বার্ধক্যেও মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ রাখতে নতুন উপায় খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা
আশি কিংবা নব্বই বছর বয়স, অথচ স্মৃতিশক্তি একেবারে ধারালো। বিজ্ঞানের ভাষায় এমন মানুষদের বলা হয় 'সুপার-এজার'। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মস্তিষ্কে সাধারণ সুস্থ বয়স্ক মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরি হয়। আর আলঝেইমার্স রোগীদের তুলনায় এই হার আড়াই গুণ বেশি।
গবেষণাটির সহ-লেখক ড. তামার গেফেন বলেন, 'এর মানে হলো বুড়ো বয়সেও মস্তিষ্ক নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। এটা বিশাল এক ব্যাপার।' তিনি শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফেইনবার্গ স্কুল অফ মেডিসিনের সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক।
গেফেন জানান, একটি পরিণত নিউরন সাধারণত স্থির থাকে। কিন্তু তরুণ নিউরন অনেক বেশি নমনীয়। এগুলো সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে পারে। নর্থওয়েস্টার্নের গবেষকরা ২৫ বছর ধরে এমন প্রখর স্মৃতিশক্তির বয়স্কদের নিয়ে গবেষণা করছেন।
তিনি বলেন, 'সুপার-এজারদের মস্তিষ্কে প্রচুর অপরিণত নিউরন থাকে। এগুলো সব সময় উত্তেজিত ও কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। অর্থাৎ, তাদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি তরুণ।'
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সুপার-এজারদের মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটি খুব শক্তিশালী। মস্তিষ্কের এই অংশটি স্মৃতি ধরে রাখার কাজ করে। উর্বর মাটিতে চারাগাছ যেমন পুষ্টি পায়, ঠিক তেমনি হিপ্পোক্যাম্পাস এই তরুণ নিউরনগুলোকে পুষ্টি জোগায়।
গেফেন বলেন, 'এই গবেষণা প্রমাণ করে যে সুপার-এজারদের হিপ্পোক্যাম্পাসে এমন এক কোষীয় পরিবেশ আছে যা নতুন নিউরন জন্মাতে সাহায্য করে। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি নমনীয় বা প্লাস্টিক।'
নতুন নিউরন তৈরি হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউরোজেনেসিস। এটি মস্তিষ্কের 'প্লাস্টিসিটি' বা নমনীয়তা বাড়ায়। ফলে আঘাত বা বয়সের ভারেও মস্তিষ্ক নিজেকে মেরামত করে সচল রাখতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় শিকাগোর স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক অরলি লাজারভ এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক। তিনি বলেন, 'সুপার-এজারদের মস্তিষ্কে ৩০ বা ৪০ বছর বয়সী মানুষের চেয়েও বেশি নতুন নিউরন থাকে। এটা প্রমাণ করে তাদের মস্তিষ্ক সময়ের আঘাত সামলে নিতে কতটা সক্ষম।'
ফ্লোরিডার ইনস্টিটিউট ফর নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজেসের গবেষণা পরিচালক ড. রিচার্ড আইজ্যাকসন বলেন, 'সুপার-এজারদের জিনগত সুবিধা হয়তো থাকে। তবে যারা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের যত্ন নেন, তারাও স্মৃতিভ্রম ঠেকাতে পারেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে—ভালো খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে মস্তিষ্ক ভালো রাখা যায়। এমনকি মস্তিষ্কের আকারও বাড়ানো সম্ভব। আমি মেডিকেল স্কুলে পড়ার সময় জানতাম মস্তিষ্কের কোষ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। কিন্তু এখন এমআরআই স্ক্যানে আমরা এর অকাট্য প্রমাণ দেখছি।'
সুপার-এজার কারা?
ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর অধ্যাপক এমিলি রোগালস্কি জানান, সুপার-এজার হতে হলে একজন ব্যক্তির বয়স ৮০ বছরের বেশি হতে হবে। তাদের স্মৃতিশক্তির কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। তাদের দৈনন্দিন ঘটনা এবং অতীতের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মনে রাখার ক্ষমতা অসাধারণ হতে হয়।
তিনি বলেন, 'তবে খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ বয়স্কদের সঙ্গে তাদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ-এর খুব একটা তফাত নেই। পার্থক্যটা শুধু স্মৃতিশক্তিতে।'
সুপার-এজারদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও আছে। তারা সাধারণত ইতিবাচক মনোভাবের হন। তারা প্রতিদিন বই পড়া বা নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ জানান। অনেকে ৮০ বছর বয়সেও কাজ করেন। তারা সামাজিকভাবেও বেশ সক্রিয় থাকেন।
তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সুপার-এজাররা যে সবাই খুব নিয়ম মানেন, তা নয়। গেফেন বলেন, 'অনেক সুপার-এজার আছেন যাদের হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস আছে। তারা যে খুব ভালো খাবার খান বা ব্যায়াম করেন, তাও নয়। তবে তাদের মস্তিষ্কের গঠনই আসল কথা।'
মস্তিষ্কের টিস্যু বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সুপার-এজারদের 'সিঙ্গুলেট কর্টেক্স' সাধারণ ৫০-৬০ বছর বয়সীদের চেয়ে পুরু। এই অংশটি মনোযোগ ও প্রেষণার কাজ করে। তাদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার্সের লক্ষণ 'টাউ ট্যাঙ্গেল' অনেক কম থাকে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের 'এন্টোরিনাল কর্টেক্স'-এর নিউরনগুলো বিশাল এবং খুব স্বাস্থ্যবান। আলঝেইমার্স রোগে মস্তিষ্কের এই অংশটিই সবার আগে আক্রান্ত হয়।
গেফেন বলেন, 'এটি ছিল অবিশ্বাস্য। তাদের নিউরনগুলো ৩০ বছর বয়সীদের চেয়েও বড়। এর মানে হলো তাদের নিউরনের গঠন বা কাঠামো অনেক বেশি মজবুত।'
নিউরোজেনেসিস মাপার নতুন পদ্ধতি
অধ্যাপক লাজারভ জানান, আগে মানুষের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরির গবেষণা কিছুটা অস্পষ্ট ছিল। বুধবার 'নেচার' জার্নালে প্রকাশিত এই নতুন গবেষণায় এক ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় পাঁচ ধরনের দাতার মস্তিষ্ক নেওয়া হয়: সুপার-এজার, সুস্থ তরুণ, স্মৃতিভ্রমহীন বয়স্ক, প্রাথমিক ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ থাকা বয়স্ক এবং আলঝেইমার্স আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তি।
'মাল্টিওমিক সিঙ্গেল-সেল সিকোয়েন্সিং' নামের প্রযুক্তিতে দেখা গেছে, সুপার-এজারদের স্মৃতিশক্তির পেছনে 'অ্যাস্ট্রোসাইট' এবং 'সিএ-১' নিউরনের বড় ভূমিকা আছে।
সিএ-১ নিউরন স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে এবং মনে করতে সাহায্য করে। আর অ্যাস্ট্রোসাইট মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং নিউরনের সংযোগস্থল বা সিন্যাপস তৈরিতে সাহায্য করে।
গেফেন বলেন, 'সুপার-এজারদের মস্তিষ্কে এই কোষগুলো মিলেমিশে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে। অপরিণত নিউরন, সিএ-১ সার্কিট এবং অ্যাস্ট্রোসাইট—সবাই মিলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা টিকিয়ে রাখে।'
