চুক্তির কাছাকাছি মনে হলেও— আরও চাপ সইবার মতো এক ইরানের মুখোমুখি আমেরিকা
ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রায় চার মাস পর, সেখানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঠিকই ঘটেছে, তবে তা ওয়াশিংটন বা জেরুজালেমের কাঙ্ক্ষিত উপায়ে হয়নি। যাকে অনেকে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র ৩.০' বলে অভিহিত করছেন, তা এখন ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চেয়ে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রিত একটি সামরিক জান্তার রূপ নিয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করতে এবং এর মাধ্যমে সৃষ্ট হুমকি দূর করতেও যুদ্ধে নেমেছিল ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। কিন্তু এপর্যন্ত এই সংঘাতের ফল হিসেবে কেবল একটি 'আহত' ইরানকেই পেয়েছে তারা, যে ইরান এখন আরও বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এমনকি নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে অনড় থাকতে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
চলতি সপ্তাহে যুদ্ধ অবসানের পথ খোঁজার চেষ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর পাল্টা আঘাত হেনেছে। তবে দুই পক্ষের পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বিচারীতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, গত শুক্রবারের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, 'সমঝোতা স্মারক' (এমওইউ) হিসেবে পরিচিত প্রাথমিক চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, উভয়পক্ষ একটি চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনার "এত কাছাকাছি এর আগে কখনোই আসেনি।"
মূল চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ হবে এই সমঝোতা স্মারকে সই। যার আওতায়, যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বিস্তৃত হবে, এবং এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
এই সমঝোতা স্মারকে একমত হওয়ার পর তেহরানের হাতে কিছু বাড়তি সুবিধা থাকবে। কারণ উভয় পক্ষই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীতে দেশটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করছে। অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ই ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে, যা সফলও হতে পারে আবার ব্যর্থতায়ও পর্যবসিত হতে পারে।
এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে একসময় ইরানকে দুর্বল ও অরক্ষিত মনে হলেও, বর্তমানের তেহরান শাসকগোষ্ঠী কেবল টিকেই থাকেনি, বরং তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাও অক্ষুণ্ন রেখেছে। ইরানের বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন দেশটির শাসনভার, সমাজ ব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্র দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বলেই মনে হচ্ছে।
চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ওয়াকিল বলেন, ইরান এখন পরিচালিত হচ্ছে "ক্ষমতায় আসা তুলনামূলক তরুণ ও আরও বেশি দুঃসাহসী এক প্রজন্মের" হাতে। কার্নেগি এন্ডোমেন্টের সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার একে ব্যাখ্যা করেছেন "ধর্মীয় ক্ষমতা থেকে হার্ড পাওয়ার বা কঠোর সামরিক শক্তিতে রূপান্তর" হিসেবে।
এই নতুন নেতারা বিশ্বাস করেন যে, বড় ধরনের সংঘাত বা লড়াই পুনরায় শুরু হলেও— তারা নিজেদের আলোচনার অবস্থান কিংবা বৃহত্তর আঞ্চলিক লক্ষ্যগুলোর কোনো রকম বড় পরিবর্তন ছাড়াই টিকে থাকতে পারবেন। তাদের সেই লক্ষ্যগুলোর অন্যতম হলো নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করা, যাতে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের মতো ইরানের ওপর আর কোনো হামলা চালানো সম্ভব না হয়।
তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার পর হলেও, সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখতে চান। একই সাথে তারা সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সরঞ্জামাদি নিজেদের কাছে রেখে দেবে যা দিয়ে তারা চাইলে আবারও একটি 'পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রান্তিক রাষ্ট্রে' (নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড স্টেট) পরিণত হতে পারে—অর্থাৎ এমন একটি রাষ্ট্র যার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সব উপাদান থাকবে, শুধু তা চূড়ান্তভাবে সংযোজন করা হবে না।
ইরানের ক্ষমতার নতুন নিয়ন্ত্রকরা কঠোর ও আপসহীন আলোচনাকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যারা তাদের মৌলিক স্বার্থগুলো রক্ষার্থে চরম বিপর্যয় বা ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতেও দ্বিধাবোধ করেন না।
এই মনোভাব দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেখানো সতর্ক অবস্থানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন। খামেনি বহু বছর ধরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন এবং ইরান যাতে কখনোই যৌথভাবে ইসরায়েলি-মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু না হয়, সেই চেষ্টা করে এসেছিলেন।
সেই ভয়াবহ হামলার পরও টিকে থাকার পর ইরানের বর্তমান নেতারা আর আগের মতো কোনো বাধ্যবাধকতা অনুভব করছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, তারা নিশ্চিত যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরুজ্জীবিত করার কোনো ইচ্ছা নেই এবং তিনি ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের ওপরও কিছুটা লাগাম টেনেছেন। এটিই মূলত ব্যাখ্যা করে যে, কেন মাসের পর মাস ধরে লেবাননের বৈরুতে ইরানের প্রক্সি সংগঠন হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের পর, এই সপ্তাহে ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরায়েলে পাল্টা আক্রমণ চালানোর সাহস দেখিয়েছে।
ইসরায়েলে ইরানের এই হামলা চালানোর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে যুদ্ধবিরতির দাবির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধ অবসানের আলোচনার একটি যোগসূত্র তৈরি করা। তবে ইসরায়েল এই দুটি বিষয়কে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী বায়েজ বলেন, ইরানের নতুন এই শাসনব্যবস্থার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের মাধ্যমে যে লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি, তা কেবল বাড়তি জোরজবরদস্তি বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তিনি জানান, ইরানিরা মনে করে যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তারা পার করে এসেছে। ফলে তারা তাদের মূল দাবিগুলো রক্ষায় কাজ করে যাবে—যার মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের মতো তাদের প্রক্সি বা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো চুক্তির আওতায় ইরান সম্ভবত সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে সীমিত করতে রাজি হবে। এছাড়া তাদের বর্তমান উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের অর্ধেক বিদেশে পাঠাতে এবং বাকি অর্ধেক নিম্ন মাত্রায় নামিয়ে আনতে রাজি হতে পারে। তবে তা সত্ত্বেও ইরান তার পারমাণবিক জ্ঞান এবং উন্নত সেন্ট্রিফিউজসহ সার্বিক পারমাণবিক অবকাঠামো নিজেদের কাছেই রেখে দেবে।
ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ যুক্তি দেন যে, এর পাশাপাশি যখনই মন চায় তখনই হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা ইরানকে এমন একটি 'তুরুপের তাস' এনে দেবে, যা ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ফের আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখবে। এটি এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে নতুন করে শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, "যে যুদ্ধ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করতে (অস্ত্র উৎপাদনে) বাধ্য করবে।"
সিট্রিনোভিচ-সহ অন্যান্য পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধ শুরুর আগে জেনেভায় ট্রাম্পের দূতদের কাছে ইরান যে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বর্তমান পারমাণবিক আলোচনায়—তারা তার চেয়ে অনেক কম ছাড় সংবলিত প্রস্তাব দিচ্ছে। নতুনভাবে সাহসী হয়ে ওঠা ইরান সম্ভবত তার অন্যান্য দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আরও কঠোর চাপ সৃষ্টি করবে।
