তখন গত সপ্তাহে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে উইটকফ বলেন, "আমি বলব না যে আমি পারমাণবিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তবে আমি অনেক কিছু শিখেছি, এ বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি, এবং আলোচনার টেবিলে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার মতো সক্ষমতা আমার রয়েছে। জ্যারেডও একইভাবে সক্ষম।"
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের আগে উইটকফ দাবি করেছিলেন যে, ইরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ করা ৪৬০ কেজি ইউরেনিয়াম জমা করেছে, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্ভাব্য ১১টি বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ১২টি বোমা তৈরির মতো সক্ষমতা তেহরানের থাকতে পারে।
তবে আলোচনার সময় ইরানিরা এই ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে ওই মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কূটনীতিক জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ২০১৮ সালে ট্রাম্প জয়েন্ট কম্প্রেহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার পরই তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে ইরানিরা "আমাদের কাছে উপাদান (ইউরেনিয়াম) হস্তান্তরের বিষয়ে কথা বলেছিল।" কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সামরিক হামলা শুরু করার পর আলোচনা হঠাৎ করেই ভেঙে যায়।
