রহস্যময় মস্তিষ্ক রোগ: কেউ বলছেন 'পরিবেশগত বিষ', কেউ 'ভুল চিকিৎসা', অবশেষে যে উত্তর মিললো
২০১৯ সালের শুরুর দিক। কানাডার নিউ ব্রান্সউইক প্রদেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসকরা চিন্তিত মুখে রিপোর্ট দেখছিলেন। দুজন রোগীর শরীরে 'ক্রুজফেল্ড-জ্যাকব ডিজিজ' বা সিজেডি-র লক্ষণ। এটি মস্তিষ্কের বিরল ও প্রাণঘাতী এক রোগ।
দ্রুত বিশেষজ্ঞদের দল গঠন করা হলো। ভাগ্যক্রমে রোগটি ছড়ায়নি। তবে ওখানেই গল্পের শেষ নয়, বরং এক বড় রহস্যের শুরু।
দলে ছিলেন আলিয়ের মারেরো। কিউবান বংশোদ্ভূত এই নিউরোলজিস্ট জানালেন এক ভয়ের কথা। তিনি গত কয়েক বছর ধরে এমন অনেক রোগী দেখছেন। সিজেডি-র মতো লক্ষণ, অথচ পরীক্ষায় ফলাফল আসছে 'নেগেটিভ'। আক্রান্তদের তালিকায় তরুণরাও আছে, যাদের দ্রুত স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মারেরো জানালেন, রোগীর সংখ্যা ২০ ছাড়িয়ে গেছে। কয়েকজন তো মারাও গেছেন। কিন্তু রোগটা আসলে কী? তিনি পড়ে গেলেন এক গোলকধাঁধায়।
তার নোটবুক ঘাটলে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। স্মৃতিভ্রংশ, ওজন কমা, শরীরে তীব্র ঝাঁকুনি—সবই আছে। সবচেয়ে ভুতুড়ে লক্ষণ ছিল 'ক্যাপগ্রাস ডিলিউশন'। এই সমস্যায় রোগী ভাবেন, তার আপনজনকে সরিয়ে হুবহু দেখতে কোনো প্রতারককে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কারও হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল, কারও চুল পড়ছিল। একজন রোগী তো জানালেন, তিনি ইংরেজি 'কিউ' অক্ষরটি কীভাবে লিখতে হয়, সেটাই বেমালুম ভুলে গেছেন।
পরবর্তী পাঁচ বছরে মারেরোর রোগীর সংখ্যা ২০ থেকে বেড়ে ৫০০-র কোঠায় পৌঁছাল। কিন্তু কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মিলল না। মস্তিষ্কের এই রোগ নিয়ে নতুন কোনো তথ্য বা ওষুধ আবিষ্কৃত হলো না।
এর বদলে গত বছর কানাডিয়ান নিউরোলজিস্টদের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হলো। তাদের সাফ কথা—আসলে কোনো রহস্যময় রোগ নেই। রোগীরা আগে থেকেই পরিচিত স্নায়বিক, শারীরিক বা মানসিক রোগে ভুগছিলেন। মারেরোর এই দাবি আসলে 'তাসের ঘর'।
কিন্তু শত শত রোগী এই দাবি মানতে নারাজ। বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দলের অন্তত একজন রোগী যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচতে 'মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং' বা স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছেন। মৃত্যুসনদে কারণ লেখা ছিল—'অজানা কারণে স্নায়বিক অবস্থার অবনতি'।
ষড়যন্ত্র নাকি ধামাচাপা?
রোগীরা মারেরোর অন্ধ ভক্ত। তারা বিজ্ঞানীদের ওই প্রতিবেদনকে 'ত্রুটিপূর্ণ' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের বিশ্বাস, তারা কোনো পরিবেশগত বিষক্রিয়া বা টক্সিনের শিকার। আর সরকার সেটা ধামাচাপা দিচ্ছে।
জিলিয়ান লুকাস নামের এক রোগী বলেন, 'আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী নই। কিন্তু আমার মনে হয় এর পেছনে বড় কোনো আর্থিক কারণ আছে।'
জিলিয়ান ও তার সৎ বাবা ডেরেক—দুজনেই মারেরোর রোগী। ডেরেক হঠাৎ রেগে যেতেন, অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়তেন। জিলিয়ানের সমস্যা ছিল আলো সহ্য না হওয়া, কাঁপুনি আর ভয়ংকর মাইগ্রেন। এমনকি ঠান্ডা পানি গায়ে লাগলে তার কাছে ফুটন্ত গরম মনে হতো।
মারেরো ছিলেন তাদের একমাত্র ভরসা। তিনি রোগীদের হাত ধরতেন, তাদের সঙ্গে কাঁদতেন। লরি-অ্যান রোনেস নামের এক রোগী বলেন, 'তিনিই একমাত্র ডাক্তার যিনি আমাদের কথা মন দিয়ে শুনতেন।'
সরকারি উদ্যোগ
২০২১ সালের মার্চে একটি মেমো ফাঁস হওয়ার পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। কানাডার শীর্ষ বিজ্ঞানীরা নড়েচড়ে বসেন। বিষয়টি তখন সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো মনে হচ্ছিল।
গঠিত হয় শক্তিশালী ওয়ার্কিং গ্রুপ। কানাডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব হেলথ রিসার্চ (সিআইএইচআর) তদন্তের জন্য ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। রোগটির নাম দেওয়া হয় 'অজানা কারণে নিউ ব্রান্সউইক নিউরোলজিক্যাল সিনড্রোম'।
কিন্তু নিউরোলজিস্ট ডা. জেরার্ড জ্যানসেন ভিন্ন কথা বললেন। তিনি মারেরোর নোটে দেখলেন 'অসংলগ্ন লক্ষণের জগাখিচুড়ি'। মৃত রোগীদের মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করে তিনি আলঝেইমার্স ও ডিমেনশিয়ার লক্ষণ পেলেন। তিনি কর্তৃপক্ষকে জানালেন, 'রোগীরা বাস্তব, কিন্তু রহস্যময় রোগের বিষয়টি সত্য নয়।'
সন্দেহ এবং পরিবেশগত কারণ
মারেরো আঙুল তুললেন আগাছানাশক 'গ্লাইফোসেট'-এর দিকে। নিউ ব্রান্সউইকের বনায়নে এটি প্রচুর ব্যবহৃত হয়। তিনি জানালেন, তার ১০০ জনেরও বেশি রোগীর শরীরে গ্লাইফোসেট ও ভারী ধাতুর মাত্রা অনেক বেশি।
গ্রীষ্মের শেষে ও শরতের শুরুতে রোগীর সংখ্যা বাড়ে, ঠিক যখন বনায়নের জন্য স্প্রে করা হয়। এই সংযোগটিই মারেরোর সন্দেহের মূল কারণ।
তদন্ত যখন জোরদার হওয়ার কথা, ঠিক তখনই মে মাসে সব বন্ধ হয়ে গেল। প্রদেশ সরকার ফেডারেল বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিতে অস্বীকার করল, ফিরিয়ে দিল ৫০ লাখ ডলারের তহবিল।
মারেরো বলেন, 'খবরটা শুনে মনে হলো সবার মাথায় যেন ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছে।' সরকার নিজস্ব তদন্ত করে রায় দিল—কোনো পরিবেশগত কারণ বা রহস্যময় রোগ নেই।
কিন্তু সমস্যা হলো, সরকারি কমিটি রোগীদের সশরীরে পরীক্ষা করেনি। শুধু ফাইল দেখে রায় দিয়েছে। এতে রোগীরা আরও ক্ষুব্ধ হলেন। জিলিয়ান লুকাসের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা ভাবতে শুরু করেন।
রোগীরা জানান, ক্লিনিকে মারেরো অদ্ভুত আচরণ করতেন। ফিসফিস করে কথা বলতেন। দরজায় কান পেতে শুনতেন কেউ আড়ি পাতছে কি না।
২০২২ সালের আগস্টে মারেরোকে 'মাইন্ড ক্লিনিক' থেকে বরখাস্ত করা হয়। রোগীদের পছন্দ করতে বলা হয়—ক্লিনিক নাকি মারেরো? ১০৫ জনের মধ্যে ৯৪ জনই মারেরোকে বেছে নিলেন। ক্লিনিকের বাইরে মারেরো একা হয়ে পড়লেন। তিনি রোগীদের অদ্ভুত সব পরীক্ষার জন্য পাঠাতে লাগলেন।
মুদ্রার উল্টো পিঠ
যারা ক্লিনিকে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের গল্পটা অন্যরকম। কেভিন স্ট্রিকল্যান্ড তার স্ত্রী এপ্রিলকে নিয়ে ক্লিনিকে থেকে যান। এপ্রিল গাড়ি চালানো ভুলে যাচ্ছিলেন। মারেরো বলেছিলেন 'রহস্যময় রোগ'।
কিন্তু ক্লিনিকের ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জানালেন, এপ্রিল 'ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া'-য় ভুগছেন। কেভিন বলেন, 'মারেরো রোগীকে সাহায্য করার চেয়ে নিজের রহস্যময় রোগের তত্ত্ব প্রমাণেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।'
স্যান্ডি প্যাট্রিজও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তার রোগ শনাক্ত হয় 'ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার' বা এফএনডি হিসেবে। এটি মস্তিষ্কের হার্ডওয়্যার নয়, সফটওয়্যারজনিত সমস্যা। স্যান্ডি এখন সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন।
১৮ বছরের তরুণী গ্যাব্রিয়েল করমিয়ার ছিলেন এই দলের 'পোস্টার চাইল্ড'। মারেরো তাকেও রহস্যময় রোগী বলেছিলেন। কিন্তু টরন্টোর শীর্ষ নিউরোলজিস্ট ডা. অ্যান্থনি ল্যাং তাকে পরীক্ষা করে এফএনডি শনাক্ত করেন।
গ্যাব্রিয়েলের পরিবার তা মানতে পারেনি। ডা. ল্যাংয়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তারা আবার মারেরোর কাছে ফিরে আসে।
মারেরো গ্যাব্রিয়েলকে ক্যানসারের কড়া ওষুধ দেন। এতে কোনো লাভ তো হলোই না, উল্টো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মেয়েটি এখন হুইলচেয়ারে বন্দি। তার প্যাথলজি পড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
তোলপাড় করা গবেষণা
২০২৫ সালের মে মাসে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ডা. ল্যাং ও জ্যানসেন সেখানে দেখান, ওই ২৫ জন রোগীর প্রত্যেকেই পরিচিত রোগে ভুগছিলেন। এফএনডি, ডিমেনশিয়া বা ক্যানসার ছিল তাদের।
গবেষণায় বলা হয়, কোনো নতুন রোগ নেই। এটি ছিল মারেরোর ভুল রোগ নির্ণয় বা মিসডায়াগনোসিসের ধারাবাহিকতা। মিডিয়া এবং মহামারির কারণে সৃষ্ট অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী একে বড় করে দেখিয়েছে।
ক্যাট ল্যানটেইন ও অন্য সমর্থকরা এই গবেষণাকে অনৈতিক বলছেন। গ্যাব্রিয়েলের পরিবার আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে নিজের বাগানের অফিসে বসে মারেরো বলছিলেন, 'তারা আমাকে এর জন্য দায়ী করার চেষ্টা করছে। আমি এর অংশ ছিলাম, কিন্তু আমিই সব নই।'
কিন্তু বাস্তবতা হলো, জিলিয়ান লুকাস এখন স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেছেন। মারেরো তাতে সমর্থন দিয়েছেন, যদিও জিলিয়ানের কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ ধরা পড়েনি।
অন্যদিকে মারেরো এখনো আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলছেন, 'আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কারণ আমি জানি।' তার রোগীর সংখ্যা এখন ৫০০ ছাড়িয়েছে এবং প্রতি সপ্তাহে তা বাড়ছে।
