৪৭ সেকেন্ডেই হয়তো আপনি এই লেখা ছেড়ে যাবেন; মনোযোগ কি আরেকটু ধরে রাখা সম্ভব?
আপনি সম্ভবত কোনো স্ক্রিনে এই লেখাটি পড়ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার সময় বা 'অ্যাটেনশন স্প্যান' এখন মাত্র ৪৭ সেকেন্ড। এর পরই মন অন্য দিকে চলে যায়। তাই আসুন, এই অল্প সময়টুকু কাজে লাগাই।
মানুষের মনোযোগ দিন দিন কমছে। এর জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, অ্যালগরিদমের ফাঁদ আর কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা মুছে যাওয়াকে দায়ী করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার চ্যান্সেলর'স প্রফেসর ড. গ্লোরিয়া মার্কের গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২০ বছরে স্ক্রিনে মানুষের গড় মনোযোগের সময় আড়াই মিনিট থেকে কমে মাত্র ৪৭ সেকেন্ডে নেমে এসেছে।
ড. মার্ক বলেন, মনোযোগ কম থাকলে কাজ বা ব্যক্তিগত জীবনের আনন্দ পুরোপুরি পাওয়া কঠিন। প্রযুক্তির স্রোতে আমরা অনেক দূর ভেসে গেছি ঠিকই, কিন্তু কিছু পরিবর্তন এনে মনোযোগের লাগাম আবার হাতে নেওয়া সম্ভব।
এতটুকু পড়তে হয়তো আপনার ৪৭ সেকেন্ড লেগেছে। মনোযোগ কি ঠিক ছিল? নাকি মন অন্য দিকে ছুটছে?
নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন। সোশ্যাল মিডিয়ার ট্যাবগুলো খোলা রেখেই চেষ্টা করুন এই লেখাটিতে মনোযোগ ধরে রাখতে।
মস্তিষ্ককে বিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রশিক্ষণ দিচ্ছি আমরা
একসময় মানুষ চিঠি লিখত বা রাতে খাওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ত। তারপর টিভি দেখার চল এল। ল্যান্ডফোনে হয়তো কেউ কল করত। কিন্তু ইদানীং সিনেমার মাঝখানেও ফোনের স্ক্রিনে চোখ না রাখলে চলে না।
ড. মার্ক বলেন, মানুষ যে পুরোনো মাধ্যম পছন্দ করে না, তা নয়। আসল সমস্যা হলো, আমাদের মস্তিষ্ক এখন বিক্ষিপ্ত থাকার প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. আনা লেম্বকে বলেন, ডোপামিন বা 'ফিল-গুড' নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের প্রেরণা ও আসক্তির পেছনে কাজ করে। ব্যায়াম বা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো ভালো কাজ থেকেও ডোপামিন পাওয়া যায়। কিন্তু হাতের মুঠোয় থাকা সোশ্যাল মিডিয়া ডোপামিনের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার বদলে আমরা একসাথে পাঁচজনের সঙ্গে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত থাকি। নিউজফিড আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সবসময় কিছু না কিছু ঘটছে, আর আমরা বুঝি তা মিস করছি।
সিনেমার ধীরগতির দৃশ্য এখন আর ভালো লাগে না। কারণ আঙুলের ডগাতেই আছে ছোট ছোট মজার বা আবেগী ক্লিপের ভাণ্ডার। একটা ভালো না লাগলে সোয়াইপ করলেই হলো।
ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার অধ্যাপক ড. মারিয়ান বেরিহিল বলেন, 'অবিরাম কন্টেন্টের এই স্রোত আমাদের এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে যে, তাৎক্ষণিক তৃপ্তি না পেলে আমরা আর কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারি না।'
কর্মক্ষেত্রের ধরনও বদলেছে। এখন আর ৯টা-৫টার চাকরি নেই। অফিস থেকে বের হওয়ার পরও ইমেইল বা মেসেজের উত্তর দিতে হয়। ফলে মস্তিষ্ক সব সময় নোটিফিকেশনের শব্দের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।
এখন আমরা গড় পড়ার সময়ের দ্বিগুণ পার করেছি। কেমন লাগছে? ফোনের নোটিফিকেশন কি আপনাকে ডাকছে?
দীর্ঘসূত্রতার চক্র
মনোযোগ অফুরন্ত সম্পদ নয়। ক্লান্ত থাকলে জোর করে মনোযোগ দেওয়া যায় না। ড. মার্ক বলেন, দিনের বিভিন্ন সময়ে আমাদের মনোযোগের মাত্রা কমবেশি হয়।
মনোযোগ ঠিকমতো কাজে লাগাতে না পারলে মানুষ সারাদিনে যা করতে চায়, তা করতে পারে না। ফলে কাজ শেষ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সময় বা শখ বিসর্জন দিতে হয়।
কাজের ফাঁকে বিরতি নেওয়া জরুরি। শখ বা আড্ডার জন্য সময় রাখলে মনোযোগের ভাণ্ডার আবার পূর্ণ হয়। কাজ বাড়িতে নিয়ে এলে পরদিনের মনোযোগ কমে যায় এবং চক্রাকারে সমস্যা বাড়তেই থাকে।
মনোযোগ ফেরানোর কৌশল
এই চক্র ভাঙার একটা উপায় হলো দিনের শেষের কথা ভাবা। আপনি কি এখনই কাজ ফেলে রেখে রাতে চাপে থাকতে চান? নাকি কাজ শেষ করে নিশ্চিন্তে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান? ড. মার্ক বলেন, দিনের শেষটা কেমন হবে তা ভাবলে প্রেরণা বাড়ে।
মনোযোগ কম থাকলে মনে হতে পারে—'গানের লিরিকটা একটু দেখে নিই' বা 'ফ্লাইটের দামটা চেক করি'। কিন্তু সেই ছোট্ট বিরতি গড়ে ২৫ মিনিট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
এর জন্য 'মেটা-অ্যাওয়ারনেস' বা সচেতনতার কৌশল ব্যবহার করুন। অন্য কিছু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, 'এটা কি এখনই করা দরকার?'
হয়তো উত্তর হবে 'না'। এভাবে মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিন যাতে সে অহেতুক বিচ্যুত না হয়।
আপনি যদি এই পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাকেন, তবে আপনি ২০ বছর আগের মানুষের গড় মনোযোগের সমান সময় পার করেছেন। অভিনন্দন!
দিনের রুটিন সাজানো
কেউ ভোরের পাখি, কেউ নিশাচর। একেকজনের শরীরে শক্তির মাত্রা একেক সময় বেশি থাকে। সাধারণত সকালের দিকে এবং দুপুরের খাবারের পর মনোযোগ বেশি থাকে।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক ড. মার্ক বারম্যান বলেন, মনোযোগ দুই ধরনের—'ডিরেক্টেড' বা ইচ্ছাকৃত এবং 'ইনভলান্টারি' বা অনিচ্ছাকৃত। কঠিন কাজের জন্য ইচ্ছাকৃত মনোযোগ দরকার, যা ক্লান্ত হয়। আর অনিচ্ছাকৃত মনোযোগ (যেমন সুন্দর দৃশ্য বা গান) ক্লান্ত হয় না।
আপনার মনোযোগের চূড়া বা পিক টাইম কখন, তা বুঝুন। ওই সময়ে কঠিন কাজগুলো করুন। আর যখন শক্তি কম থাকে, তখন ইমেইলের উত্তর দেওয়ার মতো হালকা কাজ করুন।
কাজ না করে উৎপাদনশীল হোন
টানা কাজ করার ক্ষমতা থাকলেও বিরতি নেওয়া জরুরি। ড. মার্ক বলেন, ভুল এড়াতে এবং তথ্য মনে রাখতে বিরতি নিন।
কাজের ফাঁকে ৫ মিনিটের বিরতি নিন। হাঁটুন বা ড্রয়ার গোছান। দুপুরের খাবারে ডেস্ক ছেড়ে উঠুন, সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন বা বাইরে যান।
প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মনোযোগ ফেরাতে জাদুর মতো কাজ করে। ড. বারম্যান বলেন, জলপ্রপাত বা গাছপালা দেখলে মন শান্ত হয় এবং মনোযোগ ফিরে আসে। কিন্তু শহরের কোলাহলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
জার্মানিতে কাজের সময় ড. মার্ক দেখেছেন, দুপুরের বিরতিতে সবাই একসঙ্গে খায়, আড্ডা দেয় এবং হাঁটে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ ডেস্কের সামনেই তাড়াহুড়ো করে খায়।
বিরতি নিয়ে মনকে চাঙ্গা করা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বড় বিনিয়োগ। ড. বারম্যান পরামর্শ দেন, মানসিক ক্লান্তিতে প্রকৃতির কাছে যান। পডকাস্ট বা আড্ডা বাদ দিয়ে শুধু পরিবেশ অনুভব করুন। আবহাওয়া যেমনই হোক, বাইরে বের হন।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছেন কি? যদি না পারেন, তবে বুঝবেন দ্রুতগতির স্ক্রল-নির্ভর দুনিয়ায় আপনিও আটকা পড়েছেন। এখনই সময় মনোযোগের রাশ টেনে ধরার।
