ফাইবারম্যাক্সিং: প্রোটিনের দিন কি শেষ? ফাইবার খাওয়ার নতুন এই ট্রেন্ডে মিলছে অবাক করা সুফল
গত বছর অনেকেই শারীরিক শক্তি বাড়াতে প্রোটিনের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটেছেন। কিন্তু গত কয়েক মাসে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অথচ আমরা অনেকেই প্রতিদিন এটি যথেষ্ট পরিমাণে খাই না।
টিকটকে '#ফাইবারম্যাক্সিং' হ্যাশট্যাগ দেওয়া পোস্টগুলো ১৫ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে। চিয়া সিড, পরিজ, লাল রাজমা আর ছোলার উপকারিতা নিয়ে ভিডিও এখন সবার ফিডে ঘুরছে।
এনএইচএস-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ৯৬ শতাংশ মানুষই এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। আমরা এর ধারেকাছেও নেই। গড়ে মানুষ মাত্র ১৬.৪ গ্রাম ফাইবার খাচ্ছে, আর নারীরা খাচ্ছে পুরুষদের চেয়েও কম।
অনেক পুষ্টিবিদ অবশ্য ফাইবার নিয়ে এই হইচইকে ভালো চোখেই দেখছেন।
ডায়েটিশিয়ান কেট হিলটন বলেন, ফাইবারকে এতদিন হজম আর পেটে গ্যাসের সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতো। তাই একে খুব একটা 'আকর্ষণীয় পুষ্টি উপাদান' হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এর বিপরীতে প্রোটিনকে দীর্ঘদিন ধরে ফিটনেস আর ব্যায়ামের সঙ্গে মেলানো হতো।
পুষ্টিবিদ ক্রিস্টেন স্ট্যাভরিডিস বলেন, 'ফাইবারের পোস্টগুলো দেখে আমি বেশ খুশি হয়েছিলাম। মনে হচ্ছে পেটের স্বাস্থ্য বা 'গাট হেলথ' নিয়ে বার্তাগুলো অবশেষে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।'
পেটের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ব্রাউন রাইস বা খোসাসহ আলুর মতো আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার আরও অনেক গুণ আছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের ডায়েটিক্সের অধ্যাপক কেভিন হুইলান বলেন, 'যারা বেশি পরিমাণে ফাইবার খান, তারা বেশি দিন বাঁচেন। তাদের হৃদরোগ, ক্যানসার এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কম থাকে।' তিনি আরও যোগ করেন, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
বার্মিংহামের ২৪ বছর বয়সী ইয়েশে সান্ডার জানান, দিনে ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে 'অনেক ভালো' বোধ করছেন।
ছোটবেলায় তার বাবা-মা তাকে দিনে পাঁচবার ফল ও সবজি এবং ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়াতে চাইতেন। কিন্তু কৈশোরে পা দিয়ে তিনি বিদ্রোহ করে বসেন।
ইয়েশে বলেন, 'আমি স্বাস্থ্যকর খাবার ছুঁয়েও দেখতে চাইতাম না। কিশোর বয়সে আমি প্রচুর পরিমাণে চকলেট, ডোনাট আর কুকিজ খেতাম।'
কলেজে তার প্রিয় চটজলদি খাবারের তালিকায় ছিল ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর সাদা পাউরুটি বা ফ্রোজেন পিৎজা।
ইয়েশে বলেন, '২০ বছর পার হওয়ার পর আমার মনে হলো বাবা-মাই হয়তো সঠিক ছিলেন।'
শরীর অলস লাগত, মন খারাপ থাকত এবং কোনো কাজে উৎসাহ পেতেন না তিনি। এরপর তিনি নিজের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া শুরু করেন। ফাইবারের পরিমাণ বাড়ানোর পর ইয়েশে পার্থক্যটা টের পান।
ইয়েশে বলেন, 'এখন আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি: যখন আমি বেশি ফাইবার খাই, আমার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। আমার উদ্বেগ আর মন খারাপ ভাব কমে যায়।'
সকালের নাশতা তার প্রিয় খাবার। সকালে ফাইবার পেতে তিনি নানা কিছু মিশিয়ে পরিজ খাওয়ার পরামর্শ দেন।
ফাইবার কী এবং কেন এটি আমাদের খাবারের জন্য জরুরি?
ডায়েটারি ফাইবার হলো উদ্ভিদের চিনির অণুর একটি শৃঙ্খল, যা মানুষ হজম করতে পারে না। এটি ফল, সবজি, শস্য, ডাল ও বাদামে পাওয়া যায়।
অধ্যাপক হুইলান জানান, ১৯৭০-এর দশকে মানুষ ভাবত ফাইবার কেবল বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, 'এখন আমরা জানি এর কাজ অনেক বেশি। এটি কেবল পেট পরিষ্কারই করে না, আরও অনেক উপকার করে।'
ওটস ও ডালে থাকা 'ফার্মেন্টেবল ফাইবার' আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সাহায্য করে।
লাল আটার রুটি, ভুসি ও ফল-সবজির খোসায় থাকা 'অদ্রবণীয় ফাইবার' বা 'ইনসলুবল ফাইবার' হজমে ও মলত্যাগে সাহায্য করে।
আর ওটস, বীজ এবং কিছু ফল ও সবজিতে থাকা 'ভিসকাস ফাইবার' রক্তে শর্করা বা চিনি শোষণের গতি কমিয়ে দেয়।
হুইলান বলেন, এই বিভিন্ন ধরনের ফাইবার আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ফাইবারের উপকারিতা নিয়ে বলতে গিয়ে হুইলান বড় বড় গবেষণার কথা উল্লেখ করেন। এসব গবেষণায় মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের হওয়া রোগের তথ্য নেওয়া হয়।
যদিও এই গবেষণাগুলোতে পরিবেশ বা ডায়েট সম্পর্কে সচেতনতার মতো বিষয়গুলো সব সময় থাকে না, তবুও তিনি বলেন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতেও দেখা গেছে ফাইবার শরীরের নানা অঙ্গের জন্য উপকারী।
হুইলান জানান, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চমাত্রার ফাইবার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। প্রিবায়োটিক ফাইবার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়, যা উদ্বেগ ও হতাশার ঝুঁকি কমাতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমাদের মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ আছে, যাকে গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস বলা হয়।' ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে নির্দিষ্ট কিছু ফাইবার মেজাজ ভালো করতে পারে।
হুইলানের গবেষণার একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, ফাইবার ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
'আমার ত্বক এখন ভালো, শরীরে শক্তি বেড়েছে'
গত বছর অসুস্থ হওয়ার পর ভিকি ওউয়েন্স খাবারে ফাইবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দারুণ ফল পেয়েছেন।
ব্যবসায়ী হিসেবে রান্নার সময় পেতেন না তিনি। তাই বাইরের খাবার বা তৈরি খাবারই বেশি খেতেন।
এরপর ২৫ বছর বয়সী ভিকির হঠাৎ কিছু অদ্ভুত সমস্যা শুরু হয়। প্যানিক অ্যাটাক, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এবং চোখ ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তিনি জানান, ডাক্তাররাও এতে অবাক হয়ে যান।
তিনি তার জীবনযাত্রা নতুন করে সাজাতে শুরু করেন। একজন আকুপাংচার বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তিনি ডায়েট বদলান। ভিকি বুঝতে পারেন তিনি প্রায় কোনো ফাইবারই খাচ্ছেন না।
তিনি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বা আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বাদ দিয়ে সতেজ ফল, সবজি, লাল আটার পাস্তা ও ওটস খাওয়া শুরু করেন।
ধীরে ধীরে তিনি এর বিশাল উপকারিতা দেখতে পান।
ভিকি বলেন, 'আমার ত্বক এখন আগের চেয়ে ভালো, আমি শরীরে বেশি শক্তি পাই। আমার মনে হয় সামগ্রিকভাবে সবকিছুর ভারসাম্য ফিরে এসেছে।'
খাবারে ফাইবার বাড়াবেন যেভাবে
ডায়েটিশিয়ান হিলটন বলেন, ছোট ছোট পরিবর্তনেই খাবারে ফাইবার বাড়ানো সম্ভব। এটি করার কিছু উপায় নিচে দেওয়া হলো:
- সাদা পাউরুটির বদলে লাল আটার বা শস্যদানাযুক্ত রুটি খান।
- চিপস বা চকলেটের বদলে নাস্তা হিসেবে বাদাম, কিউই ফল বা পপকর্ন খান।
- পরিজ বা দইয়ের সঙ্গে বীজ, বাদাম, ফল বা আমন্ড বাটার মেশান।
- সাদা ভাতের বদলে লাল চালের বা ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খান। অথবা অর্ধেক সাদা ও অর্ধেক লাল চাল মিশিয়ে নিন।
- স্যান্ডউইচে অ্যাভোকাডো, হুমাস বা সালাদ যোগ করুন।
- সকালের নাশতায় সিরিয়াল খেতে চাইলে লাল আটার বিস্কুট বা ব্র্যান ফ্লেক্স বেছে নিন।
- দিনে ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার জন্য পুষ্টিবিদ স্ট্যাভরিডিস একটি নমুনা খাবারের তালিকা দিয়েছেন (ব্র্যান্ড ও পরিমাণভেদে ফাইবারের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে):
- সকাল: দুই পিস লাল আটার টোস্ট (৭ গ্রাম ফাইবার), সঙ্গে একটি কলা (১.৫ গ্রাম ফাইবার) ও মধু।
- দুপুর: একটি সেদ্ধ বা বেকড আলু (৫ গ্রাম ফাইবার), ১০০ গ্রাম বেকড বিনস (৪ গ্রাম ফাইবার), পনির, টুনা মাছ, সালাদ ও শেষে একটি কিউই ফল (২ গ্রাম ফাইবার)।
- বিকেল: এক বাটি (২০ গ্রাম) পপকর্ন (২ গ্রাম ফাইবার)।
- রাত: রাজমা দিয়ে গরুর মাংসের কিমার বোলোনিজ (৫ গ্রাম ফাইবার) এবং লাল আটার স্প্যাগেটি (৬.৫ গ্রাম ফাইবার)।
হিলটন বলেন, যুক্তরাজ্যের মানুষ প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়, যাতে সাধারণত খুব বেশি ফাইবার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা যে শর্করা খাই তা সাধারণত শস্যদানা হয় না। আর প্রোটিনের জন্য আমরা ডাল বা উদ্ভিজ্জ উৎসের চেয়ে মাংসের ওপর বেশি নির্ভর করি।'
স্ট্যাভরিডিস উল্লেখ করেন, সম্প্রতি প্রোটিন নিয়ে মানুষের মাতামাতির কারণেও ফাইবারের ঘাটতি হতে পারে। কারণ অনেকে অন্য পুষ্টি বাদ দিয়ে শুধু প্রোটিনকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্যের জন্য প্রোটিন জরুরি হলেও তিনি বলেন, মানুষের উচিত 'প্রোটিন নিয়ে বাড়াবাড়ি বন্ধ করা এবং ফাইবারের হিসাব রাখা শুরু করা'।
বেশির ভাগ মানুষের জন্য বেশি ফাইবার খাওয়া ভালো হলেও ক্রোনস ডিজিজ এবং ডাইভার্টিকুলাইটিসের মতো রোগে আক্রান্তদের জন্য এটি অনেক সময় সুপারিশ করা হয় না। তাই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ওয়েলবিং কোম্পানি 'মাইন্ডফুল গাট'-এর কারা হুইটলি-ম্যাকগ্রেইন ব্যাখ্যা করেন, হুট করে খুব দ্রুত ফাইবারের পরিমাণ বাড়ালেও সমস্যা হতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, 'ধীরে ধীরে বাড়ান। হঠাৎ করে বড় পরিবর্তন আনলে পেট ফাঁপা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।' এ ছাড়া তিনি প্রচুর পানি পান করার কথাও বলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাইবার নিয়ে অবশেষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দেখে হুইটলি-ম্যাকগ্রেইন 'সত্যিই খুশি'। তবে তিনি তরুণদের ওপর বাড়তি চাপ দিতে চান না, যারা প্রতিনিয়ত নানা ডায়েটের জাঁতাকলে পিষ্ট।
তিনি বলেন, 'আমাদের নিজেদের জন্য সেরাটা বেছে নিতে হবে। আপনার ডায়েটে ধীরে ধীরে কিছু ফাইবার যোগ করুন, শরীর কেমন বোধ করে তা খেয়াল করুন এবং সেই অনুযায়ী এগিয়ে যান।'
