বয়স বাড়ছে, কিন্তু আপনি কতটা ফিট? জানুন ৪ সহজ উপায়ে
বার্ধক্য নিয়ে ভাবার সময় এখনই। শেষ বয়সে শারীরিক অবস্থা কেমন হতে পারে বা কোন কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে—তা নিয়ে আগাম প্রস্তুতি জরুরি।
ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য আগাম বলার মতো কোনো জাদুকরি উপায় অবশ্য নেই। তবে বর্তমান শক্তি, ক্ষমতা, ফিটনেস ও ভারসাম্য বোঝার কিছু সহজ পরীক্ষা আছে। এগুলো ভবিষ্যৎ শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এসব পরীক্ষা দীর্ঘায়ু ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। শেষ বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে মেঝেতে বসে খেলা বা পায়ে হেঁটে চলার জন্য এই সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
অন্টারিও-র ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির কাইনসিওলজি বিভাগের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ফিলিপস বলেন, 'শেষ বয়সের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কোনো সময়ই খুব আগে নয়।' বয়সের সঙ্গে মানুষের শক্তি ও পেশি প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়। তাই শুরুটা যতটা সম্ভব ভালো হওয়া চাই। আগেভাগে শরীরচর্চা শুরু করাকে ডা. ফিলিপস 'ব্যাংকে টাকা জমানোর' সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি আরও বলেন, 'শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে কখনোই দেরি হয় না। আমাদের কাছে তথ্য আছে যে ৯০ বছর বয়সীরাও সামান্য শরীরচর্চায় শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারেন।'
শারীরিক সক্ষমতার বর্তমান অবস্থা বুঝতে নিচের চারটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। ফলাফল আশানুরূপ না হলেও চিন্তার কিছু নেই। নিয়মিত কিছু শক্তি ও ভারসাম্যের ব্যায়াম করলেই এই স্কোরের উন্নতি সম্ভব।
১. বসে ওঠা পরীক্ষা
দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকে মেঝেতে বসা এবং আবার উঠে দাঁড়ানোই এই পরীক্ষার মূল কাজ। শর্ত হলো—হাত, হাঁটু বা অন্য কোনো কিছুর সাহায্য নেওয়া যাবে না। মোট ১০ পয়েন্টের স্কেলে এই পরীক্ষা হয়। বসার জন্য ৫ এবং ওঠার জন্য ৫ পয়েন্ট। হাত, হাঁটু বা শরীরের অন্য কোনো অংশের সাহায্য নিলে প্রতিবার ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। আর টলমল করলে বা ভারসাম্য হারালে আধা পয়েন্ট বাদ দিতে হবে।
ব্রাজিলের এক্সারসাইজ মেডিসিন ক্লিনিকের ডা. ক্লদিও গিল আরাউজো এই পরীক্ষাটি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বলেন, '৩০ ও ৪০ বছর বয়সীদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ১০-এ ১০ পাওয়া। আর ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা ৮ পেলেই তারা খুব ভালো অবস্থায় আছেন বলে ধরা হবে।'
এই পরীক্ষায় শক্তি, ক্ষমতা, ভারসাম্য ও নমনীয়তা যাচাই করা হয়। ডা. আরাউজোর মতে, এটি মৃত্যুর ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে। তাঁর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় ৪৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী ৪ হাজারের বেশি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ১২ বছরের ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই পরীক্ষায় ৪ বা তার কম স্কোর করেছেন, তাদের অকালমৃত্যুর হার ১০ স্কোর করাদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। এর মূল কারণ হলো কম স্কোর করা ব্যক্তিদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
২. হাঁটার গতি পরীক্ষা
স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ কত দ্রুত হাঁটে, তা তার কর্মক্ষমতা ও জীবনীশক্তির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের অধ্যাপক জেনিফার ব্র্যাচ বলেন, 'এটি ভবিষ্যৎ শারীরিক অবনতি, মৃত্যুঝুঁকি, নার্সিং হোমে যাওয়ার প্রয়োজন বা পঙ্গুত্বের পূর্বাভাস দেয়।'
হাঁটার গতি মাপতে সমতল জায়গায় ৪ মিটার বা প্রায় ১৩ ফুট জায়গা মেপে নিতে হবে। স্বাভাবিক গতিতে এই দূরত্ব পার হতে কত সময় লাগে তা দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দৌড়ানো যাবে না, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতে হবে। সব বয়সী মানুষেরই প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ১.২ মিটার গতি থাকা উচিত। অর্থাৎ ৪ মিটার পার হতে ৩ সেকেন্ডের একটু বেশি সময় লাগার কথা।
ডা. ব্র্যাচ প্রতি কয়েক মাস পর পর এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, 'সময়ে পরিবর্তন দেখা দিলে তা সতর্কবার্তা হতে পারে।' হাঁটা সহজ মনে হলেও এর জন্য হৃদযন্ত্র, পেশি, হাড়, ভারসাম্য ও স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কাজ করা প্রয়োজন। গতি কমে যাওয়া মানে এসবের কোনোটিতে সমস্যা হতে পারে, যার চিকিৎসা দরকার।
৩. হাতের মুঠোর জোর পরীক্ষা
হাতের মুঠোর জোরের সঙ্গেও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক আছে। আমেরিকান ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন জেরিয়াট্রিক্সের প্রেসিডেন্ট ক্যাথি সিওলেক বলেন, 'হাত বেশি ব্যবহার করার অর্থ হলো মানুষটি দৈনন্দিন জীবনে কর্মক্ষম। বাজার সদাই টানা, গাড়ির দরজা খোলা বা নাতিকে কোলে নেওয়ার মতো কাজে হাতের ব্যবহার হয়।' এসব কাজ হাতের জোর বাড়ায়। রান্নার মতো ঘরের কাজ বা ওভেন থেকে ভারী পাত্র বের করার জন্যও হাতের জোর জরুরি।
চিকিৎসকরা সাধারণত 'ডায়নামোমিটার' নামের যন্ত্র দিয়ে এটি মাপেন। তবে বাড়িতে পরীক্ষার জন্য ডা. নিমা আফশার 'ফার্মারস ক্যারি' পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন। দুই হাতে ভারী ওজন নিয়ে ৬০ সেকেন্ড হাঁটার চেষ্টা করতে হবে। হালকা ওজন দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে ওজন বাড়াতে হবে। হাতে বা শরীরে ব্যথা হলে থামা উচিত।
ডা. আফশার জানান, ৪৫ বছর বয়সী একজন পুরুষের দুই হাতে ৬০ পাউন্ড করে দুটি ডাম্বল বহন করতে পারা উচিত। ৬৫ বছর বয়সীদের জন্য এটি ৪০ পাউন্ড এবং ৮৫ বছর বয়সীদের জন্য ২৫ পাউন্ড। নারীদের ক্ষেত্রে এই ওজন হবে যথাক্রমে ৪০, ২৫ এবং ১৫ পাউন্ড।
৪. এক পায়ে দাঁড়ানো
বয়স বাড়লে যেমন শক্তি কমে, তেমনি কমে ভারসাম্য। এতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বয়স্কদের আঘাত ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই পড়ে যাওয়া।
ভারসাম্য পরীক্ষার উপায় খুব সহজ। এক পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত এক পায়ে কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারা উচিত। আরেকটু কঠিন করতে চাইলে চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করা যেতে পারে।
ডা. আরাউজোর ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫১ থেকে ৭৫ বছর বয়সী ২০ শতাংশ মানুষ ১০ সেকেন্ড দাঁড়াতে পারেননি। যারা পারেননি, তাদের পরবর্তী সাত বছরে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৮৪ শতাংশ বেশি ছিল। সম্ভবত গবেষণার শুরুতেই তারা অসুস্থ ছিলেন।
ডা. আফশার বলেন, 'এই পরীক্ষা দিয়ে কারও মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় বলা যায় না। তবে কেউ যদি গড়ের নিচে থাকেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার স্বাস্থ্য ভালো না থাকার আশঙ্কাই বেশি।'
তবে আশার কথা হলো, শক্তি, ফিটনেস বা ভারসাম্য—সবই অনুশীলনের মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব। আর তা করতে পারলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও কমে যায়।
